ইত্যবসরে এক সিপাহী তাঁবুর পর্দা ফাঁক করে ভিতরে ঢুকে একটি থলে ও একটি পানির মশক আহমদ কামালের হাতে দিয়ে বলে, এগুলো মেয়েটির ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বাঁধা ছিল। থলেটি হাতে নিয়ে খুলতে শুরু করেন আহমদ কামাল। সঙ্গে সঙ্গে থতমত খেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে থলের মুখ চেপে ধরে মেয়েটি। ফ্যাকাশে হয়ে যায় তার চেহারা। আহমদ কামাল থলেটি তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ঠিক আছে, নাও তুমি-ই খুলে দেখাও। শিশুর মত করে থলেটি পিছনে লুকিয়ে ফেলে মেয়েটি। ভয়জড়িত কণ্ঠে বলে, না, এটা কাউকে দেখা যাবে না।
আহমদ কামাল বললেন, দেখ, এমনটি আশা কর না যে, তোমার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে আমি বলব, ঠিক আছে চলে যাও! তোমাকে আটকে রাখার অধিকার হয়ত আমার নেই। কিন্তু লোকালয় থেকে বহু দূরে ঘোড়ার পিঠে নিঃসঙ্গ ও অচেতন অবস্থায় যে মেয়েটিকে পাওয়া গেল, তাকে আমি এমনিতেই ছেড়ে দিতে পারি না। তাছাড়া এই অসহায় অবস্থায় একাকী-ই বা তোমাকে ছেড়ে দিই কি করে। একটা মানবিক কতব্যও তো আমার আছে। ঠিকানা বল, আমার রক্ষী বাহিনীর হেফাজতে তোমাকে গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেব। অন্যথায় সন্দেহভাজন মেয়ে সাব্যস্ত করে আমি তোমাকে কায়রোতে আমাদের প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে দেব। আমি নিশ্চিত, তুমি মিসরীও নও, সুদানীও নও। তাহলে তুমি কে? এখানে-ই বা কেন এসেছ, এ প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই আমি তোমায় করতে পারি।
চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু করে মেয়েটির। থলেটি ছুঁড়ে দেয় আহমদ কামালের সামনে। রশি দিয়ে বাঁধা থলের মুখ খুলেন আহমদ কামাল। ভিতরে আছে কয়েকটি খেজুর, আর অপর একটি থলে। কৌতূহল বেড়ে যায় আহমদ কামালের। এ থলেটিও খুললেন তিনি। পেলেন অনেকগুলো স্বর্ণমুদ্রা আর সোনার তৈরি সরু শিকলে বাঁধা কালো কাঠের একটি কুশ। আহমদ কামাল বুঝে ফেললেন, মেয়েটি খৃষ্টান। তিনি বোধ হয় জানতেন না যে, খৃষ্টান মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য খৃষ্টান বাহিনীতে যোগ দিতে আসে, একটি ক্রুশে হাত ধরিয়ে তার থেকে শপথ নেয়া হয় এবং সে ছোট্ট একটি ক্রুশ সর্বক্ষণ সঙ্গে রাখে। আহমদ কামাল বললেন,থলেতে আমার প্রশ্নের জবাব নেই।
আমি যদি এইসবগুলো স্বর্ণমুদ্রা আপনাকে দিয়ে দিই, তাহলে কি আপনি আমাকে সাহায্য করবেন? জিজ্ঞেস করে মেয়েটি।
কেমন সাহায্য? জানতে চান আহমদ কামাল।
আমাকে ফিলিস্তীন পৌঁছিয়ে দেবেন এবং আর কোন প্রশ্ন করবেন না। বলল মেয়েটি।
আমি তোমাকে ফিলিস্তীন পৌঁছিয়ে দিতে পারি। তবে প্রশ্ন করব অবশ্যই। বললেন আহমদ কামাল।
