বিপদ দেখে ফয়জুল ফাতেমীর দু প্রহরী চলে যায় তার কাছে। কক্ষের ভিতরে লড়াই শুরু হয়ে যায়। ফয়জুল ফাতেমী তরবারীর পিঠ দিয়ে আঘাত করে মেয়েটিকে আহত করে। পেট কেটে যায় তার।
ফয়জুল ফাতেমী ও তার দুই সঙ্গীকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন আলী। তিনজনকে আলাদা আলাদা প্রকোষ্ঠে বন্দী করে রাখেন। তাদেরকে রজবের কর্তিত মাথা দেখিয়ে বলেন, বন্ধুর পরিণতি দেখে নাও। তবে সরাসরি হত্যা করে আমি তোমাদের সাজা শেষ করে দেব না। দেশদ্রোহী ঈমান-বিক্রেতাদের দলে আর কে কে আছে, তোমাদের মুখ থেকে তা বের করে ছাড়ব। গাদ্দারীর পরিণতি যে কত ভয়াবহ, হাড়ে হাড়ে টের পাবে তোমরা। তোমাদেরকে আমি মরতেও দেব না, বাঁচতেও দেব না।
আহত মেয়েটির অবস্থা ভাল নয়। সর্বশক্তি ব্যয় করে তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে ডাক্তারগণ। কিন্তু তার কাটা নাড়ি-ভুড়ি জোড়া দেয়া গেল না। কিন্তু তারপরও মেয়েটি নিশ্চিন্ত-উফুল্ল, যেন তার কিছুই হয়নি। দাবি তার একটি-ই, বিদায় বেলা আহমদ কামালকে আমার শিয়রে বসিয়ে রাখুন। পলকের জন্য আহমদ কামালকে চোখের আড়ালে যেতে দিচ্ছে না সে।
সুলতান আইউবী মেয়েটিকে দেখতে আসেন। আহমদ কামাল তার মাথার কাছে বসা। সুলতান কক্ষে প্রবেশ করা মাত্র তার সম্মানার্থে উঠে দাঁড়াতে উদ্ধত হন তিনি। কিন্তু মেয়েটি খ করে তার হাত ধরে টান দিয়ে বসিয়ে ফেলে তাকে। সমস্যায় পড়ে যান। আহমদ কামাল। সুলতানের উপস্থিতিতে তিনি বসতে পারেন না। সংকোচে মাথা নুয়ে আসে তার। সুলতান তাকে মেয়েটির কাছে বসার অনুমতি দেন। সুলতান সস্নেহে মেয়েটির মাথায় হাত বুলান, সুস্থতার জন্য দোয়া করেন।
তৃতীয় রাত্র। আহমদ কামাল বসে আসেন মেয়েটির শিয়রে। হঠাৎ মেয়েটি চোখ তুলে তাকায় আহমদ কামালের প্রতি। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, “আহমদ! তুমি আমায় বিয়ে করে নিয়েছ, না? আমি আমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছি। তুমিও তোমার ওয়াদা পূরণ করেছ! আল্লাহ আমার সব পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন, ….।
কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠে মেয়েটির। আহমদ কামালের ডান হাতটি নিজের দুহাতে চেপে ধরা ছিল তার। ধীরে ধীরে শ্লথ হয়ে আসে হাতের বন্ধন। টের পান আহমদ কামাল। কালেমা তাইয়্যেবা পড়তে পড়তে আহমদ কামাল মেয়েটিকে তুলে দেন আল্লাহর হাতে। পর দিন সুলতান আইউবীর নির্দেশে মেয়েটিকে মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করা হয়।
দু দিনের নির্যাতনেই ফয়জুল ফাতেমী ও তার সঙ্গীদ্বয় দলের সকলের নাম বলে দেয়। গ্রেফতার করা হয় তাদেরও। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আসাদুল আসাদী লিখেছেন, ফয়জুল ফাতেমীর মৃত্যুদণ্ডাদেশে স্বাক্ষর দিতে গিয়ে অঝোরে কেঁদে ফেলেছিলেন সুলতান আইউবী।
প্রথম খণ্ড সমাপ্ত
২.১ বিষ
বিষ
১৯৭১ সালের ঘটনা।
কায়রোর একটি মসজিদ। মসজিদটি বেশী বড়ও নয়, তেমন ছোটও নয়। জুমার জামাত অনুষ্টিত না হলেও পাঞ্জেগানা জামাতে মুসল্লি হয় প্রচুর।
শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এ মসজিদ-এলাকায় বাস করে মধ্যম ও নিম্নবিত্তের মানুষ। ধর্মের প্রতি এখনো তারা বেশ অনুরাগী। আবেগপূর্ণ আকর্ষণীয় কথায় সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। তবে তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী মিসর এসে যেসব নতুন সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন, তাতে এই এলাকার লোকেরাই ভর্তি হয়েছিল বেশী। তার কারণ ছিল দুটি। প্রথমতঃ এটি জীবিকা নির্বাহের একটি মাধ্যম। সালাহুদ্দীন আইউবী তার সৈন্যদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতেন। দ্বিতীয়তঃ জিহাদ যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ আমল, তা তাদের ভাল করেই জানা ছিল। ইসলামের জন্য জীবন দিতে তারা প্রস্তুত থাকত সর্বক্ষণ। সে যুগে তাদের মত চেতনাসম্পন্ন মর্দে মুমিনের প্রয়োজন ছিল অপরিসীম। সরকারীভাবে তাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছিল, খৃষ্টজগত ইসলামী দুনিয়ার নাম-চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে। বীর বিক্রমে তাদের মোকাবেলা করে মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে। অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে জিহাদের ময়দানে।
ছয়-সাত মাস হল, অখ্যাত এ মসজিদটির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিক। এই খ্যাতির কারণ নতুন ইমাম, যিনি প্রতিদিন ঈশার নামাযের পর আকর্ষণীয় দরস প্রদান করছেন।
আগের ইমাম তিনদিন আগে মারা গেছেন। তিনি দুঃসহ পেটব্যাথা আর অস্ত্র জ্বালায় ভুগছিলেন। অভিজ্ঞ ডাক্তার-হেকিম কেউ-ই তার এ রোগের কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেননি। অবশেষে এ রোগেই তিনি মারা যান। তিনি একজন সাধারণ মৌলভী ছিলেন। শুধু পাঞ্জেগানা জামাতের ইমামতি করতেন। এর অতিরিক্ত কোন যোগ্যতা তার ছিল না।
ইমামের মৃত্যুর ঠিক আগের দিন অচেনা এক মৌলভী এসে হাজির হন মসজিদে। লোকটির গৌরবর্ণ চেহারা। সুঠাম দেই। মুখজোড়া ঘন লম্বা দাড়ি। সঙ্গে আপাদমস্তক কালো বোরকায় আবৃতা দুজন মহিলা। সম্পর্কে তার স্ত্রী। দুই স্ত্রী নিয়ে তিনি এতদিন কোন এক ঝুপড়িতে বাস করতেন।
আলাপ-পরিচয়ের পর আগন্তুক অত্র মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব পালন করার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। বেতন-ভাতার প্রয়োজন নেই। মুসল্লিদের খাতির-সমাদরও তার নিষ্প্রয়োজন। কারো হাদিয়া-নজরানাও গ্রহণ করবেন না। প্রয়োজন শুধু মানসম্পন্ন প্রশস্ত একটি বাসস্থান, যেন তিনি সেখানে দুই স্ত্রীসহ সম্মান ও পর্দার সাথে বাস করতে পারেন।
