গত রাতে এক তিল ঘুমুতে পারেনি মেয়েটি। আর দিনটি কেটেছে ভয়াবহ এক সফরের মধ্য দিয়ে। ক্লান্তিতে, অবসন্ন তার দেহ। আহমদ কামালের অনুমতি নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় সে। অনি দু চোখের পাতা এক হয়ে আসে তার। রাজ্যের ঘুম এসে চেপে ধরে তাকে।
আহমদ কামাল দেখলেন, ঘুমের মধ্যে মেয়েটি বিড় বিড় করছে। অস্থিরতার কারণে মাথাটা এপাশ-ওপাশ করছে তার। মনে হল ঘুমের মধ্যেই কাঁদছে সে।
সাথীদের ডেকে আহমদ কামাল বলে দিলেন, একটি সন্দেহভাজন ফিরিঙ্গী মেয়েকে ধরে আনা হয়েছে। আগামীকাল তাকে কায়রো পাঠিয়ে দেয়া হবে। আহমদ কামালের চরিত্র সকলের জানা। তার ব্যাপারে সন্দেহ করার কোন অবকাশ নেই কারুর।
অঘোরে ঘুমুচ্ছে মেয়েটি। আহমদ কামাল তাঁবু থেকে বের হয়ে ঘোড়াটির কম যান। দেখে হতবাক হয়ে যান তিনি। এ যে উন্নত জাতের ঘোড়। এ জাতের ঘোড় । মুসলিম বাহিনী ছাড়া অন্য কারুর নেই। জিনটি ধরে উলট-পালট করে দেখেন আহ কামাল। জিনের নীচে মিসরী ফৌজের প্রতীক আঁটা। আহমদ কামালের বাহিনীর-ইনি এ ঘোড়াটি।
ঝড়ের কারণে হাবশীরা মেয়েদের পশ্চাদ্ধাবন ত্যাগ করে জীবিত ফেরত পৌ যায়। পুরোহিতের মিশ্চিত ধারণা, ঝড়ের কবলে পড়ে মেয়েরা প্রাণ হারিয়েছে ওদের ক ভেবে আর লাভ নেই। এর মধ্যে সময়ও কেটে গেছে বেশ। বিপদ নেমে এল রজবের উপর। পুরোহিত তাকে বারবার একই কথা জিজ্ঞেস করছে, বল, মেয়েরা কোথায় রজব দিব্যি খেয়ে বলছে, আমি কিছুই জানিনা। আমাকে না জানিয়েই শুরা পালিয়েছে। বুজবের উপর নির্যাতন চালাতে শুরু করে হাবশীরা। তরবারীর আগা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাকে রক্তাক্ত করছে আর বলছে, বল মেয়েরা কোথায়? রজবের সঙ্গীদেরকেও তারা গাছের সঙ্গে বেঁধে অত্যাচার শুরু করে। দেশ ও জাতির সঙ্গে গাদ্দারী করার শান্তি কোন করছে রজব। রাতেও তার বাঁধন খোলা হয়নি। আঘাতে আঘাতে চালনির মত ঝাঝা হয়ে গেছে তার দেহ।
আহমদ কামালের তাঁবুতে শুয়ে আছে মেয়েটি। সূর্যাস্তের আগে একবার জেগেছিল সে। তাকে খাবার খাওয়ান আহমদ কামাল। তারপর পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ে সে। তার থেকে দু-তিন গজ দূরে শয়ন করেন আহমদ কামাল। কেটে যাচ্ছে রাত। টি টি করে বাতি জ্বলছে তাঁবুতে। হঠাৎ চীৎকার করে উঠে মেয়েটি। ঘুম ভেঙ্গে যায় আহমদ কামালের। ধড়মড় করে উঠে বসে সে। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে তার দেহ। চোখে-মুখে ভীতির ছাপ। কাছে এসে বসেন আহমদ কামাল। কাঁপতে কাঁপতে আহমদ কামালের গা ঘেঁষে বসে মেয়েটি। কম্পিত কণ্ঠে বলে, ওদের থেকে আমাকে বাঁচাও। ওরা আমায় কুমীরের ঝিলে নিক্ষেপ করছে। আমার মাথা কাটতে চেয়েছে ওরা।
কারা? জিজ্ঞেস করেন আহমদ কামাল।
ঐ কৃষ্ণাঙ্গ হাবশীরা। এখানে এসেছিল ওরা। ভয়জড়িত কণ্ঠে বলে মেয়েটি।
