রাতভর মেয়েটি খৃষ্টানদের গোপন কার্যক্রম ও মুসলমানদের ঈমান বেচাকেনার বিস্তারিত বিবরণ শোনাতে থাকে, আর আহমদ কামাল তন্ময় হয়ে তা শুনতে থাকেন।
***
পরদিন সূর্যাস্তের আগেই কায়রো পৌঁছে যায় কাফেলা। আহমদ কামাল আলী বিন সুফিয়ানের নিকট যান এবং মেয়েটির ব্যাপারে সম্পূর্ণ রিপোর্ট পেশ করেন। আহমদ কামাল আরো জানান, রজব এখন হাবশীদের কাছে। হাবশীরা যে স্থানে নারী বলি দিয়ে থাকে, রজব সেখানে তার আস্তানা গেড়েছে। আহমদ কামাল আলী বিন সুফিয়ানকে আরো বলেন, যদি আদেশ হয়, তাহলে আমি রজবকে জীবিত কিংবা মৃত ধরে আনতে পারি। কিন্তু আলী বিন সুফিয়ান সে আদেশ তাকে দিলেন না। কারণ, এরূপ অভিযানের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিচক্ষণ ও সুদক্ষ স্বতন্ত্র বাহিনী-ই তার আছে। রজব পর্যন্ত পৌঁছানোর পন্থাও আহমদ কামাল আলীকে অবহিত করেন। রজবকে ধরে আনার জন্য তিনি আগেই একটি বাহিনী সুদান পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার আগে তিনি ছয়জন অতীব বিচক্ষণ সৈন্যকে রজবকে ধরে আনার জন্য আংগুক অভিমুখে রওনা করান। আহমদ কামালকে বিশ্রামের জন্য পাঠিয়ে দেন। মেয়েটিকে ডেকে আনেন নিজের কাছে।
আলী বিন সুফিয়ান আহমদ কামালকে ডেকে পাঠিয়ে তাকে মেয়েটির সামনে বসিয়ে দেন। মুচকি একটি হাসি দিয়ে কথা বলতে শুরু করে মেয়েটি। কোন কথা-ই গোপন রাখল না সে। শেষে বলল, আমাকে যদি মৃত্যুদন্ড-ই দিতে হয়, তাহলে আমার একটি অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করতে হবে। আমি আহমদ কামালের হাতে মরতে চাই। মেয়েটি আহমদ কামালের এত অনুরক্ত কেন হল, তার বিবরণও দিল সে।
আলী বিন সুফিয়ান মেয়েটিকে কারাগারে প্রেরণের পরিবর্তে আহমদ কামালের হাতে অর্পণ করে নিজে সুলতান আইউবীর নিকট চলে যান। মেয়েটির সব কথা তিনি আইউবীকে অবহিত করেন। বলেন, আপনার অতিশয় নির্ভরযোগ্য সেনাকর্মকর্তা ফয়জুল ফাতেমী আমাদের দুশমন। তার-ই নিকট আগমনের পরিকল্পনা ছিল মেয়েদের। সুলতান আইউবী প্রথম বললেন, হয়ত বা মেয়েটি মিথ্যে বলছে। তোমাকে সে বিভ্রান্ত করছে। আমার জানামতে ফয়জুল ফাতেমী এমন ধারার লোক নয়।
আমীরে মুহতারাম! আপনি ভুলে গেছেন যে, লোকটি ফাতেমী। বোধ হয় এ কথাটাও আপনার মনে নেই যে, ফাতেমী ও ফেদায়ীদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক। এরা। আপনার অনুগত হতেই পারে না। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
গভীর চিন্তায় হারিয়ে যান সুলতান আইউবী। সম্ভবতঃ তিনি ভাবছিলেন, এমন হলে বিশ্বাস করব কাকে? কাজ-ই বা করব কাদের নিয়ে কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, আলী! ফয়জুল ফাতেমীকে গ্রেফতার করার অনুমতি আমি তোমায় দেব না। তুমি এমন কৌশল অবলম্বন কর, যেন অপরাধ করা অবস্থায় তাকে হাতে-নাতে ধরা যায়। আমি তাকে স্পটে গ্রেফতার করতে চাই। আর সে পরিস্থিতি সৃষ্টি করার দায়িত্ব তোমার। ফয়জুল ফাতেমী যুদ্ধের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কর্মকর্তা। রাজ্যের সমর বিষয়ক সব তথ্য তার কাছে। লোকটি এত জঘন্য অপরাধের অপরাধী কি-না অতি শীঘ্র আমি তার প্রমাণ চাই।
