পলায়নপর মেয়েরাও এই ঝড়ের কবলে আক্রান্ত হয়। বালির আস্তর জমে যায় তাদের ও তাদের ঘোড়াগুলোর গায়ে । আতঙ্কগ্রস্ত ঘোড়াগুলো নিয়ন্ত্রনহীনভাবে ইতস্ততঃ দৌড়াদৌড়ি করতে শুরু করে। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর ও ঝড়-কবলিত তিনটি ঘোড়া মধ্যরাত পর্যন্ত এভাবে ছুটোছুটি করে। নিথর শরীরে নিরুপায় ঘোড়ার পিঠে বসে আছে তিন মেয়ে ।
একদিকে সীমাহীন ক্লান্তি, অপরদিকে প্রবল পিপাসা। ক্লান্তি ও পিপাসা ধীরে ধীরে ঘোড়াগুলোকে বেহাল করে তুলতে শুরু করে। হঠাৎ একটি ঘোড়া উপুড় হয়ে পড়ে যায়, পড়ে যায় তার আরোহী মেয়ে। ঘোড়াটি আবার উঠে দাঁড়ায়। আবার পড়ে যায়। মেয়েটি ঘোড়ার বুকের নীচে চাপা পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
কিছুদুর অগ্রসর হওয়ার পর ঢিলে হয়ে আসে আরেকটি ঘোড়ার দেহ। পিঠের জিন সরে যায় একদিকে। তার আরোহী মেয়েটিও কাত হয়ে পড়ে যায় সে দিকে। কিন্তু এক পা তার আটকে গেছে রেকাবে। মন্থর গতিতে চলছে ঘোড়া। মাটিতে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে মেয়েটিকে। তৃতীয় মেয়েটি সাহায্য করতে পারছে না তাকে। ঘোড়া তার নিয়ন্ত্রণহীন। মেয়েটির চীঙ্কার কানে আসে তার। এক সময় স্তব্ধ হয়ে যায় তারও কণ্ঠ । বিহ্বলের মত কেবল তাকিয়ে থাকে তৃতীয় মেয়ে। ঘোড়র সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে হেঁচড়াচ্ছে মেয়েটির মৃতদেহ। ভয়ে আঁতকে উঠে তৃতীয় মেয়ে। যত সাহসী-ই হোক মেয়ে তো। চীৎকার করে কাঁদতে শুরু করে সে।
নিজের ঘোড়া নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না তৃতীয় মেয়ে। পিছন ফিরে তাকায় সে। ধূলিঝড়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে।
মেয়েটি এখন একা। সে ভয়ে জ্ঞান-শূন্য হয়ে পড়েছে। ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিয়ে হাত দুটো এক করে আকাশপানে উঁচিয়ে ধরে। গলা ফাটিয়ে চীৎকার করে বলতে শুরু করে–
আমার মহান খোদা! আসমান-জমিনের খোদা। তুমি আমাকে রক্ষা কর। আমি গুনাহগার। আমার দেহের প্রতিটি লোম পাপে নিমজ্জিত। পাপ করতে-ই আমি এসেছিলাম। পাপের মধ্যেই আমি বড় হয়েছি। আমি যখন নিতান্ত অবুঝ শিশু, তখনই বড়রা আমাকে পাপের সম্মুখে নিক্ষেপ করেছিল। পাপে পাঠ শিখিয়ে তারা আমাকে বড় করেছে। তারপর বলেছে, যাও, এবার নিজের রূপ আর দেহ দয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত কর। মানুষ খুন কর। মিথ্যা বল, প্রতারণা কয়। আপাদমস্তক চরিত্রহীন হয়ে যাও। এ পথে নামিয়ে ওরা আমাকে বলেছিল, এটা তোমার ক্রুশের অর্পিত দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন করলে তুমি জান্নাত পাবে।
