না, সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। বড়রা তাকে যা করতে বলেছে, একজন খাঁটি মুসলমানের ন্যায় সম্পূর্ণ নেক নিয়তে তিনি তার-ই উপর আমল করছেন। তার অন্তরে খৃষ্টানদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে, তিনি সে আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছেন। আচ্ছা, খৃষ্টান আর মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য কী? দুজনের নবী তো অভিন্ন! পরে না কিছুটা ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। হযরত ঈসা (আঃ) যেমন ভালবাসা ও শান্তির পয়গাম নিয়ে এসেছিলেন, তেমনি আমাদের রাসূল (সাঃ) ও তো প্রেম-ভালবাসার পয়গাম দিয়ে গেছেন! তাহলে এই তরবারীগুলো আসল কোত্থেকে? আল্লাহ্র এই প্রিয় ভূমিতে- যেখানে একমাত্র তাঁর-ই রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা সেখানে যারা আপন প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজেদের গোলামে পরিণত করতে চায়, এসব তাদের-ই আবিষ্কার। আমি মিসরের আমীরের দরবারে যাব। তার সামনে জিহাদের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরব। তিনি অবশ্য সঠিক জিহাদের কার্যক্রম শুরু করেও দিয়েছেন। তা হলো, অজ্ঞতার বিরুদ্ধে জিহাদ। জুমার খোতবা থেকে খলীফার নাম তুলে দিয়ে তিনি বিরাট জিহাদ করেছেন। মাদ্রাসা খুলেও তিনি জিহাদ করেছেন। তবে মাদ্রাসাগুলোয় ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করে তিনি ভাল করেননি। কোমলমতি শিশুদেরকে তিনি আল্লাহর নামে লুটতরাজের সবক দিচ্ছেন। তার মাদ্রাসাগুলোতে অসি চালনা আর তীরন্দাজির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আপনি যদি আপনার সন্তানের হাতে তরবারী আর তীর-ধনুক তুলে দেন, তাহলে তাদেরকে একথাও বলতে হবে যে, এর দ্বারা তুমি অমুককে খুন করে আস। কিছু লোককে দেখিয়ে আপনাকে বলতে হবে, অমুক তোমার দুশমন, তাকে হত্যা কর।
ইমামের কণ্ঠে এত প্রভাব আর প্রমাণ-উপস্থাপনায় এত আকর্ষণ যে, তার বক্তব্য শুনে শ্রোতারা অভিভূত হয়ে পড়ে। তিনি বললেন
আপন সন্তানদেরকে তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর। নতুবা তাদের সঙ্গে তোমাদেরও জাহান্নামে যেতে হবে। কারণ, সন্তানদেরকে ভুল পথে তুলে দেয়ার জন্য তোমরাও দায়ী। তোমাদের রাজা-বাদশাহ আর সেনাপতিরা তোমাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাবে না। নিবেন সেই আলেমে দ্বীন, যার হাতে ধর্ম ও ইলমের প্রদীপ। দুনিয়ার জীবনে যদি তোমরা আলেমের পিছনে চল, তাহলে কিয়ামতের দিন তিনি তোমাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। কিয়ামতের দিন যার হাত মানুষের রক্তে রঞ্জিত থাকবে, হাজারো নেক আমল এবং নামায-রোযা ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
