বলি কী জানতে চায় মেয়েরা। রজব জানায়, তোমাদের মাথা কেটে কার জন্য কদিন রেখে দেবে এবং দেহটা ঝিলে নিক্ষেপ করবে। ঝিলে অনেকগুলো কুমীর আছে। তারা তোমাদের দেহকে খেয়ে ফেলবে।
বলির ব্যাখ্যা শুনে মেয়েরা শিউরে উঠে। গায়ের লোম কাটার মত দাঁড়িয়ে যায় তাদের। শুকিয়ে যায় মুখের রক্ত। তাদের রক্ষা করার জন্য রজব কি চিন্তা করেছে জানতে চায় মেয়েরা। রজব বলে, আমি নানাভাবে তাদেরকে বুঝাবার চেষ্টা করেছি। তোমরা কারা, কোথা থেকে কেন এসেছ, তা-ও বলেছি। কিন্তু আমার কোন কথা-ই তার কানে পশেনি। দেবতার সন্তুষ্টি ছাড়া কিছুই বুঝছে না সে। আমি এখন তার দয়ার উপর নির্ভরশীল। অনুগ্রহ করে যদি তিনি তোমাদের মুক্তি দেন, তবেই তোমরা রক্ষা পাবে। আমি এদেরকে কাছে টানার ইচ্ছা করেছিলাম। এ গোত্রের লোকেরা আমার বাহিনীতে যোগ দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু নিজেদের বিশ্বাসে তারা এতই অনড় যে, দেবতাদের সন্তুষ্ট না করে তারা আমার কোন কথাই শুনতে রাজি নয়।; রজবের কথা শুনে মেয়েরা বুঝে ফেলে যে, সে তাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না কিংবা পুরোহিতকে সন্তুষ্ট করার জন্য তাদেরকে বাঁচাবার চেষ্টা করবে না। গতরাতে তারা রজবের দুর্মতির কিছুটা প্রমাণও পেয়ে গেছে। কাজেই রজবের ব্যাপারে মেয়েরা সম্পূর্ণ নিরাশ।
মেয়েরা তাঁবুতে চলে যায় । ভেবে-চিন্তে তিনজনে সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা এখানে রজবেরুমনোরঞ্জন কিংবা হাবশীদের দেবতার বলির যূপকাষ্ঠে চড়ার জন্য আসিনি। জীবন রক্ষা করার চেষ্টা না করে এভাবে এক নির্মম অপমৃত্যুর মুখে নিজেদের ঠেলে দেয়ার কোন যুক্তি নেই। কাজেই যে করে থোক আমাদের পালাতে হবে। পালিয়ে আমাদের ফিলিস্তীন চলে যেতে হবে।
নিরাপদে সে রাত কেটে যায়। হাবশী পুরোহিত পরদিনও এসে রজবের সঙ্গে কথা বলে। মেয়েরা মনে মনে পলায়নের প্রস্তুতি নিয়েছে। রাতে ঘোড়াগুলো কোথায় থাকে, সেখান থেকে পালিয়ে বের হওয়ার পথ কোন্ দিকে, তা ভালভাবে দেখে নেয় তারা। এখান থেকে পালিয়ে ফিলিস্তীন পৌঁছা তিনটি মেয়ের পক্ষে অত্যন্ত দুরুহ ব্যাপার, তা মেয়েরা জানে তরু তাদের যেতেই হবে।
পুরোহিত চলে গেলে মেয়েরা রজবকে জিজ্ঞাসা করে, লোকটা আবার এসে কী বলে গেল? রজব বলল, কাল রাতে এসে তোমাদেরকে তারা এখান থেকে নিয়ে যাবে। লোকটি আমাকে হুমকি দিয়ে গেল যে, আমি যদি তাদেরকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করি, তাহলে তারা আমাকে খুন করে কুমীরের ঝিলে নিক্ষেপ করবে।