আমাকে যদি আপনি কিছু-ই জিজ্ঞেস না করেন, তাহলে তার জন্য আপনাকে আলাদা পুরস্কার দেব। বলল মেয়েটি।
কি পুরস্কার জানতে চান আহমদ কামাল।
আমার ঘোড়াটি আমি আপনাকে দিয়ে দেব। আর…
আর কি।
আর তিনদিনের জন্য আমি আপনার দাসী হয়ে থাকব।
আহমদ কামাল ইতিপূর্বে কখনো এতগুলো সোনা হাতে নেননি। এমন চোখ ধাঁধানো রূপ আর এমন মনোহারী নারীদেহও দেখেননি কোনদিন। সম্মুখে পড়ে থাকা চকমকে সোনার টুকরাগুলোর প্রতি তাকান আহমদ কামাল। তারপর চোখ চলে যায় তার মেয়েটির রেশম-কোমল চুলের প্রতি। সোনার তারের ন্যায় ঝিকঝিক করছে চুলগুলো। চোখ দুটোতে যেন তার যাদুর আকর্ষণ। এ চোখের যাদুময় চাহনি দিয়েই রাজ-রাজড়াদের একজনকে আরেকজনের শত্রুতে পরিণত করে এরা। তা-ও নিরীক্ষা করে দেখেন আহমদ কামাল।
আহমদ কামাল সুঠাম সুদেহী এক বলিষ্ঠ যুবক। সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত তিন প্লাটুন সৈনিকের কমাণ্ডার। কোন কাজে তাকে বাধা দেয়, জবাব চায়, এমন নেই কেউ এখানে।
তবু–
তবু তিনি সোনার মুদ্রাগুলো কুড়িয়ে থলেতে ভরেন। ক্রুশটিও থলেতে রাখেন। তারপর নির্লিপ্তের মত থলেটি ছুঁড়ে দেন মেয়েটির কোলের মধ্যে।
কেন, এ মূল্য কি কম? জিজ্ঞেস করে মেয়েটি।
নিতান্ত কম। ঈমানের মূল্য আল্লাহ ছাড়া কেউ দিতে পারে না। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন আহমদ কামাল।
এ ফাঁকে কি যেন বলতে চায় মেয়েটি। আহমদ কামাল তাকে থামিয়ে দিয়ে নিজে বললেন–
আমি আমার কর্তব্য ও আমার ঈমান বিক্রি করতে পারি না। সমগ্র মিসর আমার উপর নির্ভর করে স্বস্তিতে ঘুমায়। তিন মাস আগে সুদানীরা কায়রো আক্রমণের চেষ্টা করেছিল। আমি যদি এখানে না থাকতাম, কিংবা যদি আমি তাদের কাছে আমার ঈমান বিক্রি করে দিতাম, তাহলে এই বাহিনী কায়রোতে ঢুকে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাত। আমার চোখে তুমি সেই বাহিনী অপেক্ষাও ভয়ংকর। কেন, তুমি কি গোয়েন্দা নও?
না।
মরুভূমির ঝড়ো-বাতাস তোমাকে কোন জালিমের কবল থেকে রক্ষা করে এখানে পাঠিয়েছে কিংবা দমকা বায়ুর মধ্যে থেকে নিজে বেরিয়ে এসেছ, এমন একটা কিছু বলে-ই কি তুমি আমাকে বুঝ দিতে চাও? জানতে চান আহমদ কামাল।
জবাবে মেয়েটি আমৃতা আমতা করে যা বলল, তার কোন অর্থ দাঁড়ায় না। তাই আহমদ কামাল বললেন
ঠিক আছে, তুমি কে, কোথা থেকে এসেছ, এসব জানবার প্রয়োজন আমার নেই। তোমার মত মেয়েদের মুখ থেকে সত্য কথা বের করানোর জন্য কায়রোতে আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ আছে। আগামী কাল-ই আমি তোমাকে সেখানে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তোমার পরিচয় তারা-ই নিবেন।
অনুমতি হলে আমি এখন একটু বিশ্রাম নিই, কাল কায়রো রওনা হওয়ার প্রাক্কালে আমি আপনার প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাব। বলল মেয়েটি।
