আমার আশংকা ছিল, রাতে আপনি আমায় উত্যক্ত করবেন। স্বপ্নে আমি কুমীর দেখলাম, হাবশী-হায়েনা ও মরুঝড়ের তান্ডব দেখলাম। ভয় পেয়ে উঠে বসলাম। আপনি আমায় বুকের সঙ্গে লাগিয়ে নিলেন, শিশুদের ন্যায় গল্প শুনিয়ে আমাকে শান্ত করলেন, ঘুম পাড়ালেন। শেষ রাতে জেগে দেখলাম, আপনি আল্লাহর সমীপে সেজদায় পড়ে আছেন। যখন আপনি দুআর জন্য হাত উঠালেন, চোখ বন্ধ করলেন, তখন আপনার চেহারায় যে আনন্দ, প্রশান্তি আর দ্যুতি আমি দেখতে পেলাম, ইতিপূর্বে আর কখনো এমনটি দেখিনি কারুর মুখে। আমি সন্দেহে পড়ে গেলাম, আপনি মানুষ না ফেরেশতা। এতগুলো স্বর্ণমুদ্রা আর আমার মত যুবতী থেকে কোন মানুষ তো বিমুখ হতে পারে না!
আপনার মুখমন্ডলে আমি যে প্রশান্তি ও দীপ্তি দেখেছিলাম, তা আমার দুচোখে অশ্রুর বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। আপনাকে আমি জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, এ প্রশান্তি আপনাকে কে দিল? কিন্তু কেন যেন প্রশ্নটা চেপে গেলাম। আপনার অস্তিত্বে আমি এত প্রভাবান্বিত হয়ে পড়েছিলাম যে, আসল সত্য গোপন রেখে আপনাকে ধাঁধার মধ্যে রাখতে চাইলাম না। আমি চেয়েছিলাম, নিজের সব ইতিবৃত্ত আপনার কাছে প্রকাশ করি। বিনিময়ে আপনি আপনার এই চরিত্র-মাধুর্য আর এই প্রশান্তির পরশ দিয়ে আমার হৃদয়ের সব ভীতি, সব যন্ত্রণা দূর করে দেবেন। কিন্তু আপনি আমার কথা শুনলেন না; আপনার কর্তব্য-ই ছিল আপনার কাছে প্রিয়।
আবেগের আতিশয্যে মেয়েটি আহমদ কামালের হাত চেপে ধরে এবং বলে, একেও হয়ত আপনি আমার প্রতারণা মনে করবেন। কিন্তু আপনার প্রতি আকুল নিবেদন, আমাকে সঠিকভাবে বুঝতে চেষ্টা করুন, আমার হৃদয়ের কথাগুলো শুনুন। আপনার থেকে আর আমি বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। কাল আপনাকে পাপের আহ্বান জানিয়ে আমি বলেছিলাম, আপনি আমাকে দাসী বানিয়ে নিন। কিন্তু আজ নিতান্ত পবিত্র মনে আমি বলছি, যতদিন আমি বেঁচে থাকব, আমি আপনার-ই পায়ে পড়ে থাকব। দাসী হয়ে আমি আপনার সেবা করব। বিনিময়ে আমি চাই শুধু সেই প্রশান্তি, যা নামায পড়ার সময় আপনার চেহারায় আমি দেখেছিলাম।
আহমদ কামাল বললেন, আমাকে তুমি ধোঁকা দিচ্ছ, একথা যেমন আমি বলব না, তেমনি আমার জাতি এবং আমার মিশনের সঙ্গেও আমি প্রতারণা করতে পারি না। আমার কাছে তুমি আমানত। আমি আমানতে খেয়ানত করতে পারি না। তোমার সঙ্গে আমি যে আচরণ করেছি, তা ছিল আমার কর্তব্য। এ দায়িত্ব থেকে তখন-ই আমি অব্যাহতি পাব, যখন তোমাকে আমি সংশ্লিষ্ট বিভাগের হাতে তুলে দে আর তারা আমাকে আদেশ করবেন, আহমদ কামাল! এবার তুমি চলে যাও।
মেয়েটি আসলেই প্রতারণা করছিল না। এবার কান্না-বিজড়িত কণ্ঠে সে বলল, আপনার আদালত যখন আমাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করবে, আপনি তখন আমার হাত ধরে রাখবেন। আমার এই একটি মাত্র আবেদন আপনার কাছে। ফিলিস্তীন পৌঁছিয়ে দেয়ার কথা আমি আর আপনাকে বলব না। আপনার কর্তব্যের পথে আমি বাধা সৃষ্টি করতে চাই না। আপনি শুধু আমাকে এতটুকু বলুন যে, আমি তোমার ভালবাসা বরণ করে নিয়েছি। আমাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে নিন, এ আবদার আমি আপনার কাছে করব না। কারণ, আমি একটি অপবিত্র মেয়ে। আমার শিক্ষাগুরুরা আমাকে পাথরে পরিণত করে দিয়েছে। আমার মধ্যে যে মানবিক চেতনা বলতে কিছু নেই; তা-ও আমি বুঝি। কিন্তু আল্লাহ আমায় বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ পাথর হতে পারে না। যে যেভাবেই গড়ে উঠুক, একদিন না একদিন এ প্রশ্ন করতেই হয় যে, সরল পথ কোনটি?
ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে রাত আর কথা বলে চলেছে দুজন। এক পর্যায়ে আহমদ, কামাল মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা, তোমার মত মেয়েদেরকে আমাদের দেশে পাঠিয়ে তাদের দ্বারা কি কাজ নেয়া হয়।
নানা রকম কাজ। কতিপয়কে মুসলমানের বেশে আমীরদের হেরেমে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। তারা প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনা মোতাবেক আমীর-উজীরদের কাবু করে নেয়। তাদের যারা খৃষ্টানদের মনোপূতঃ লোকদেরকে উঁচু উঁচু পদে আসীন করানো হয়। যেসব কর্মকর্তা খৃষ্টানদের বিরুদ্ধাচারণ করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করানো হয়। মুসলমান মেয়েরা ততটা চতুর নয়। নিজেদের রূপ-সৌন্দর্য নিয়ে বিভোর থাকে তারা। তারা মুসলিম শাসকদের হেরেমের রাণীর মর্যাদা পায় ঠিক; কিন্তু মুসলিমবেশী একটি খৃষ্টান কিংবা ইহুদী মেয়ে বিচক্ষণতার মাধ্যমে তাদেরকে কোণঠাসা করে রাখে। ফলে ইহুদী-খৃষ্টান মেয়েরাই হয়ে বসে হেরেমের দন্ডমুন্ডের অধিকারীনী।
বর্তমানে ইসলামী সরকারগুলোর আমীর-উজীরদের অন্ততঃ অর্ধেক সিদ্ধান্ত হয় আমার জাতির স্বার্থের অনুকূল।
মেয়েদের আরো একটি দল আছে। তারা ইসলামী নাম ধারণ করে মুসলমানদের স্ত্রী হয়ে যায়। তাদের কাজ হল সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারগুলোর মেয়েদের চিন্তা-চেতনা ধ্বংস করে তাদের বিপথগামী করে তোলা। তারা নিজেদের ছেলে-মেয়েদেরকে কু-পথে নামিয়ে দিয়ে তাদের দ্বারা সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারগুলোর ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অবৈধ প্রেম-প্রণয় সৃষ্টি করিয়ে মুসলিম সমাজকে কলুষিত করে। আমার মত মেয়েরা অতি গোপনে আপনাদের এমন এমন পদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে যায়, যারা শেষ পর্যন্ত তাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়। আমার মত মেয়েদেরকে তারা এমনভাবে হেফাজত করে রাখে যে, তাদের প্রতি সামান্যতম সন্দেহের অবকাশও থাকে না। তারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মাঝে পরস্পর দ্বন্ধ-বিরোধ ও ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করে এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গীর মাঝে বিরাগ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। ঠিক এমনি বরং এর চেয়ে জঘন্য এক কাজের জন্য আরো দুটি মেয়েসহ আমাকে তুলে দেয়া হয়েছিল রজবের হাতে।
