আলী বিন সুফিয়ানকে উদ্দেশ করে মেয়েটি বলল, বলুন, আমাকে কী করতে হবে। আমিও দেখে ছাড়ব, মুসলমান প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কতটুকু পরিপক্ক । আমার আরো একটি শর্ত হল, অভিযানে আহমদ কামাল আমার সঙ্গে থাকবেন।
আলী বিন সুফিয়ান মেয়েটির এ শর্তও মেনে নেন এবং আহমদ কামাল ও মেয়েটির বাসস্থানের ব্যবস্থা করার আদেশ দেন। তারপর কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিয়ে আহমদ কামালের উপস্থিতিতে মেয়েটিকে তার কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত করতে শুরু করেন।
***
তিনদিনের মাথায় আলী বিন সুফিয়ানের প্রেরিত ছয়জন সৈনিক গন্তব্যে পৌঁছে যায়। তিন খৃষ্টান মেয়ে যেখান থেকে পলায়ন করেছিল, রজব যেখানে বন্দী আছে, হাবশীদের সেই দেবমন্দিরে এসে তারা উপনীত হয়। তারা সব কজন-ই উষ্ট্রারোহী। ছদ্মবেশে নয় এসেছে তারা মিসরী ফৌজের পোষাকে। হাতে তাদের বর্শা ও তীর-তলোয়ার। পরিকল্পনা মোতাবেক তারা সরাসরি হাবশীদের দুর্গে ঢুকে পড়ে। হঠাৎ কোন দিক থেকে যেন একটি বর্শা এসে তাদের সম্মুখে মাটিতে বিদ্ধ হয়। এর অর্থ, থাম, আর এক পা-ও এগুবে না। তোমরা আমাদের দ্বারা অবরুদ্ধ । তারা থেমে যায়। পুরোহিত সামনে এসে দাঁড়ায়। সঙ্গে তার তিনজন হাবশী। হাতে তাদের বর্শা। পুরোহিত সতর্ক করে দিয়ে বলে, তোমরা আমার গুপ্ত তীরন্দাজদের কবলে আছ। বাড়াবাড়ি করলে একজনও জীবন নিয়ে ফিরতে পারবে না।
তারা অস্ত্র সমর্পণ করে। হাতের বর্শা-তীর-তরবারী হাবশীদের সামনে ফেলে দেয়। উটের পিঠ থেকে নেমে আসে। কমান্ডার হাবশী পুরোহিতের সঙ্গে মোসাফাহা করে বলেন, আমরা আপনার সুহৃদ। বন্ধুত্ব নিয়েই ফিরে যাব। আচ্ছা, মেয়ে তিনজনকে বলি দিয়েছেন আপনি?
কম্পিত কণ্ঠে পুরোহিত জবাব দেন, না, কোন মেয়েরই বলি হয়নি! তা আপনি জিজ্ঞেস করছেন কেন?
আমরা মিসরী ফৌজের বিদ্রোহী সেনা। আমরা আপনাদের দেবতার অপমানের প্রতিশোধ নিতে চাই। আপনাদের লোকেরা আমাদের বলেছে যে, দেবতার সমীপে নারী বলি না হওয়া-ই নাকি আপনাদের পরাজয়ের কারণ। আমরা রজবের সঙ্গে ছিলাম। আমরা তাকে বলেছিলাম, তিনটি ফিরিঙ্গী মেয়ে অপহরণ করে নিয়ে আসব এবং একটির স্থানে তিনটি মেয়ে বলি দিয়ে দেবতার কুমীরদের খাওয়াব। পরিকল্পনা মোতাবেক বহু দূর থেকে তিনটি মেয়ে অহরণ করে এনে আমরা তার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। মেয়েদের নিয়ে সে এখানে চলে এসেছিল। বলির কাজ সম্পন্ন হল কি-না আমরা তার খোঁজ নিতে এলাম। বললেন কমাণ্ডার।
