সিপাহীর দৃষ্টির অনুসরণ করেন আহমদ কামাল বলেন, আরোহী মেয়ে বলে মনে হচ্ছে। আমাদের বাহিনীতে তো মেয়ে নেই। চল, দেখে আসি।
সিপাহীকে নিয়ে ছুটে যান আহমদ কামাল। অবনত মুখে অতি ধীরপদে এগিয়ে আসছে একটি ঘোড়া। খাবারের গন্ধ পেয়ে হেডকোয়ার্টারের ঘোড়াগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে ঘোড়াটি। ঘোড়ার পিঠে একটি মেয়ে। নিস্তেজ উপুড় হয়ে পড়ে আছে সে। বাহু দুটো তার ঘোড়ার ঘাড়ের দুদিকে ছড়ানো। মাথার চুলগুলো তার এলোমেলো ছড়িয়ে আছে সামনের দিকে।
আহমদ কামাল কাছে পৌঁছার আগে-ই ঘোড়াটি হেডকোয়ার্টারের ঘোড়ার সঙ্গে জুড়ে খাবার খেতে শুরু করে। ঘোড়ার পাশে এসে দাঁড়ান আহমদ কামাল। এক নজর তাকিয়ে নিরীক্ষা করেন মেয়েটিকে। তাকে রেকাব থেকে পা সরিয়ে দু হাতে করে ধরে নীচে নামিয়ে আনেন। সিপাহীর উদ্দেশে বলেন, জীবিত; বোধ হয় খৃষ্টান। এর ঘোড়াটিকে পানি পান করাও।
মেয়েটিকে নিজের তাঁবুতে নিয়ে যান আহমদ কামাল। মাথার চুল ও সর্বাঙ্গ তার ধূলোমলিন। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মেয়েটির মুখমণ্ডলে পানির ঝাঁপটা দেন তিনি। তারপর ফোঁটা ফোঁটা করে পানি দিতে থাকেন তার মুখে।
মিনিট দশেক পর চোখ খুলে মেয়েটি। বিস্ময়াভিভূত নেত্রে কয়েক মুহূর্ত আহমদ কামালের প্রতি তাকিয়ে থেকে হঠাৎ উঠে বসে সে। গৌরবর্ণ একটি লোককে পাশে দেখতে পেয়ে মেয়েটি ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি এখন ফিলিস্তীনে? মাথা দুলিয়ে আহমদ কামাল তাকে বুঝাতে চান, আমি তোমার ভাষা বুঝছি না। এবার মেয়েটি আরবীতে জিজ্ঞেস করে। আপনি কে? আমি কোথায়?
আমি ইসলামী ফৌজের একজন নগন্য কমাণ্ডার। আর তুমি এখন মিসরে। জবাব দেন আহমদ কামাল।
আঁতকে উঠে মেয়েটি। মুহূর্তের মধ্যে ভয়ে পাংশুবর্ণ ধারণ করে তার মুখ। আবার চৈতন্য হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় তার। বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে থাকে আহমদ কামালের প্রতি।
অভয় দেন আহমদ কামাল। বলেন, ভয় কর না, আত্মসংবরণ কর। আমরা মুসলমান। মুসলমান বিনা অপরাধে কাউকে শাস্তি দেয় না।
সস্নেহে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে আহমদ কামাল বললেন, আমি জানি, তুমি খৃষ্টান। কিন্তু এখন তুমি আমার মেহমান। তোমার ভয়ের কোন কারণ নেই। তুমি শান্ত হও, সুস্থ হও।
আহমদ কামাল একজন সিপাহীকে ডেকে মেয়েটির জন্য খানা-পিনার ব্যবস্থা করতে আদেশ করেন।
