ফয়জুল ফাতেমী দুজনের নাম বললেন এবং মুচকি হেসে বললেন, তোমাকে উচ্চ পর্যায়েই কাজ করতে হবে। আপাততঃ তোমার দায়িত্ব দুজন কর্মকর্তার মাঝে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা আর দুজনকে বিষ খাওয়ানো, তোমার পক্ষে তা একেবারে সহজ। তবে সমস্যা হল, তোমাকে প্রকাশ্য সভা-সমাবেশে নিতে পারব না। তোমাকে পর্দানশীল মুসলিম নারীর বেশ ধরে কাজ করতে হবে। নতুবা ধরা পড়ে যাবে। এমনও হতে পারে, আমি তোমাকে ফিলিস্তীন ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে তোমার স্থলে অন্য মেয়ে আনিয়ে নেব, যাকে এখানকার কেউ চিনবে না। আমি যে গ্রুপ তৈরি করেছি, তার সদস্যরা অত্যন্ত বিচক্ষণ, অতীব তৎপর। সালারের নীচের কমান্ডার পর্যায়ের লোক তারা। এই চার ব্যক্তি–যারা এত বীরত্বের সাথে তোমাকে তুলে আনল–সে গ্রুপের-ই লোক।
আইউবীর বাহিনীতে আমরা অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেয়ার কাজ শুরু করেছি। সেনাবাহিনী ও জনগণের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করা জরুরী। বর্তমান অবস্থাটা হল, সিরীয় ও তুর্ক বাহিনী সদাচার, উন্নত চরিত্র এবং যুদ্ধের স্পৃহার কারণে মিসরীদের কাছে বেশ সমাদৃত ও শ্রদ্ধার পাত্র। সুদানীদেরকে পরাজিত করে তারা নগরবাসীদের মনে আরো শক্ত আসন গেড়ে নিয়েছে। সেনাবাহিনীর এই মর্যাদাকে আমাদের ক্ষুণ্ণ করতে হবে। অপদস্থ করতে হবে সালার ও অপরাপর সামরিক কর্মকর্তাদের। এছাড়া আমরা ক্রুসেডার ও সুদানীদের আর কোন সাহায্য করতে পারি না। সরাসরি আক্রমণ কখনো সফল হবে না।
আইউবীর সেনাবাহিনী তাকে কামিয়াব হতে দিবে না। দেশের জনগণ সঙ্গ দেবে সেনাবাহিনীর। মিসরের একদিক থেকে যদি খৃষ্টানরা আর অপরদিক থেকে সুদানীরা একযোগেও হামলা চালায়, তবু আইউবীকে তারা পরাস্ত করতে পারবে না। তখন দেশের জনগণ আর সেনাবাহিনী মিলে কায়রোকে একটি শক্তিশালী দুর্গে পরিণত করবে। কায়রোকে জয় করার জন্য আগে আমাদের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। জনসাধারণের চিন্তা-চেতনায় অলিক ধ্যান-ধারণা ও সংশয় প্রবণতা এবং যুবকদের চরিত্রে যৌনপূজা ও লাম্পট্য সৃষ্টি করতে হবে।
আমাকে তো অবহিত করা হয়েছিল, এ কাজ দুবছর ধরে চলে আসছে। বলল মেয়েটি।
তা ঠিক। বেশ সাফল্যও অর্জিত হয়েছে। আগের তুলনায় অপকর্ম বেড়েছে। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবী একে তো নতুন ধরনের মাদ্রাসা খুলেছেন, দ্বিতীয়তঃ মসজিদগুলোতে খোতবা থেকে খলীফার নাম তুলে দিয়ে ভিন্ন এক চমক সৃষ্টি করেছেন। তাছাড়া তিনি মেয়েদেরকেও সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেছেন। বললেন ফয়জুল ফাতেমী।
