মশালধারীদের পিছনে পিছনে দ্রুতগতিতে নীচে নেমে পড়েন আলী বিন সুফিয়ান ও আহমদ কামাল। রক্তের জোয়ার বইছে কক্ষে। দু হাতে পেট চেপে ধরে বসে আছে মেয়েটি। ফয়জুল ফাতেমীর সঙ্গে যে মিসরী কমান্ডার বসা ছিল, সে এবং আরেক ব্যক্তি লড়ছে ফয়জুল ফাতেমী ও তার এক প্রহরীর সঙ্গে। ফয়জুল ফাতেমীকে অস্ত্রত্যাগ করতে বললেন আলী বিন সুফিয়ান। সে হাতের তরবারী ছুঁড়ে ফেলে। আহমদ কামাল দৌড়ে যান মেয়েটির কাছে। পেট বিদীর্ণ হয়ে গেছে তার। বিছানার চাদরটি টেনে নিয়ে আহমদ কামাল মেয়েটির পেটটা কষে বেঁধে দেন এবং আলী বিন সুফিয়ানকে বললেন, অনুমতি হলে একে আমি বাইরে নিয়ে যাই। আলীর অনুমতি পেয়ে আহমদ কামাল মেয়েটিকে নিজের দু বাহুর উপর তুলে নেন। যন্ত্রণায় ছটফট করছিল মেয়েটি। বড় কষ্ট হচ্ছিল তার। তারপরও মুখে হাসি টেনে বলল, আমার কর্তব্য আমি পালন করেছি; তোমাদের আসামীকে আমি ধরিয়ে দিয়েছি।
ফয়জুল ফাতেমীকে এবং যে চারজন লোক মেয়েটিকে অপহরণ করেছিল, তাদের দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। বাকী দুজন আর ফয়জুল ফাতেমীর সঙ্গে থাকা মিসরী কমান্ডার আলী বিন সুফিয়ানের লোক।
এটি ছিল একটি নাটক। ফয়জুল ফাতেমীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করার জন্য এ নাটকটি মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। মেয়েটি সহযোগিতা করেছে পুরোপুরি। কিন্তু আহত হয় নিজে।
নাটকটি এভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল যে, মেয়েটির গ্রুপের একজন অপরজনের পরিচয় লাভের জন্য যেসব গোপন সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করার কথা, তার থেকে সেই ভাষা জেনে নেয়া হয়। মেয়েটি আরও জানিয়েছে যে, তার আগমন করার কথা ফয়জুল ফাতেমীর নিকট। আলী বিন সুফিয়ান তাঁর তিনজন বিচক্ষণ গোয়েন্দাকে কাজে লাগান। তাদের একজন ছিলেন কমান্ডার পদের লোক। তাদেরকে গোপন ভাষা শিখিয়ে দিয়ে বলা হয়, ফয়জুল ফাতেমীর নিকট গিয়ে তাকে বলবে, তিন মেয়ের একজন এখানে এসে গেছে। কিন্তু সে অমুকের হাতে অমুক ঘরে বন্দী। সেখান থেকে তাকে সহজে বের করে আনা যায়। তাদেরকে একথাও বলা হয় যে, ফয়জুল ফাতেমীকে একটি ভূয়া পয়গাম শোনাবে যে, রজব যে করে হোক, মেয়েটিকে রক্ষা করতে এবং তৎপরতা জোরদার করতে বলেছেন।
আলী বিন সুফিয়ানের নিয়োজিত গুপ্তচররা তিনদিনের মধ্যে ফয়জুল ফাতেমীর নাগাল পেতে সক্ষম হয় এবং তাকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, তারা তার গুপ্ত বাহিনীর সদস্য। ফয়জুল ফাতেমী এ আশংকাও বোধ করেন যে, বন্দী মেয়েটি নির্যাতনের মুখে তার সংশ্লিষ্টতার কথা ফাঁস করে দিতে পারে। তাই বিলম্ব না করে মেয়েটিকে উদ্ধার করে আনার পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন। আলী বিন সুফিয়ানের প্রেরিত কমান্ডারকে তিনি নিজের কাছে রেখে দেন। অবশিষ্ট তিনজনের দুজন আর নিজের দু ব্যক্তিকে নিয়ে চারজনের হাতে মেয়েটিকে তুলে আনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। মেয়েটিকে অপহরণ করে ফেরআউনী আমলের যে জীর্ণ ভবনটিতে পৌঁছিয়ে দেয়ার কথা, সে ভবনটিকে ফয়জুল ফাতেমী বেশ কিছুদিন ধরে তাদের গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