ফাঁদে আটকে যান পুরোহিত। বললেন, রজব আমাদের সঙ্গে বেঈমানী করেছে। তিনটি মেয়ে সে নিয়ে এসেছিল ঠিক, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কু-মতলব পেয়ে বসে তাকে। বলির জন্য আমার হাতে অর্পণ না করে বেটা ভাগিয়ে দিয়েছে ওদের। ধরা পড়ে গেছে । নিজে। আমরা তাকে পাপের উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছি। আচ্ছা, তোমরা কি আমাকে দুটি মেয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পার? দেবতাদের অসন্তোষ যে দিন দিন বেড়েই চলেছে।
পারব মানে? অবশ্যই পারব। আপনি অপেক্ষা করুন; দেখবেন, অল্প কদিনের মধ্যেই আমরা মেয়ে নিয়ে হাজির হব। আমাদেরকে রজবের কাছে নিয়ে চলুন। মেয়েগুলো কোথায় আছে তাকে জিজ্ঞেস করি। বললেন কমাণ্ডার।
তাদের সকলকে ভিতরে নিয়ে যান পুরোহিত। এক স্থানে চওড়া ও গোলাকার একটি মাটির পাত্র। সেটি আরেকটি পাত্র দিয়ে ঢাকা। পুরোহিত উপরের পাত্রটি তুলে সরিয়ে রেখে নীচের পাত্রে হাত দেন। আস্তে আস্তে হাত বের করে আনেন। হাতে রজবের মাথা। মুখমন্ডলের আকৃতি সম্পূর্ণ অবিকৃত। চোখ দুটো আধা-খোলা। মুখ বন্ধ। টপটপ করে পানি ঝরছে মাথা থেকে। এগুলো কেমিক্যাল। মাথাটা যাতে নষ্ট না হয়, তার জন্য কেমিক্যাল দিয়ে রাখা হয়েছে। পুরোহিত বললেন, দেহটি কুমীরদের খেতে দিয়েছি। এর সঙ্গীদেরও আমরা জীবন্ত ঝিলে নিক্ষেপ করেছি। অভুক্ত কুমীরগুলো খেয়ে ফেলেছে ওদের।
মাথাটা আমাদেরকে দিয়ে দিন, সঙ্গীদের নিয়ে দেখাব আর বলব, যে-ই আংগুকের দেবতার অবমাননা করবে, তাকেই এই পরিণতি ভোগ করতে হবে। বললেন কমাণ্ডার।
দিতে পারি। তবে শর্ত হল, সূর্যাস্তের আগে-ই ফিরিয়ে দিতে হবে। আংগুকের দেবতা এর মালিক। ফেরত না দিলে তোমার মাথাটাও কিন্তু বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বললেন পুরোহিত।
***
তিনদিন পর। রজবের কর্তিত মস্তক পড়ে আছে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পায়ের কাছে। গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান সুলতান।
সে রাতের-ই ঘটনা। বারান্দায় শুয়ে আছেন আহমদ কামাল ও মেয়েটি। ছদিন ধরে দুজনে তারা থাকছেন একত্রে। মেয়েটির দাবী অনুযায়ী আহমদ কামালকে রাখা হয়েছে তার সাথে এক ঘরে। মেয়েটি বলছে, এক্ষুণি সে মুসলমান হতে প্রস্তুত। আহমদ কামালকে সে বিয়ের জন্য তাড়া দিচ্ছে। কিন্তু আহমাদ কামাল বলছেন, আগে কর্তব্য পালন কর; তারপর বিয়ে। মেয়েটি আশংকা ব্যক্ত করে যে, কাজ উদ্ধার করে তাকে ধোকা দেয়া হবে। আহমদ কামাল এখনও তাকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এতদিনে মেয়েটির মনের সব ভয় দূর হয়ে গেছে। এখন শান্ত মনে ভাবতে পারছে সে।
আহমদ কামাল ও মেয়েটি ঘুমিয়ে আছে বারান্দায়। বাইরে প্রহরায় নিয়োজিত একজন সিপাহী। মধ্য রাতের খানিক আগে প্রহরী হাঁটতে হাঁটতে সরে যায় অন্যদিকে। এমন সময়ে কে যেন পিছন থেকে ঘাড় চেপে ধরে মেয়েটির। সঙ্গে সঙ্গে কাপড় বেঁধে দেয়া হয় তার মুখে। রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয় তার হাত-পা।