ফয়জুল ফাতেমী আরো কি যেন বলতে চাইছিলেন। এমন সময়ে একজন প্রহরী হন্তদন্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ফয়জুল ফাতেমীকে বলে, এ মুহূর্তে আপনি বেরুবেন না। বাইরে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ফয়জুল ফাতেমী ঘাবড়ে যান। প্রহরীর সঙ্গে কক্ষের বাইরে চলে আসেন। একটি উঁচু জায়গায় চুপিসারে বসে বাইরের দিকে তাকান। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। দিনের আলোর ন্যায় বাইরের সবকি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ইতিউতি তাকিয়ে তিনি বললেন, এ যে আইউবীর সৈন্য। ঘোড়ও তো আছে দেখছি! চারদিক ভাল করে দেখে আস, আমি কোন দিক দিয়ে পালাতে পারি।
দেখা আমার হয়ে গেছে। কোন দিকে পালাবার পথ নেই। তারা পুরো প্রাসাদ ঘিরে রেখেছে। আপনি ওখানেই চলে যান। বাতিগুলো নিভিয়ে দিন। ওখান থেকে বের হলে ভুল করবেন। শর্করা ঐ পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে না। বলল প্রহরী।
ফয়জুল ফাতেমী অদৃশ্য হয়ে যান। প্রহরী উঁচুস্থান থেকে নেমে ভিতরে না গিয়ে দেয়ালের গা ঘেঁষে সন্তর্পণে বাইরে বেরিয়ে যায়। বাইরে পঞ্চাশজন পদাতিক সৈনিক। অশ্বারোহী বিশ-পঁচিশজন। তারা গোটা প্রাসাদটিকে অবরোধ করে রেখেছে। লোকটি পা টিপে টিপে চলে যায় তাদের নিকট। এক সৈনিককে জিজ্ঞেস করে আলী বিন সুফিয়ান কোথায়? ইংগিতে আলীকে দেখিয়ে দেয় সৈনিক। প্রহরী দৌড়ে যায় তার কাছে। আলীর সঙ্গে আহমদ কামাল। প্রহরী বলল, ভিতরে কোন আশংকা নেই। আপনার সঙ্গে আর দুজন লোক হলেই চলবে। আমার সঙ্গে আসুন।
যে চারজন লোক মেয়েটিকে অপহরণ করে এনেছিল, এ প্রহরী তাদেরই একজন।
দুটি মশাল প্রজ্বলিত করান আলী। আহমদ কামাল এবং চার সৈনিককে সঙ্গে নেন। দুজনের হাতে দুটি মশাল ধরিয়ে দেন, তরবারী কোষমুক্ত করেন সকলে। প্রহরীর পিছনে পিছনে ঢুকে পড়েন ভিতরে। ফয়জুল ফাতেমীর প্রহরী এখন আলী বিন সুফিয়ানের রাহ্বার। হঠাৎ কে একজন একদিক থেকে ছুটে এসে শাঁ করে চলে যায় ভিতরে। রাহবর বলল, এই যে গেল, বেটা ওদের লোক। টের পেয়ে ভিতরের লোকদেরকে সতর্ক করতে গেল। আপনারা আরো দ্রুত হাঁটুন। তীব্রবেগে এগিয়ে চললেন তারা। পথ দেখিয়ে নেয়ার কেউ না থাকলে এই আঁকা-বাঁকা পথে ঢুকে তারা দিশে হারিয়ে ফেলত কিংবা ভয়ে পালাতে বাধ্য হত। কিন্তু এখন তারা রাহবরের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দেই অগ্রসর হচ্ছে। অন্য একদিক থেকে দৌড়ে এল আরেকজন। পার্শ্ব দিয়ে যেতে যেতে বলে গেল, আমি ওদিকে যাচ্ছি। আপনারা আরো তাড়াতাড়ি আসুন। এ লোকটি রাহবরের সঙ্গী।
নীচে অবতরণের সিঁড়ির পার্শ্বের কক্ষে পৌঁছে যান আলী। নীচের কক্ষ থেকে কথার শব্দ ভেসে আসে তার কানে, আমরা প্রতারণার শিকার। এরা দুজন ওদের লোক। তারপর তরবারীর সংঘর্ষের শব্দ শোনা গেল। সঙ্গে কথা বলার আওয়াজ, একেও শেষ করে দাও, যেন কোন সাক্ষ্য দিতে না পারে।