আলী বিন সুফিয়ান গোপন তথ্য সগ্রহে অভিজ্ঞ। এটি তার সৃষ্টিগত প্রতিভা। তিনি কৌশল খুঁজে বের করলেন এবং সুলতান আইউবীকে বললেন, মেয়েটি যেসব বিপদ অতিক্রম করে এসেছে, তার ভীতি তার মন-মানসিকতাকে বিধ্বস্ত করে তুলেছে এবং আহমদ কামালের প্রতি সে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছে। কারণ, আহমদ কামাল তাকে বিপদসংকুল পথ থেকে উদ্ধার করেছে এবং তার সঙ্গে এমন পবিত্র আচরণ করেছে যে, তাতে মুগ্ধ হয়ে মেয়েটি এখন তাকে ছাড়া কথা-ই বলছে না। আমার আশা, আমি এই মেয়েটিকে কাজে লাগাতে পারব।
চেষ্টা করে দেখ। কিন্তু মনে রেখ, সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া ফয়জুল ফাতেমীকে গ্রেফতার করার অনুমতি আমি তোমাকে কিছুতেই দেব না। ফয়জুল ফাতেমীর মত লোক দুশমনের ক্রীড়নক হয়ে গেছে, একথা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। বললেন সুলতান আইউবী।
আলী বিন সুফিয়ান চলে যান মেয়েটির কাছে। তাকে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান। জবাবে মেয়েটি বলল, আহমদ কামাল যদি বলেন, তাহলে আগুনে ঝাঁপ দিতেও আমি প্রস্তুত। সামনে উপবিষ্ট আহমদ কামাল বললেন, না, ইনিযেভাবে যা বলেন, তুমি তা-ই কর। পরিকল্পনাটা ভাল করে বুঝে নাও। আবেগমুক্ত হয়ে কাজ কর।
কিন্তু এর পুরস্কার আমি কী পাব? জিজ্ঞেস করে মেয়েটি।
তোমাকে পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে ফিলিস্তীনের দুর্গ শোবকে পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। আর এখানে যে কদিন থাকবে, তোমাকে মর্যাদার সঙ্গে রাখা হবে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
নাহ, এ পুরস্কার যৎসামান্য। আমি যা চাইব, তা-ই আমাকে দিতে হবে। আমি ইসলাম গ্রহণ করব আর আহমদ কামাল আমাকে বিয়ে করে নেবেন। বলল মেয়েটি।
দাবীর দ্বিতীয় অংশটি সরাসরি নাকচ করে দেন আহমাদ কামাল। আলী বিন সুফিয়ান আহমদ কামালকে বাইরে নিয়ে যান। আহমদ কামাল বললেন, মেয়েটি মুসলমান হয়ে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরও আমি তাকে দুশমন মনে করব। আলী বিন সুফিয়ান বললেন, দেশ ও জাতির নিরাপত্তার স্বার্থে এতটুকু তোমাকে ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। আহমদ কামাল সম্মতি দেন। কক্ষে প্রবেশ করে তিনি মেয়েটিকে বললেন, আমি যেহেতু এ যাবত তোমাকে অবিশ্বাস করে আসছি, তাই তোমাকে বিয়ে করতে আমি অস্বীকার করেছি। কিন্তু যদি তুমি প্রমাণ দিতে পার যে, আমাদের ধর্মের জন্য তোমার ত্যাগ স্বীকার করার স্পৃহা আছে, তাহলে আমি আজীবন তোমাকে ভালোবেসে যাব।
