ইমামের জিজ্ঞাসার জবাবে সে জানাল, তার এ চোখটি নষ্ট।
দ্বিতীয় ব্যক্তির পোশাকও ছিল সাধাসিধে। তারও লম্বা ঘন দাড়ি। তারা দুজন ই এখন মসজিদে ইমামের সামনে বসা। অপর ছয় সঙ্গী- যারা জিহাদের সবক নিতে এসেছিল- মসজিদের বাইরে দন্ডায়মান, যেন তারা সঙ্গীদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।
কেন, তোমাদের সন্দেহ এখনো দূর হয়নি? হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন ইমাম।
হ্যাঁ, আমাদের সব সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। চোখে পট্টিওয়ালা ব্যক্তি জবাব দেয়।
আমরা বোধ হয় আপনাকেই খুঁজে ফিরছি। আমরা মিসরের অর্ধেকটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে এসেছি। বোধ হয়, আমাদেরকে মসজিদের অবস্থান সম্পর্কে ভুল নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।
কেন, মিসরের অর্ধেকেও আমার চেয়ে ভাল আলেম খুঁজে পাওনি বুঝি?
খুঁজছি যে শুধু আপনাকে-ই। আমরা কি সঠিক জায়গায় এসে পৌঁছিনি? আপনার দস বলছে, আমরা আপনাকেই খোঁজ করছি। জবাব দেয় একজন।
ইমাম বাইরের দিকে তাকালেন এবং নির্লিপ্তর মত বললেন, জানি না, আজকের আবহাওয়া কেমন থাকবে!
বৃষ্টি আসবে। পট্টিওয়ালা জবাব দেয়।
আকাশ তো বিলকুল পরিস্কার। ইমাম বললেন।
আমরা মেঘ নিয়ে আসব। বলেই পট্টিওয়ালা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
ইমাম মুচকি হাসলেন এবং চাপাকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে এসেছ?
এক মাস ইসকান্দারিয়ায় ছিলাম। তার আগে শেবকে। মুসলমান?
ফেদায়ী, তবে এখনো মুসলমান-ই মনে করুন। বলে সঙ্গীর প্রতি কটাক্ষ দৃষ্টিপাত করে বিকট শব্দে হেসে উঠে পট্টিওয়ালা।
আমি আপনাকে ওস্তাদ মানছি। এ-যে আপনি, আমার বিশ্বাস-ই হতে চাচ্ছে না। আপনি ব্যর্থ হতে পারেন না। বলল দ্বিতীয়জন।
তবে সফলতা অত সহজও নয়। সালাহুদ্দীন আইয়ুবীকে হয়ত তোমরা জান না। আমি সর্বস্তরের মানুষের অন্তরে জিহাদ ও যৌনতা সম্পর্কে ইসলামী ধ্যান-ধারণার বিপরীত ধারা ঢুকিয়ে দিয়েছি। কিন্তু সালাহুদ্দীন যে মাদ্রাসা খুলেছে, তা সম্ভবতঃ আমাদের প্রচেষ্টাকে সহজে সফল হতে দিবে না। আচ্ছা, তুমি আমাকে জিহাদ সম্পর্কে বলতে বলেছিলে কেন? ইমাম বললেন।
শোবকে আমাদেরকে বলা হয়েছিল, জিহাদ সম্পৰ্কীয় আলোচনা-ই আপনার সবচে বড় পরিচয়। দরূসে আপনি যা বলেছেন, তা ওখানেই আমাদেরকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমাদেরকে আরো বলা হয়েছিল, জিহাদের পর আপনি অবশ্যই যৌনতা নিয়ে আলোচনা করবেন। আপনি আপনার সবক বেশ ভাল করেই রপ্ত করেছেন। বলল পট্টিওয়ালা।
আমার নাম কি? ইমাম জিজ্ঞেস করেন।
আপনি কি আমাদেরকে পরীক্ষা নিতে চাচ্ছেন? আমাদের উপর কি আপনার সন্দেহ হচ্ছে? নাম নয়। আমাদেরকে পরস্পরের সংকেত শেখান হয়। পট্টিওয়ালার জবাব।
তোমরা কী উদ্দেশ্যে এসেছ? জানতে চান ইমাম।
ফেদায়ী কেন আসে? পট্টিওয়ালার পাল্টা প্রশ্ন।
তোমাদেরকে আমার নিকট কেন পাঠান হয়েছে? জিজ্ঞেস করেন ইমাম।
