তাঁবু থেকে বেরিয়ে বেশ কিছু পথ অগ্রসর হয়ে মেয়েরা ঘোড়ার গতি কমিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে চলছে তারা। অগ্রসর হয় আরো কিছু পথ। এবার তীব্রগতিতে ঘোড়া দুটায়। তীরবেগে ছুটে চলেছে ঘোড়া। বাকী রাতটুকু চলে একই গতিতে। রাতের মরুভূমি নিরুত্তাপ।
ভোর হল। পূর্ব আকাশে সূর্য উদিত হয়েছে। মেয়েদের চারদিকে গোলাকার টিলা। সম্মুখে বালুকাময় মাটির উঁচু উঁচু পাহাড়। মেয়েদের পথ রোধ করে দানবের মত দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়গুলো। সূর্যের দিকে তাকিয়ে দিক-নির্ণয় করার চেষ্টা করে তারা। ঢুকে পড়ে টিলার ফাঁকে আঁকা-বাঁকা দুর্গম পথে। ঘোড়াগুলো পিপাসার্ত। নিজেদেরও পিপাসায় ধরেছে তাদের। ঘোড়াগুলোর সঙ্গে একটি করে পানির ছোট্ট মশক বাধা। একদিনও চলবে না সেই পানিতে। পানির অন্বেষায় কোথাও খেজুর বাগান আছে কি না খুঁজতে শুরু করে তিন মেয়ে। সূর্য উঠে এসেছে আরো উপরে। ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে উত্তাপ। গরমে যেন মরুভূমি জাহান্নামে পরিণত হতে যাচ্ছে। না, খেজুর বাগান নেই আশেপাশে কোথাও, নেই এক ফোঁটা পানিও।
সূর্যোদয়ের পর এখনো ঘুমুচ্ছে রজব ও তার সঙ্গীরা। মদের নেশা ভালো করেই পেয়েছে তাদের। তিনজন হাবশীকে সঙ্গে নিয়ে এসে উপস্থিত হয় পুরোহিত। আগে যায় মেয়েদের তাঁবুতে। তবু শূন্য। রজবকে ঘুম থেকে জাগায় সে। বলে, কই, মেয়ে দুটোকে আমার হাতে তুলে দাও, জলদি কর। রজব তখনো বিছানায় শোয়া। ধড়মড় করে উঠে বসে সে। কাকুতি-মিনতি করে মেয়েদের জীবন ভিক্ষা চায়। মেয়েদেরকে কি উদ্দেশ্যে এখানে এনেছে, আবারও তার বিবরণ দেয়। কিন্তু পুরোহিত তার কোন কথা-ই শুনছে না। দেবতার সন্তুষ্টির জন্য নারী বলি তাকে দিতেই হবে। আর এদেরকে হাতছাড়া করলে বলি দেয়া তার অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রজব সঙ্গীদের জাগাতে চাইলে হাবশীরা তাকে বাধা দেয়। বলে, পুরোহিত যা বলছেন, তার অন্যথা করলে পরিণতি ভাল হবে না। পুরোহিত জিজ্ঞেস করে, মেয়েগুলো কেথায়?
