আল্লাহ কি গুনাহ মাফ করেন? জানতে চায় মেয়েটি।
আলবৎ তাওবা করলে আমাদের আল্লাহ মানুষের গুনাহ মাফ করে দেন। শর্ত হল, তাওবা করার পর সে পাপ আবার করা যাবে না। জবাব দেন আহমদ কামাল।
আহমদ কামালের জবাব শুনে মাথা নত করে মেয়েটি। কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকে দুজন। মেয়েটির ফোঁপানির শব্দ পান আহমদ কামাল। অবনত মাথাটা ধরে উপরে তুলে দেন তিনি। গুমরে কাঁদছে মেয়েটি। চোখ তার অশ্রুসজল। আহমদ কামালের হাত চেপে ধরে সে। হাতে চুমো খায় কয়েকবার। আহমদ কামাল নিজের হাত গুটিয়ে নেন। রুদ্ধকণ্ঠে মেয়েটি বলে, “আজ-ই আমরা সম্পর্কহীন হয়ে পড়ব। আমাকে পাঠিয়ে দেবেন কায়রো। আর হয়ত কোনদিন দুজনের সাক্ষাৎ ঘটবে না। আমার মন আমাকে বাধ্য করছে যে, আমি বলে দিই, আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি। তারপর আপনাকে জানিয়ে দিই, এখন আমি কী।
তোমার যাত্রার সময় হয়ে গেছে। আমি নিজেই তোমার সঙ্গে যাব। এমন একটি স্পর্শকাতর গুরুদায়িত্ব আমি অন্য কারো উপর ন্যাস্ত করতে পারি না।
তবে কি শুনবে না আমার পরিচয়, আমার ইতিবৃত্ত নিরাশার সুরে বলল মেয়েটি।
উঠ, এসব শ্রবণ করা আমার কাজ নয়। বলেই তার থেকে বেরিয়ে গেলেন আহমদ কামাল।
***
কায়রো অভিমুখে এগিয়ে চলছে ছয়টি ঘোড়া। একটিতে আহমদ কামাল। তাঁর পিছনের ঘোড়ায় মেয়েটি আর তার পিছনে পাশাপাশি চলছে রক্ষীদের চারটি ঘোড়া। একেবারে পিছনে একটি উট। তাতে সফরের সামান-খাবার-পানি ইত্যাদি বোঝাইকরা।
আহমদ কামালের ক্যাম্প থেকে কায়রো অন্তত ছত্রিশ ঘন্টার পথ। এগিয়ে চলছে কাফেলা। মেয়েটি দু দুবার তার ঘোড়াটি নিয়ে আসে আহমদ কামালের পাশে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি তাকে পিছনে পাঠিয়ে দেন। কোন কথা বলছেন না মেয়েটির সঙ্গে। সূর্যাস্তের পর এক স্থানে কাফেলা থামান আহমদ কামাল। এখানে রাত যাপন করতে হবে। তাঁবু ফেলতে আদেশ করেন তিনি।
রাতে আহমদ কামাল নিজের তাঁবুতে ঘুমুতে দেন মেয়েটিকে। প্রদীপ জ্বালিয়ে গভীর ন্দ্রিায় তলিয়ে যান নিজে।
হঠাৎ চোখ খুলে যায় আহমদ কামালের। কে যেন আলতো পরশে হাত বুলাচ্ছে তার মাথায়। চমকে উঠেন তিনি। ঘুমের রেশ কাটিয়ে তিনি দেখতে পান, মেয়েটি তার শিয়রে বসা। মেয়েটির হাত তার মাথায়। দ্রুত উঠে বসেন আহমদ কামাল। তাকালেন মেয়েটির প্রতি। অশ্রুর বন্যা বইছে যেন তার চোখে। দু হাতে আহমদ কামালের হাত চেপে ধরে চুম্বন করে সে। শিশুর মত রয়ে রয়ে কাঁদতে শুরু করে। গম্ভীর চোখে একদৃষ্টে মেয়েটির প্রতি তাকিয়ে থাকেন আহমদ কামাল। