অপর দুজন কোথায়?
সহসা বাচ্ছন্ন হয়ে উঠে মেয়েটির দুচোখ। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলে, “তারা মারা গেছে। তাদের মৃত্যুই আমাকে বদলে দিয়েছে।
এই বলে মেয়েটি আহমাদ কামালকে সুদীর্ঘ এক কাহিনী শোনায়। রজবের সঙ্গে কিভাবে তারা ফিলিস্তান থেকে এসেছিল, কিভাবে হাবশীরা তাদের দুটি মেয়েকে দেবতার নামে বলি দিতে চেয়েছিল, কিভাবে তারা সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে, কিভাবে মরু ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে তার দুই সহকর্মী প্রাণ হারাল, সব কাহিনী সবিস্তারে বিকৃত করে মেয়েটি। সে বলে ঈমানণীতদান ২৮৭
আমি নিজেকে রাজকন্যা মনে করতাম। রাজা-বাদশাদের হৃদয়ে আমি রাজত্ব করেছি। একজন আল্লাহ আছেন, মৃত্যু আছে, এমনটি কল্পনায়ও আসেনি আমার কখনো। আমাকে পাপের সমুদ্রে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। আমিও অবলীলায় অবগাহন করতে থাকি তাতে। অপার আনন্দ পেতাম সেই অবগাহনে। হাবশীদের মহল্লায় গিয়ে আমি হাঙ্গর-কুমীর দেখলাম। বলি দেয়া মেয়েদের মস্তক আর কর্তিত দেহ নিক্ষেপ করা হয় ওদের মুখে। রজব ও দুই সঙ্গী মেয়ের সাথে যখন ঘুরতে যাই, কুমীরগুলো তখন ঝিলের কূলে লম্বা হয়ে শুয়ে ছিল। তাদের কুৎসিত বিকট দেহ দেখে আমি কেঁপে উঠি। আমার এই দেহটিকে–যা রাজা-বাদশাদের মস্তক অবনত করে দেয়–হাবশীরা কুমীরের আহারে পরিণত করতে চেয়েছিল। আমাকে বলি দেয়ার দিন-তারিখ ধার্য হয়ে গিয়েছিল। আমি মৃত্যুর পরোয়ানা পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার দেহের প্রতিটি শিরা জেগে উঠে। আমি নিজের ভিতর থেকে আওয়াজ শুনতে পাই, এই হল রূপ আর দেহের অপব্যবহারের পরিণতি। আমি জীবন বাজি রেখে ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। ফিলিস্তীন থেকে আমাদেরকে রজবের সঙ্গে পাঠান হয়েছিল। কথা ছিল, ও আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু সে নিজেই আমাদের প্রতি হাত প্রসারিত করে বসে…..।
হাবশীদের কঠিন অক্টোপাশ ছিঁড়ে রাতের আঁধারে জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম আমরা তিনজন। রজব আমাদের কোন সহযোগিতা করেনি। হাবশীদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করার কোন পদক্ষেপও সে নেয়নি। মরুভূমিতে আমাদের কোন আশ্রয় ছিল না। আমরা ঝড়ের কবলে পড়ে গেলাম। প্রথমে একটি মেয়ে ছিটকে পড়ে যায় ঘোড়ার পিঠ থেকে। তাকে পিষে ফেলে তার ঘোড়। দ্বিতীয় মেয়েটি যখন ঘোড়া থেকে পড়ে গেল, তখন এক পা আটকে গেল তার ঘোড়ার রেকাবে। ঝুলন্ত অবস্থায় ঘোড়ার সঙ্গে মাটিতে হেঁচড়াতে লাগল। এভাবে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে তার ঘোড়া তাকে অন্ততঃ দু মাইলেরও বেশী পথ নিয়ে আসে। তার আর্তচীকারে আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। এখনও তার সেই করুণ চীৎকার-ধ্বনি আমি শুনতে পাচ্ছি। যতদিন বেঁচে থাকব, তার সেই চীৎকার আমার কানে বাজতেই থাকবে।