একটি উষ্ট্রীর জন্য। আপনার কাছে দুটি আছে। আমাদেরকে আপনার নিকট পাঠান হত না। কিন্তু আপনি জেনে থাকবেন যে, সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর এক নায়েব সালার রজব সুদানীর সঙ্গে শোবক থেকে তিনটি উন্ত্রী প্রেরণ করা হয়েছিল। তাদের একটি ছিল আমাদের জন্য। কিন্তু কী হয়েছে জানি না, তিনটি-ই মারা গেছে। রজবের বিচ্ছিন্ন মস্তক আর সবচে রূপসী উজ্জ্বীটি সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর নিকটে পৌঁছে গেছে। সেটিও শেষ হয়ে গেছে। বলল একজন।
বেদনার নিঃশ্বাস ছেড়ে ইমাম বললেন, হ্যাঁ, জানি। আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। আইয়ুবীর এই দক্ষ কমাণ্ডারকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে আমাদের বড় কাজ হত। কিন্তু জল্লাদ তাকে শেষ করে দিল। আচ্ছা, এবার ভিতরে চলুন, এ স্থান নিরাপদ নয়।
দুই আগন্তুক ইমামের সঙ্গে উঠে মসজিদের বাইরে চলে আসেন। বাইরে অপেক্ষমান হয় সঙ্গী অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
***
তারা ইমামের ঘরে প্রবেশ করে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর। একাধিক কক্ষ। দুতিনটি কক্ষ অতিক্রম করে ইমাম তাদের অপর একটি কক্ষের সামনে নিয়ে যান। কক্ষটির অবস্থান মাটির উপরে হলেও দেখতে তা মাটির নীচে বলে মনে হয়। কক্ষের সম্মুখে খড়-কুটো ছড়ানো। দরজা তালাবদ্ধ। বুঝা গেল, কয়েক বছর ধরে তালাটি খোলা-ই হয়নি, খোলা যাবেও না।
কক্ষের এক পার্শ্বে জানালা। জানালায় হাত লাগান ইমাম। খুলে যায় জানালা। ইমাম ভিতরে প্রবেশ করেন। পিছনে তারা দুজন।
ভিতর দিক থেকে কক্ষটি বেশ সাজানো-গোছানো। দেয়ালে ঝুলছে একটি সোনার ক্রুশ। তার একদিকে হাতে আঁকা ঈসা (আঃ)-এর প্রতিকৃতি আর অপরদিকে মা মরিয়মের ছবি। ইমাম বললেন, এটি আমার গীর্জা, আমার আশ্রম।
তা বিপদের মুহূর্তে আপনার আত্মরক্ষার ব্যবস্থা কী? জানতে চায় সবুজ পট্টিওয়ালা। ক্রুশ এবং ছবিগুলো এভাবে চোখের সামনে না রাখা উচিৎ বলেও পরামর্শ দেয় সে।
এ পর্যন্ত কারো আগমনের আশংকা নেই। ইমাম জবাব দেন এবং হেসে বলেন, মুসলমান বড় সরল ও আবেগপ্রবণ জাতি। আবেগঘন জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনেই তারা জীবন দিতে শুরু করে। জৈবিক চাহিদা মানুষের সবচে বড় দুর্বলতা। মুসলমানদের মধ্যে আমি এই দুর্বলতাকে উস্কে দিচ্ছি। তাদের আমি সবক দিচ্ছি যে, এক একজনের চারটি করে বিয়ে করা ফরজ। আমি ধীরে ধীরে তাদেরকে বিপথগামিতার প্রতি আগ্রহী করে তুলছি। ধর্মের নামে মুসলমানদের তোমরা ভালো-মন্দ দু-ই করতে পার। কুরআন হাতে নিয়ে কথা বললে এরা বোকামীসুলভ কথাও মেনে নেয়, মিথ্যাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করে ফেলে। আমার পরীক্ষা সফল। এখানে আমি আমার-ই মত এমন একদল লোক তৈরি করে নেব, যারা মসজিদে বসে কুরআন হাতে নিয়ে মুসলমানদের জিহাদী জবা আর নৈতিকতাকে নিঃশেষ করে দেবে। আমি নারী সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছি। সালাহুদ্দীন আইয়ুবী নারীদেরকেও সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছে। আমি তাদের বলছি, নারীদেরকে তোমরা ঘরে আবদ্ধ করে রাখ। এ জাতির অর্ধেক জনশক্তিকে আমি বেকার করে ছাড়ব।