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে মেয়েটি বলল, আমি তোমার দুশমন। আমি গুপ্তচরবৃত্তি, তোমাদের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার মাঝে বিভেদ সৃষ্টি এবং সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার আয়োজন সম্পন্ন করতে ফিলিস্তীন থেকে তোমাদের দেশে রওনা করেছিলাম। কিন্তু এখন আমার হৃদয় থেকে তোমাদের প্রতি শত্রুতা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন আর আমি গুপ্তচর নই, তোমাদের শত্রুও নই।
কেন? প্রশ্ন করেন আহমদ কামাল। কিন্তু জবাবের অপেক্ষা না করেই তিনি বললেন, তুমি একটি ভীরু মেয়ে। তুমি স্বজাতির সঙ্গে গাদ্দারী করছ। শূলে চড়েও তোমাকে বলা উচিত, আমি খৃষ্টান। মুসলমান আমার জাতশত্রু। ক্রুশের জন্য জীবন দিয়ে আমি গর্ববোধ করছি। বললেন আহমদ কামাল।
কেন? প্রশ্ন করেছেন, তার জবাবটা শুনে নিন ভাই! আমার জীবনে আপনি-ই প্রথম পুরুষ, যিনি এই রূপ-যৌবনকে তুচ্ছ বলে ছুঁড়ে ফেললেন। অন্যথায় কি আপন, কি পর সকলের চোখেই আমি এক খেলনা। আমার দৃষ্টিতেও আমার জীবনের লক্ষ্য এই পুরুষদের নিয়ে তামাশা করব, আনন্দ দেব, আনন্দ নেব, রূপের জালে আটকিয়ে পুরুষদের ধোকা দেব, আয়েশ করব। প্রশিক্ষণও পেয়েছি আমি এ কাজের-ই। আপনারা যাকে বেহায়াপনা বলেন, আমার জন্য তা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল, একটি অস্ত্র। ধর্ম কি, আল্লাহর বিধান বলতে কি বুঝায়, তা আমি জানি না। আমি চিনি শুধু কুশ। শৈশবে-ই আমার মন-মগজে এ ধারণা বদ্ধমূল করে দেয়া হয়েছিল, ক্রুশ হল খোদার নিদর্শন, খৃষ্টবাদের মহান প্রতীক। সমগ্র বিশ্বে কর্তৃত্ব করার অধিকার একমাত্র এই ক্রুশের অনুসারীদের আর মুসলমান হল ক্রুশের শত্রু। তাদের রাজত্ব করার অধিকার নেই। বেঁচে থাকতে চাইলে থাকতে হবে ক্রুসেডারদের পদানত হয়ে। একটি কথা-ই আমার ধর্মের মূল ভিত্তি জানি। আমাকে মুসলমানদের মূলোৎপাটনের প্রশিক্ষণ দিয়ে বলা হয়েছিল, এটি তোমার পবিত্র কর্তব্য …..।
এ পর্যন্ত বলে কিছুক্ষণ নীরব থেকে মেয়েটি আহমদ কামালকে জিজ্ঞেস করে—
রজব নামে আপনাদের এক সালার আছে। তাকে জানেন আপনি?
জানি। সে খলীফার রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার। সুদানীদের মিসর আক্রমণের ষড়যন্ত্রে সে-ও জড়িত ছিল। জবাব দেন আহমদ কামাল।
এখন সে কোথায়, জানেন?
আমার জানা নেই। আমি শুধু এতটুকু আদেশ পেয়েছি যে, রজব পালিয়ে গেছে। যেখানে পাবে, সেখানেই ধরে ফেলবে। পালাতে চেষ্টা করলে তীর ছুঁড়ে শেষ করে দিবে।
আমি কি বলে দেব, এখন সে কোথায় সে সুদানে হাবশীদের নিকট আছে। সেখানে একটি মনোরম জায়গা আছে। সেখানে মেয়েদেরকে দেবতার নামে বলি দেয়া হয়। রজব সেখানেই অবস্থান করছে। আমি জানি সে দলত্যাগী সালার। তার সঙ্গে ফিলিস্তীন থেকে এসেছিলাম আমরা তিনটি মেয়ে।