প্রবল ঝড়ে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করে আমার ঘোড়া । আমি ঘোড়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। সঙ্গী দু মেয়েকে মৃত্যু দিয়ে আল্লাহ আমাকে বুঝিয়ে দিলেন, আমার পরিণতি কী হবে। ওরা ছিল আমার চেয়েও রূপসী। বহু রাজা-বাদশাহ ছিল তাদের হাতের পুতুল। রূপের অহংকার ছিল তাদেরও। কিন্তু এমনি ভয়ংকর মৃত্যু তাদের চাপা দিয়ে রেখেছে মরুভূমির বালির নীচে।
আমি এখন একা। ঝড়ের শো শো শব্দকে মনে হতে লাগল, যেন মৃত্যু দাঁত বের করে আমার দিকে তাকিয়ে খিল খিল্ করে হাসছে। আমার মাথার উপরে, সামনে, পিছনে, ডানে, বায়ে আমি ভুত-প্রেত ও মৃত্যুর অট্টহাসি শুনতে পেলাম।
এমন এক মহাবিপদে নিক্ষিপ্ত হয়েও আমি চৈতন্য হারাইনি। হুঁশ-জ্ঞান ঠিক রেখে আমি ভাবনার সাগরে ডুবে গেলাম। বুঝলাম, এ আর কিছুই নয়–আল্লাহ আমাকে আমার পাপের শাস্তি দিচ্ছেন। আল্লাহর কথা মনে পড়ে যায় আমার। দু হাত উপরে তুলে উচ্চকণ্ঠে ডাকতে লাগলাম তাকে। কেঁদে কেঁদে তাওবা করলাম। ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। তারপর চৈতন্য হারিয়ে যায় আমার …..।
জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলে দেখলাম, আমি আপনার কজায়। আপনার গৌরবর্ণ দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম। ভাবলাম, আপনি ইউরোপিয়ান কেউ হবেন আর আমি ফিলিস্তীনে। এ ধোকায় পড়ে আমি কথা বললাম ইংরেজীতে। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে? আমি কোথায়? যখন জানতে পারলাম, আমি মুসলমানের কুজায় এসে পড়েছি এবং যেখানে আছি, জায়গাটা ফিলিস্তীন নয়–মিসর, তখন মনটা আমার ছ্যাৎ করে উঠে। ভয়ে আমি শিউরে উঠি। ভাবলাম, এভাবে দুশমনের হাতে এসে পড়ার চেয়ে ঝড়ে জীবন দেয়া-ই তো ভাল ছিল। জীবনে রক্ষা পেয়ে আমার লাভটা কী হল। প্রশিক্ষণে আমাদেরকে ধারণা দেয়া হয়েছিল, মুসলমানরা নারীর সাথে হিংস্র প্রাণীর ন্যায় আচরণ করে। আপনার পরিচয় পেয়ে আমার সে কথাটা-ই মনে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আপনি আমার সঙ্গে যে আচরণ করলেন, তা ছিল আমার কল্পনারও অতীত। আপনি এতগুলো স্বর্ণমুদ্রা ছুঁড়ে ফেললেন, আমাকেও সরিয়ে দিলেন। আমার এই উপচেপড়া রূপ আর মধুভরা দেহ আপনাকে এতটুকুও আকর্ষণ করতে পারল না। এ এক পরম আশ্চর্য-ই বটে। কিন্তু তখনও আমার ভয় কাটেনি। মনে মনে ভাবছিলাম, যদি একজন সৎ মানুষ পেয়ে যেতাম, যে আমাকে একটু আশ্রয় দেবে, আমায় পবিত্র মনে নিজের বুকের সঙ্গে লাগিয়ে নেবে। আপনার চরিত্র যে এত পবিত্র, তখনও আমি তা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারিনি।