নিজের তাঁবুতে বসে বসেই রজব মেয়েদের ভাক দেয়। কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। উঠে দাঁড়ায় রজব। মেয়েদের তাঁবুতে গিয়ে দেখে, তাঁবু শূন্য। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোথাও দেখা গেল না তাদের। হঠাৎ রজবের দৃষ্টি পড়ে ঘোড়ার জিনের উপর। কিন্তু একি! তিনটি জিন-ই যে নেই! রজব দৌড়ে যায় আস্তাবলে। ঘোড়াও তো তিনটি উধাও! ঘটনাটা বুঝে ফেলে রজব। পুরোহিতকে বলে, আপনার ভয়ে ওরা পালিয়ে গেছে। ওদের ভাগিয়ে আপনি বেশ করেছেন।
তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে পুরোহিত। বলে, তুই ওদের ভাগিয়েছি। আমার আশা-ভরসা সব তুই মাটি করে দিলি! হাবশীদের বলে, একে নিয়ে বেঁধে রাখ । বেটা আংগুকের দেবতাকে আবার রুষ্ট করল। কয়েকজন সুদক্ষ অশ্বারোহী ডেকে আন। এক্ষুণি মেয়েদের ধাওয়া করতে বল। যেখান থেকে হোক, খুঁজে ওদের আনতেই হবে। এখনো বেশী দূর যেতে পারেনি তারা। যাও, জলদি কর।
রজবের যুক্তি-প্রমাণ, অনুনয়-বিনয় উপেক্ষা করে হাবশীরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। হাত দুটো পিছনে করে একটি গাছের সাথে বেঁধে রাখে। তার ঘুমন্ত সঙ্গীদের অস্ত্রগুলো নিয়ে নেয়। তাদের হুমকি দিয়ে বলে, এখান থেকে এক চুল নড়বি তো খুন করে ফেলব।
ক্ষণিকের মধ্যে এসে উপস্থিত হয় ছয়জন অশ্বারোহী। মেয়েদের ধাওয়া করে ধরে আনার জন্য রওনা হয় তারা। বালির উপর তিনটি ঘোড়ার পদচিহ্ন দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। সেই পদচিহ্ন অনুসরণ করে তীব্রবেগে ছুটে চলে ছয় ঘোড়সওয়ার। কিন্তু মেয়েদের নাগাল পাওয়া অত সহজ নয়। তাদের পলায়ন আর এই পশ্চাদ্ধাবনের মাঝে কেটে গেছে আট-দশ ঘন্টা।
হাবশী অশ্বারোহীদের মরুভূমির পথ-ঘাট সব চেনা। তদুপরি তারা পুরুষ। অল্প সময়ে তারা এগিয়ে যায় অনেক পথ। তীব্র বাতাস বইছে। বালি উড়ছে। তবু সমান গতিতে এগিয়ে চলছে তারা।
তিন ঘন্টা পথ চলার পর হাবশী অশ্বারোহীরা হঠাৎ দেখতে পেল, সম্মুখ আকাশে দিগন্তেরও উপরে মরুভূমির ধূলো-বালি ঘূর্ণাবর্তের মত পাক খেয়ে খেয়ে ধেয়ে আসছে। ভয়ার্ত চোখে বীর আরোহীরা পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে তীব্রগতিতে পিছন দিকে পালাতে শুরু করে তারা।
মরুভূমির দম্কা বাতাস, যাকে বলে সাইমুম। এ ভয়ংকর ঝড় বড় বড় টিলাকে বালু-কণায় পরিণত করে উড়িয়ে নিয়ে যায়। রাশি রাশি টিলা মুহূর্তের মধ্যে সমতল ভূমিতে রূপান্তরিত হয়। এই ঝড়ের মধ্যে কোন মানুষ বা পশু যদি দাঁড়িয়ে কিংবা বসে থাকে, তাহলে উড়ে আসা বালি তার গায়ে বসে তাকে জীবন্ত সমাধিস্থ করে এবং ছোট-খাট একটি টিলা দাঁড়িয়ে যায় তার উপর।
বকা ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার মত আশেপাশে শক্ত কোন টিলা নেই। পালিয়ে নিজেদের পাহাড়ী এলাকায় ফিরে যেতে মনস্থ করে হাবশী অশ্বারোহী। কিন্তু সে পাহাড় য়ে অনেক দূর। তাছাড়া দমকা ঝড় পৌঁছে গেছে সেখানেও। সেখানকার বড় বড় বৃক্ষগুলো বাতাসের তোড়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে দ্বি-খণ্ডিত হয়ে চীৎকার করছে যেন।
ঝিলের কুমীরগুলো ভয়ে পাহাড়ের নালায় গিয়ে আত্মগোপন করে আছে। পুরোহিত একস্থানে হাটু গেড়ে বসে পড়ে হাত দুটো একবার মাটিতে একবার মাথায় খুঁড়ে হা-হুঁতাশ করছে আর বিলাপ করে বলছে, ওহে আংগুকের দেবতা! তোমার গজব সংবরণ কর। আর একটু ধৈর্য ধর দেবতা। অল্প পরেই আমরা দুটি মেয়েকে তোমার চরণে নিবেদন করছি। আমাদের প্রতি একটু দয়া কর দেবতা!