আরো একটি সূক্ষ্ম কথা বুঝে নাও। তোমরা যাকাত দাও কাকে? বাইতুল মালকে তো? যখন যিনি দেশের শাসক থাকেন, বাইতুল মালের মালিক হন তিনি। আর যাকাত হল গরীব-অসহায়ের হক। শাসক তো গরীব হন না। বাইতুল মালে তোমরা যে যাকাত জমা দাও, তা দ্বারা ঘোড়া আর অস্ত্র ক্রয় করা হয়। অস্ত্রের কাজ হল মানুষ ধ্বংস করা। তার মানে, যে ফরজ আদায় করে তোমরা জান্নাতে যেতে পারতে, সেই ফরজ আদায় করে তোমরা জাহান্নামে ঠিকানা করে নিচ্ছ। তাই বলছি, তোমরা যাকাত আর বাইতুল মালে দিও না।
প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে ইমাম আরো বললেন
অনেক কথা সাধারণ মানুষের বুঝে আসে না। কেউ তাদেরকে বলেও না। তোমরা কি দেখছ না যে, তোমাদের মধ্যে একটি পশুবৃত্তি আছে? কেন, তোমরা কি নারীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব কর না? এই পশুবৃত্তি-ই কি তোমাদেরকে পাপের অন্ধগলিতে নিয়ে যায় না? মানুষের এই বৃত্তিটা মানুষ সৃষ্টি করেনি- করেছেন স্বয়ং আল্লাহ। তোমরা এই পশুবৃত্তিকে দমন করতে পার। এর-ই জন্যে আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রে ঘরে চারটি করে স্ত্রী রাখতে আদেশ করেছেন। অর্থের অভাবে যদি তোমরা একজন স্ত্রী রাখতেও সক্ষম না হও, তাহলে কোন নারীকে পারিশ্রমিক দিয়ে তোমরা এই পশুবৃত্তি নিবারণ করতে পার। আরে! মানুষ তো সেই পশুবৃত্তির-ই এক ফসল। তবু তোমরা পাপ থেকে বেঁচে থাক। ঘরে এক এক, দু দু, তিন তিন ও চার চারজন করে স্ত্রী রাখ। আর স্ত্রী ও কন্যাদেরকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে লুকিয়ে রাখ। আমি দেখতে পাচ্ছি যে, আজ যুবতী মেয়েদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ঘোড়সাওয়ারী ও উটসাওয়ারী শেখান হচ্ছে। মহিলা মাদ্রাসা স্থাপন করে সেখানে মেয়েদেরকে যুদ্ধাহতদের সেবার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। শেখান হচ্ছে, কিভাবে তারা আহত মুজাহিদের জখমে পট্টি বাধবে। এ এক বেদআত কাজ। এই ঘৃণ্য বেদআত থেকে তোমরা তোমাদের বোন-কন্যাদেরকে হেফাজত কর। তোমাদের বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের যারা মসজিদে আসে না, আমার এ কথাগুলো তাদেরও কানে দাও। আল্লাহর বিধানে তোমরা হস্তক্ষেপ কর না। এটি মস্তবড় পাপ।
ইমামের দরস সমাপ্ত হয়। শ্রোতারা উঠে ইমামের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলে যেতে শুরু করে। সেদিন বয়ানে এত বিপুলসংখ্যক লোকের সমাগম হয়েছিল যে, মসজিদের ভিতরে জায়গা না পেয়ে বহু লোক বাইরে দাঁড়িয়ে বয়ান শ্রবণ করে।
সুযোগ মত অনেকে ইমামের হাতে চুম্বনও করে। মাথা ঝুঁকিয়ে মোসাফাহা করতে বাদ দেইনি একজনও।
.
একজন একজন করে চলে গেছে সবাই। শুধু দুজন লোক ইমামের সামনে বসা। তাদের একজন সেই ব্যক্তি, যে ইমামের কাছে জিহাদ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য শুনতে আবদার করেছিল। গায়ে তার লম্বা জুব্বা। মাথায় ছোট্ট একটি পাগড়ী। পাগড়ীর উপর চওড়া ফুলদার রুমাল। মুখে লম্বা কালো দাড়ি। ঘন গোঁফ। পোশাকে তাকে মধ্যবিত্ত লোক বলে মনে হল। তার একটি চোখের উপর পট্টির মত সবুজ বর্ণের এক চিলতে কাপড়। কাপড় খন্ডটি দুটি সুতা দিয়ে মাথার সঙ্গে বাঁধা।
