তারা চারজন। ঘরের দরজা ছিল বন্ধ। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে যায় একজন। আরেকজন তার কাঁধে পা রেখে দেয়াল টপকে প্রবেশ করে ভিতরে। ভিতর থেকে দরজা খুলে দেয় সে। বাকী তিনজনও ঢুকে পড়ে ভিতরে।
চারজনের মধ্যে অধিক সবল লোকটি মুখে কাপড় বেঁধে দেয় মেয়েটির। জাগতে না জাগতে মেয়েটিকে সে ঝাঁপটে ধরে কাঁধে তুলে নেয়। অপর তিনজন আহমদ কামালের মুখেও কাপড় পেঁচিয়ে, রশি দিয়ে হাত-পা শক্ত করে বেঁধে খাটের উপর-ই ফেলে রাখে। প্রতিরোধ করার সব সুযোগ বন্ধ করে দেয় তার। বাইরে নিয়ে গিয়ে মোটা কম্বল দিয়ে জড়িয়ে নেয়া হয় মেয়েটিকে, যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে, কাঁধের বস্তুটি মানুষ।
শহর থেকে চার-পাঁচ মাইল দূরে ফেরআউনী আমলের জীর্ণ-পরিত্যাক্ত বিশাল এক বাড়ি। বাড়ি তো নয়, যেন এক ভুতের নগরী। ভীতিকর অনেক রূপকথা শোনা যায় বাড়িটির ব্যাপারে। যেমনঃ ভিতরে আছে উঁচু একটি পাথরের টিলা। এই টিলা কেটে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য কক্ষ। তার নীচে আছে আরো বেশ কটি কক্ষ। বাড়িটি সম্পর্কে যার সম্যক ধারণা আছে, ভিতরে প্রবেশ করে সে-ই কেবল ফিরে আসতে পারে। অন্যথায় মৃত্যু অবধারিত। পথ-ঘাট কোন্ দিক থেকে কোন্ দিকে গেছে, ঠাহর রাখা দুষ্কর। দীর্ঘদিন ধরে এ বাড়িতে প্রবেশ করার সাহস করছে না কেউ। বাড়িটি এখন জিন-ভূত, দৈত্য-দানবের আবাস। সাপ-খোপ যে কত কি আছে, তার তো কোন ইয়ত্তা-ই নেই। সাপের ভয়ে বাড়ির পাশ দিয়েও হাঁটে না কেউ। এমনি আরো অনেক ভীতিপ্রদ কল্প-কাহিনী।
তথাপি এই চারজন মেয়েটিকে অপহরণ করে নিয়ে এই ভুতের বাড়িতে-ই ঢুকে পড়ে এবং বেরও হয় এমনভাবে যেন এখানেই তাদের বাস।
মেয়েটিকে নিয়ে তারা বাড়িটির গুহাসম কক্ষাদি ও আঁকা-বাঁকা ঘোর অন্ধকার অলি-গলি অতিক্রম করে অবাধে-অনায়াসে শাই শাই করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। সামনে কতগুলো প্রদীপ জ্বলছে। তাদের পায়ের আওয়াজে চামচিকাগুলো উড়াউড়ি, ফড়ফড় করতে শুরু করে । টিকটিকি ও সরিসৃপগুলো ইতস্ততঃ ছুটাছুটি করে পালাতে থাকে। মাকড়সার জাল আর ময়লা-আবর্জনায় ভিতরটা পরিপূর্ণ।
মেয়েটিকে নিয়ে তারা পাথর কেটে নির্মিত একটি কক্ষে প্রবেশ করে। দীপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক। আলো দিয়ে পথ দেখিয়ে আগে হাঁটতে শুরু করে লোকটি।
সামনে নীচে অবতরণের কয়েকটি সিঁড়ি। তারা সিঁড়ি বেয়ে নেমে পড়ে। একদিকে মোড় নিয়ে ঢুকে পড়ে প্রশস্ত একটি কক্ষে। মেঝেতে বিছানা পাতা। বহুমূল্যের মনোরম একটি শতরঞ্জী শোভা পাচ্ছে তাতে। কক্ষটি বেশ সাজানো-গোছানো পরিপাটি। বিছানায় রেখে মুখের কাপড় সরিয়ে দেয়া হয় মেয়েটির। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মেয়েটি বলে, আমার সঙ্গে এরূপ ব্যবহার করা হল কেন? আমি মরে যাব, কাউকে আমার কাছে আসতে দেব না।