ফয়জুল ফাতেমীর এ পরিকল্পনার বিস্তারিত রিপোর্ট আলী বিন সুফিয়ানের কানে চলে আসে। কোন্ দিন কখন এই অভিযান পরিচালিত হবে, আলী বিন সুফিয়ান তা-ও অবগত হন। আহমদ কামাল ও মেয়েটিকে এই পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হয়। বলা হয়, এ রাতে মেয়েটিকে অপহরণ করা হবে। তোমরা বারান্দায় ঘুমাবে। আক্রমণ হলে প্রতিরোধের চেষ্টা করবে না।
মেয়ে ও আহমদ কামালের বাসস্থানের বাইরে প্রহরায় নিয়োজিত লোকটি গোয়েন্দা বিভাগের একজন সদস্য। কোন রাতে কিভাবে আক্রমণ হবে, তার কী করণীয়, সব তার জানা ছিল। আক্রমণকারীরা ছিল আলী বিন সুফিয়ানের লোক। ফয়জুল ফাতেমীর লোক ইলে খঞ্জরের আঘাতে তাকে খুন করত আগে।
এ রাতে ফয়জুল ফাতেমী ও কমান্ডার জীর্ণ ভবনে চলে যান। নির্দিষ্ট সময়ে অপহরণ অভিযান শুরু হয়। পাহারাদার আগেই এক দিকে কেটে পড়ে। অপহরণকারী দেয়াল টপকে ভিতরে প্রবেশ করে। আহমদ কামাল জাগ্রত । কিন্তু ঘুমের ভান করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকেন। মেয়েটিকে তুলে নিয়ে অপহরণকারীরা যখন তার হাত-পা বাঁধতে শুরু করে, তখন তিনি ছটফট করতে শুরু করেন। অপহরণকারীরা মেয়েটিকে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছিয়ে দেয়।
অপহরণের পর আলী বিন সুফিয়ান এসে আহমদ কামালের হাত-পায়ের বন্ধন খুলে। দেন। পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল। অল্পক্ষণ পর তারা ফয়জুল ফাতেমীর আস্তানা অভিমুখে রওনা হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক তারা ভবনটিকে ঘিরে ফেলেন।
ভিতর থেকে আলী বিন সুফিয়ানেরই এক ব্যক্তি তাদের দেখে কক্ষে গিয়ে ফয়জুল ফাতেমীকে সংবাদ দেয়। ফয়জুল ফাতেমীকে কক্ষের বাইরে নিয়ে এসে অবরোধ দেখিয়ে তাকে কক্ষে চলে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়। তার-ই পরামর্শে ফয়জুল ফাতেমী বের হওয়ার চেষ্টা না করে তার গোপন কক্ষে চলে যায়।
লোকটি আলী বিন সুফিয়ান ও আহমদ কামালকে ভিতরে নিয়ে যায়। পথ দেখিয়ে পৌঁছিয়ে দেয় ফয়জুল ফাতেমীর কক্ষে। ঠিক শেষ মুহূর্তে ফয়জুল ফাতেমী বুঝতে পারে যে, মিসরী কমান্ডার এবং মেয়েটির সংবাদ নিয়ে আসা দুই ব্যক্তি আসলে তার দলের লোক নয়। তিনি প্রতারণার শিকার। মেয়েটি একটি ভুল করেছে, তার মুখ থেকে এমন কিছু কথা বেরিয়ে গেছে, যাতে ফয়জুল ফাতেমী বুঝে ফেলেছেন, সে-ও এ প্রতারণায় জড়িত।