হাবশীদের বলির কথা জানতেন আহমদ কামাল। মনে তার সংশয় জাগে, বোধ হয় একে বলি দেয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করেন। ভয় যেন আরো বেড়ে যায়। আহমদ কামালের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে কিছু জিজ্ঞেস কর না; আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। আহমদ কামাল দেখলেন, ভয়ে মেয়েটি আধখানা হয়ে গেছে। তিনি তাকে সান্ত্বনা দেন। অভয় দিয়ে বলেন, তুমি নিশ্চিন্ত থাক, এখান থেকে তোমাকে তুলে নিতে কেউ আসবে না। মেয়েটি বলল, আমি আর ঘুমাতে পারব না। আপনি বসে বসে আমার সাথে কথা বলুন। একা একা জেগেও আমি সময় কাটাতে পারব না। আমি পাগল হয়ে যাব।
আহমদ কামাল বললেন, ঠিক আছে, আমিও তোমার সঙ্গে সজাগ বসে থাকব। আলতো পরশে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে আহমদ কামাল বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমার কাছে আছি, ততক্ষণ তোমার কোন ভয় নেই।
দীর্ঘক্ষণ জেগে কাটায় মেয়েটি। আহমদ কামালও সজাগ বসে থাকেন তার পার্শ্বে। হাবশীদের ব্যাপারে তিনি মেয়েটিকে আর কোন কথা জিজ্ঞেস করেননি। তুরস্ক ও মিসরের গল্প শোনাতে থাকেন তাকে। আহমদ কামালের গা ঘেঁষে বসে আছে সে। আহমদ কামাল অত্যন্ত মিশুক মানুষ। রসের কথা বলে বলে মেয়েটির মন থেকে ভয় দূর করে দেন তিনি। এক সময় প্রসন্নচিত্তে ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটি।
মেয়েটির যখন ঘুম ভাঙ্গে, রাতের তখন শেষ প্রহর। আহমদ কামাল নামায পড়ছেন। মেয়েটি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তার প্রতি। তন্ময়চিত্তে আহমদ কামালের নামায পড়া দেখছে সে। দুআর জন্য হাত উঠান আহমদ কামাল। চোখ দুটো বন্ধ করেন। একনাগাড়ে নির্নিমেষ নয়নে মেয়েটি তাকিয়ে আছে আহমদ কামালের মুখের প্রতি। দুআ শেষ করে হাত নামান আহমদ কামাল। চোখ খুললে দৃষ্টি পড়ে জাগ্রত মেয়েটির প্রতি।
হাত তুলে খোদার কাছে আপনি কি প্রার্থনা করলেন কৌতূহলী মনে জিজ্ঞেস করে মেয়েটি।
অন্যায় প্রতিরোধের সাহস। জবাব দেন আহমদ কামাল।
আপনি কি খোদার কাছে কখনো সুন্দরী নারী আর সোনা-দানা চাননি।
এ দুটি বস্তু তো প্রার্থনা ছাড়াই আল্লাহ আমাকে দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু ওসবের উপৰ্ম আমার কোন অধিকার নেই। আল্লাহ বোধ হয় আমায় পরীক্ষা নিতে চাইছেন। বললেন আহমদ কামাল।
আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, তিনি আপনাকে অন্যায়ের মোকাবেলা করার হিম্মত দিয়েছেন প্রশ্ন করে মেয়েটি।
কেন! তুমি কি দেখনি তোমার এতগুলো স্বর্ণমুদ্রা আর তোমার রূপ-মাধুৰ্য্য তো আমাকে আমার আদর্শ থেকে এক চুল সরাতে পারেনি! এ আমার প্রচেষ্টা আর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের প্রতিফল। জবাব দেন আহমদ কামাল।