আতঙ্কেল্প মধ্য দিয়ে কেটে যায় সারাটা দিন। পালাবার পরিকল্পনার কথা রজবকে জানায়নি মেয়েরা কারণ, রজবের উদ্দেশ্য তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। আর রজবের মনেও এমন কোন সন্দেহ জাগেনি যে, জীবন রক্ষা করার জন্য মেয়েগুলো পালিয়ে যেতে পারে। । পালাবার পথ চিনে নেয়ার জন্য কৌশল আঁটে মেয়েরা। তারা রজবকে বলে, নরকসম এই পার্বত্য এলাকার মধ্যখানে এমনি এক সবুজ-শ্যামল ভূখন্ড সত্যিই প্রকৃতির এক লীলা। চল, জায়গাটা একটু ঘুরে-ফিরে দেখে আসি। রজব তাদের ভ্রমণে নিয়ে যায়। কতটুকু অগ্রসর হওয়ার পর তাদের চোখে পড়ে সেই ভয়ানক ঝিল। ঝিলের এক কিরে লক্ষ হয়ে পড়ে আছে পাঁচ-ছয়টি কুমীর। ঝিলের পানি গাঢ় ও পুঁতিগন্ধময়।
রজব বলে, এই সেই ঝিল। হাবশীরা নারী বলি দিয়ে বলির মস্তকবিহীন দেহ এ ঝিলে নিক্ষেপ করে। আর এই সেই কুমীর, যারা বলির নারীদেহ খেলে দেবতারা তুষ্ট হয়। তোমাদেরও বলি দিয়ে পুরোহিত এই ঝিলে এসব কুমীরের মুখে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এম্নি ভয়ানক দৃশ্য দেখে মেয়েদের মনে পালাবার ইচ্ছা আরো প্রবল হয়ে উঠে। ভ্রমণের বাহানায় পালাবার পথ-ঘাট ভালো করে দেখে নেয় তারা। পালাবার জন্য তারা নরম পথ চিনে নেয়, চলার সময় যেন পথে ঘোড়ার পায়ের শব্দ না হয়।
অপরদিকে হাবশী পুরোহিত পার্শ্ববর্তী লোকালয়ে বসে গোত্রের লোকদেরকে সুসংবাদ প্রদান করছে যে, বলির জন্য মেয়ে আমি পেয়ে গেছি। আজ থেকে চার দিন পর পূর্ণিমার রাতে অনুষ্ঠিত হবে বলির পর্ব। পুরোহিত জানায়, বলি হবে দেব-মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের উপর। তারপর আমরা মন্দির পুনঃনির্মাণ করব। তারপর যারা আমাদের দেবতাদের অপমান করল, তাদের থেকে প্রতিশোধ নেব।
***
রাতের দ্বি-প্রহর। বিশেষ প্রশিক্ষণের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় মেয়েরা। তারা রজব ও তার সঙ্গীদের এত পরিমাণ মদ পান করায় যে, সঙ্গে সঙ্গে তারা অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সহসা জাগ্রত হওয়ার কোন আশংকা নেই। কি পরিমাণ মদ খাওয়ালে একজন মানুষকে কত সময় অচেতন রাখা যায়, তা ওরা বেশ জানে।
উঠে দাঁড়ায় মেয়েরা। সফরের সামানাদি গুছিয়ে বেঁধে নেয়। ঘোড়ায় জিন লাগায়। তিনজন চড়ে বসে তিনটি ঘোড়ায়। দিনের বেলা ঠিক করে রাখা নরম মাটির পথে ঘোড়া ছুটায়। ভয়ানক এই বন্দীদশা থেকে বেরিয়ে যায় তারা।
গন্তব্য তাদের ফিলিস্তীন। রজব তাদের যে পথে নিয়ে এসেছে, এগুতে হবে সে পথ ধরে-ই। তারা অস্বাভাবিক বিচক্ষণ মেয়ে। সামরিক দক্ষতাও আছে তাদের। কিন্তু তাদের একথা জানা নেই যে, বালুকাময় মরুভূমিতে পদে পদে এত প্রবঞ্চনা লুকিয়ে থাকে, যা অতি অভিজ্ঞজনদেরকেও বোকা বানিয়ে ছাড়ে। এই দীর্ঘ মরু অঞ্চলে একাকী চলে না কেউ চলে দল বেঁধে। সব রকম বিপদের মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়েই যাত্রা শুরু করে মানুষ।
