মুসল্লিরা তার প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করে নেয়। তারা মসজিদের সন্নিকটে একাধিক কক্ষবিশিষ্ট একটি বাড়িও তাকে খালি করে দেয়। দুই স্ত্রীকে নিয়ে সেই বাড়িতে এসে উঠেন নতুন ইমাম। স্ত্রী দুজন কালো বোরকায় আবৃতা। হাতে-পায়ে কালো মোটা মোজা। দেহের কোন অংশ পর-পুরুষের চোখে পড়ার জো নেই। এমন পর্দানশীল মহিলা এ যুগে কমই চোখে পড়ে। মুসল্লিরা ঘরের জরুরী আসবাবপত্রের ব্যবস্থাও করে দেয়। বাহ্যিক আচার-আচরণ দেখে তাদের মনে নতুন ইমামের প্রতি বেশ শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হয়। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে একজন যোগ্য ইমাম পেয়ে গেছি, এই তাদের বিশ্বাস।
প্রথমবারের মত মিনারে দাঁড়িয়ে আযান দেন নতুন ইমাম। সে কি যাদুমাখা সুরেলা কণ্ঠ! যতদূর পর্যন্ত তার আযানের আওয়াজ পৌঁছে, সর্বত্র যেন নেমে আসে এক স্বর্গীয় নিস্তব্ধতা। গোটা প্রকৃতিকে মাতাল করে তুলছে যেন তার আযানের মধুর আওয়াজ। তার যাদুময় আযানের চুম্বকর্ষণে তারাও মসজিদপানে ছুটে আসে, ইতিপূর্বে যারা নামায পড়ত ঘরে, কিংবা আদৌ নামাযে অভ্যস্থ ছিল না।
প্রথম রাতেই তিনি ঈশার নামাযের পর মসজিদে দন্স প্রদান করেন। পরে ঘোষণা দেন যে, এভাবে প্রতি রাতেই তিনি দর্স প্রদান করবেন। নতুন ইমামের বয়ান শুনে মুসল্লিরা বেজায় খুশি।
ছয়-সাত মাস সময়ে নতুন ইমাম মুসল্লিদেরকে তার নিবেদিতপ্রাণ ভক্তে পরিণত করেন। অনেকে তার মুরীদও হয়ে যায়।
কায়রোর সেই মসজিদে এতকাল জুমার নামায অনুষ্ঠিত হত না। নতুন ইমাম এবার জুমার নামাযও চালু করেন।
দূর-দূরান্ত পর্যন্ত সেই অখ্যাত মসজিদ এবং নতুন ইমামের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। শহর থেকেও কিছু লোক ইমামের দরূসে যোগ দিতে শুরু করে।
ইমাম ইসলামের যে দুটি মৌলিক বিষয়ের উপর জোরালো বক্তব্য দিতেন, তাহল, ইবাদত ও সম্প্রীতি। দরসে তিনি যুদ্ধ-বিগ্রহের বিপক্ষে সবক দিতেন। মানুষের চিন্তা-চেতনায় তিনি এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দেন যে, মানুষের ভাল-মন্দ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে। ভাগ্য পরিবর্তনে মানুষের কোন দখলঃনই। মানুষ দুর্বল প্রকৃতির একটি প্রাণী মাত্র।
বড় ক্রিয়াশীল ইমামের বয়ান। তিনি কুরআন হাতে নিয়ে বয়ান করতেন। যে কোন বিষয়ে বয়ান করার সময় কুরআনের কোন না কোন আয়াত বের করে তার আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত বুঝিয়ে দিতেন। তিনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর ভূয়সী প্রশংসা করতেন। প্রায় সময়ই তিনি বলতেন, মিসরের বড় খোশনসীব যে, সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর মত এক মহান নেতা তার রাজত্ব করছেন।
ইমাম জিহাদের এমন দর্শন ও ব্যাখ্যা প্রদান করেন, যা সেখানকার লোকদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন। তবু বিনা বাক্যব্যয়ে অবলীলায় তারা তার সেই ব্যাখ্যা মেনে নেয়।
.