ওখান থেকে যদি তুলে না আনা হত, তাহলে আগামীকাল-ই তোমাকে জল্লাদের হাতে অর্পণ করা হত। আমার নাম ফয়জুল ফাতেমী। তোমাকে আমার নিকট-ই আসবার কথা ছিল। আর দুজন কোথায়? তুমি একা ধরা পড়লে কিভাবে? রজব কোথায়? বলল এক ব্যক্তি।
নিশ্চিন্ত হল মেয়েটি। বলল, “আমি যীশুর কৃতজ্ঞতা আদায় করছি। বড় বড় ভয়ানক বিপথ থেকে রক্ষা করে শেষ পর্যন্ত আমায় তিনি গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দিলেন! এই বলে মেয়েটি ফয়জুল ফাতেমীর নিকট রজব, হাবশী গোত্র, মরুঝড়, সঙ্গী দুমেয়ের করুণ। মৃত্যু ও আহমদ কামালের হাতে ধরা পড়া পর্যন্ত সব কাহিনী আনুপুংখ বিবৃত করে। ফয়জুল ফাতেমী তাকে সান্ত্বনা দেন এবং যে চার ব্যক্তি মেয়েটিকে অপহরণ করে এনে দিয়েছে, ছয়টি করে সোনার টুকরা দিয়ে বললেন, তোমরা নিজ নিজ পজিশনে অবস্থান নাও। আমি কিছুক্ষণ পরে চলে যাব। এই মেয়েটি তিন-চারদিন এখানে থাকবে। আমি রাতে রাতে আসব। বাইরের খোঁজাখুঁজি শেষ হয়ে গেলে ওকে এখান থেকে নিয়ে যাব।
অপহরণকারী চার ব্যক্তি চলে যায় এবং ভবনটির চারদিকে এমনভাবে অবস্থান নিয়ে বসে, যেন বাইরের পরিস্থিতির উপর নজর রাখা যায়।
ফয়জুল ফাতেমীর সঙ্গে এক ব্যক্তি থেকে যান । ইনি মিসরী ফৌজের একজন কমান্ডার। ফয়জুল ফাতেমী তার এই সাফল্যে বেশ উৎফুল্ল। পাশাপাশি অপর মেয়ে দুটোর মৃত্যুতে শোকাহতও বটে। রজবের পরিণতির সংবাদ এখনো তার কানে পৌঁছেনি। তিনি বললেন, রজবকে ওখান থেকে বের করে আনা আবশ্যক। সে সালাহুদ্দীন আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ানকে হত্যা করার একটা আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু তার বিস্তারিত বিবরণ আমি এখনো জানতে পারিনি। সম্ভবতঃ ফেদায়ীদের সঙ্গে তার চুক্তি হয়েছে। এ দুটো লোককে হত্যা করা এ মুহূর্তে বড় প্রয়োজন। এখন আমার নতুন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে কাল-ই আমি তোমাকে বিষয়টি অবহিত করব। এখন তুমি বিশ্রাম কর, আমি এখন যাই।
আপনার উপর সালাহুদ্দীন আইউবীর আস্থা আছে কেমন? জিজ্ঞেস করে মেয়েটি।
এত বেশী যে, নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারেও তিনি আমার পরামর্শ নেন। জবাব দেন ফয়জুল ফাতেমী।
আমি জানতে পারলাম যে, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে সালাহুদ্দীন আইউবীর ওফাদার লোকের সংখ্যা-ই অধিক। আর সেনাবাহিনীও তার অনুগত। বলল মেয়েটি।
কথা ঠিক। তাঁর গোয়েন্দা বিভাগ, এত-ই বিচক্ষণ ও সতর্ক যে, কোথাও কেউ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেই তার খবর হয়ে যায়। তবে পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে আরো দুজন লোক আছেন, যারা আইউবীর বিরুদ্ধে কাজ করছেন। মুহতারাম ফয়জুল ফাতেমী আপনাকে তাদের নাম বলতে পারবেন। বলল মিসরী কমান্ডার।