খাবার-পানি নিয়ে আসে সিপাহী। দেখা মাত্র পানির গ্লাসটি খপ করে হাতে তুলে নেয় মেয়েটি। মুখের সঙ্গে লাগিয়ে অতিশয় ব্যাকুলতার সাথে টক্ টক্ করে পানি পান করতে শুরু করে সে। গ্লাসটি ধরে ফেলেন আহমদ কামাল। টেনে ঠোঁট থেকে জোর করে সরিয়ে এনে বললেন, আস্তে, বেশী পিপাসার পর হঠাৎ এত পানি পেটে দিতে নেই। এখন খাবার খাও, পানি পরে পান কর। খাবারের পাত্রে হাত দেয় মেয়েটি। তৃপ্তি সহকারে আহার করে। ধীরে ধীরে স্বস্তি ও শক্তি ফিরে আসতে শুরু করে তার। ফিরে আসে মুখের জৌলুস। চাঙ্গা হয়ে উঠে তার দেহ।
আহমদ কামালের তাঁবুর পার্শ্বেই ছোট আরেকটি তাঁবু। এটি তাঁর গোসলখানা। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি আছে এখানে। দেখে-শুনে একটি খেজুর বাগানের নিকটে স্থাপন, করা হয়েছিল ক্যাম্পটি। তাই এখানে পানির কোন সংকট পড়ে না। আহারের পর আহমদ কামাল মেয়েটিকে সেই তাঁবুতে ঢুকিয়ে পর্দা ঝুলিয়ে দেন। গোসল করে মেয়েটি।
মেয়েটি অত্যন্ত সন্ত্রস্ত। আহমদ কামালের অভয় বাণীতে ভয় তার কাটেনি; শত্রুর আশ্রয়ে ভাল ব্যবহারের আশা করতে পারছে না সে। শৈশব থেকেই সে শুনে আসছে, মুসলমানের চরিত্র হায়েনার মত, নারীর সাথে তাদের আচরণ হিংস্র পশুর মত। তদুপরি হাবশীদের আচরণ, কুমীর ও মরুঝড়ের ভীতি চেপে ধরে আছে তাকে। দুই সঙ্গী মেয়ের নির্মম মৃত্যুর করুণ দৃশ্য আরো ভয়ার্ত করে তোলে তাকে। সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তটির কথা স্মরণে আসা মাত্র সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে উঠে তার।
গোসল করার সময় মেয়েটির মনে জাগে, আমি আমার এই অপবিত্র অস্তিত্বকে ধুয়ে পরিষ্কার করতে চাই। কিন্তু দুনিয়ার এ পানি তো পবিত্র করতে পারবে না আমায়!
চরম অসহায়ত্ব ও উপায়হীনতা বোধ করে মেয়েটি। অবশেষে মনে মনে পরিস্থিতির হাতে তুলে দেয় নিজেকে। বলে, ভেবে আর লাভ কি, যা হবার হবে। মৃত্যুর কবল থেকে বেঁচে, এসেছি, আপাততঃ তা-ই বা কম কিসে!
গোসল সেরে তাঁবুতে ফিরে আসে মেয়েটি। এবার তার আসল রূপ ফুটে উঠে আহমদ কামালের সামনে। মন-মাতানো দেহটিতে তার রূপের বন্যা বইছে যেন। কোন সাধারণ মেয়ে হতে পারে না এ যুবতী। মিসরের এ অঞ্চলে এই ফিরিঙ্গী মেয়েটি আসল কিভাবে? কোত্থেকে-ই বা এল? বেজায় কৌতূহল আহমদ কামালের মনে। মেয়েটির পরিচয় জানতে চান আহমদ কামাল। জবাবে সে বলে, আমি কাফেলা হারিয়ে পথ ভুলে এসেছি। ঝড়ের কবলে পড়ে ঘোড়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। আশ্বস্ত হলেন না আহমদ কামাল। আরো তিন-চারটি প্রশ্ন করলেন তিনি। কাঁপতে শুরু করে মেয়েটির ওষ্ঠাধর। আহমদ কামাল বললেন, যদি বলতে, আমাকে অপহরণ করা হয়েছিল; ঝড়ের কবলে পড়ে দস্যুদের হাত থেকে ছুটে এখানে এসে পড়েছি, তাহলে বোধ হয় আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারতাম। কাফেলা হারিয়ে পথ ভুলে যাওয়ার কথাটা আমি মানতে পারছি না।