এক রাতে ইশার নামাযের পর ইমাম দরস দিচ্ছেন। হঠাৎ এক কোণ থেকে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলে উঠল, মুহতারাম! আল্লাহ আপনাকে কবুল করুন। আপনার বিদ্যার আলো জিন-পরী এবং আমরা চোখে দেখি না এমন মাখলুক পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। আমরা আট বন্ধু বহু দূর থেকে আপনার মূল্যবান বয়ান শুনতে এসেছি। এসেছি আপনার সুনাম-সুখ্যাতি শুনে। যদি গোস্তাখী না হয় এবং যদি আপনি বিরক্তিবোধ না করেন, তাহলে আমাদেরকে জিহাদ সম্পর্কে আরো কিছু বলুন। জিহাদের ব্যাপারে আমরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছি। মানুষ বলছে, জিহাদ সম্পর্কে নাকি আমাদেরকে ভুল ধারণা দেয়া হচ্ছে।
মসজিদের বিভিন্ন স্থান থেকে আরো সাতটি কণ্ঠ সমস্বরে বলে উঠে, আমরা এমন ওয়াজ জীবনে আর কখনো শুনিনি। দয়া করে আপনি আরো বলুন। জিহাদ বিষয়টি আমাদের খোলাসা করে বুঝিয়ে দিন।
মহামান্য ইমাম যা বললেন, তা-ই নির্ভুল এবং সময়োপযোগী বক্তব্য। অন্যরা আমাদেরকে বিকৃত ধারণা দিয়ে বিভ্রান্ত করেছে। আমরা সঠিক বক্তব্য শুনতে চাই। বলল একজন।
ইমাম বললেন, এটি কুরআনের আওয়াজ। ইনশাআল্লাহ, কেউ একে বিকৃত করতে পারবে না। যা সত্য, যা সঠিক, তা আমি বলব-ই। প্রয়োজনে একই কথা হাজার বার বলতে হলেও আমি তা প্রতিটি মানুষের কানে পৌঁছিয়ে দেব। অন্যের ভূখন্ড দখল করার উদ্দেশ্যে মানুষ খুন করার নাম জিহাদ নয়। জিহাদ অর্থ হত্যা লুঠন বা খুন-খারাবীও নয়।
ইমাম কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করে তার এরূপ ব্যাখ্যা প্রদান করেন
আমার নিজের কথা নয়- স্বয়ং আল্লাহই বলেছেন যে, তোমরা পাপাচারের বিরুদ্ধে লড়াই কর। এরই নাম জিহাদ। এই জিহাদ-ই আমাদের সকলের উপর ফরজ। কেন, আপনারা কি শুনেননি যে, ইসলাম তরবারীর জোরে নয়- মমতার জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? জিহাদের রূপ বিকৃত হয়েছে পরে। আর তা করেছে রাজা বাদশাহদের তল্পিবাহক আলেমরা। আজ খৃষ্টানরা যেমন অন্যের দেশ দখল করে নিজেদের সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তৃত করার জন্য লড়াই করাকে ক্রুসেড বলছে, তেমনি মুসলমানরাও একই উদ্দেশ্যে হত্যা-লুণ্ঠন করাকে জিহাদ আখ্যা দিচ্ছে। মূলতঃ এ সব ক্ষমতা দখলের একটি কৌশল মাত্র। নিরীহ জনসাধারণকে ধর্মের নামে উত্তেজিত করে যুদ্ধে নামিয়ে রাজা-বাদশাহরা তাদের ক্ষমতার ভিত্তি পাকাঁপোক্ত করছে মাত্র। আমি জাতিকে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে চাই।
তবে কি মিসরের আমীর সালাহুদ্দীন আইয়ুবী আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে যুদ্ধে নামিয়েছেন? প্রশ্ন করলেন একজন।