পাগলের মত চীৎকার করছে মেয়েটি। ধীরে ধীরে মন্থর হয়ে আসছে তার ঘোড়ার গতি। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটি বলে, খোদা! যে ধর্ম সত্য, যে দ্বীন তোমার মনোপূতঃ আজ আমাকে তুমি তার মোজেজা দেখাও, সে ধর্মের উসিলায় আমাকে রক্ষা কর।
বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে উঠে মেয়েটির। পাপের অনুভূতি শিথিল করে তোলে তার পুরনো ধর্মের বাঁধন। মৃত্যুর ভয়ে ভুলে যায় সে কোন্ ধর্মের মেয়ে। নিজেকে পাপের সমুদ্রে নিমজ্জিত দেখতে পায় সে। হৃদয়ে তার এই অনুভূতি জাগতে শুরু করে, আমি পুরুষদের একটি ভোগ্য-সামগ্রী, আমি একটি প্রতারণার ফাঁদ। তার-ই শাস্তি এখন ভোগ করছি আমি।
চৈতন্য হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয় মেয়েটির। নিজেকে সামলিয়ে রাখার চেষ্টা করে সে। উচ্চকণ্ঠে আহ! বলে চীৎকার দিয়ে মাথাটা ঝাঁকি দিয়ে সে বলে উঠে, আমাকে রক্ষা কর খোদা! আমাকে বাঁচাও। এমনি বেঘোরে প্রাণটা নিওনা তুমি আমার?
তখনি মেয়েটার মনে পড়ে যায়, সে এতীম । মৃত্যুর কবলে পড়লে অতীতের দিকে পালাতে চেষ্টা করে মানুষ। এ যুবতীটিও তার অতীতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ওখানে তার নেই যে কেউ! মা নেই, বাপ নেই, ভাই-বোন কেউ নেই তার। তার মনে পড়ে যায়, খৃষ্টানরা তাকে লালন-পালন করেছে, প্রশিক্ষণ দিয়ে এ পথে নিক্ষেপ করেছে। নিজের প্রতি নিজের-ই ঘৃণা জাগতে শুরু করে তার।
মেয়েটি এখন ক্ষমার প্রত্যাশী। কৃত পাপের পরিণাম থেকে মুক্তি পেতে চায় সে।
ঘোড়ার গতি তার ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসে। কোন রকম পা টেনে টেনে চলছে ঘোড়াটি। ধীরে ধীরে ঝড়ও থেমে যায়। চৈতন্য হারিয়ে সে ঘোড়ার পিঠে-ই উপুড় হয়ে পড়ে থাকে।
***
সুলতান আইউবী মিসরের সীমান্তে টহল প্রহরার ব্যবস্থা করে রেখেছেন আগেই। তার তিনটি প্লাটুনের হেডকোয়ার্টার সুদান ও মিসর সীমান্ত থেকে পাঁচ মাইল ভিতরে। হেডকোয়ার্টারের তাঁবু বসান হয়েছে এমন স্থানে, যেখানে ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার মত আড়াল আছে। কিন্তু এই দম্কা ঝড় তাদেরও নিরাপদ তাঁবুগুলো পর্যন্ত উড়িয়ে নিয়ে গেছে। উট-ঘোড়াগুলোকে সামলানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ঝড় থামলে সৈন্যরা তাঁবু প্রভৃতি গোছানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
আহমদ কামাল এ তিন প্লাটুনের কমাণ্ডার। গৌরবর্ণ, সুদর্শন ও স্বাস্থ্যবান এক সুপুরুষ। বাড়ি তুরস্ক। ঝড় থামলে তিনিও বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং মালপত্র ও পশুপালের পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন। আকাশ পরিষ্কার। ধূলো-বালি উড়ছে না এখন আর। অনেক দূরের বস্তুটিও এখন চোখে পড়ছে। এক সিপাহী হঠাৎ একদিকে ইঙ্গিত করে বলে উঠে, কমাণ্ডার! কমাণ্ডার!! ঐ যে একটি ঘোড়া আর একজন আরোহী দেখা যাচ্ছে। ওটি আমাদের নয় তো?
