তিন খৃষ্টান যুবতাঁকে নিয়ে রক্ষীদের সঙ্গে এগিয়ে চলছে রজব। এ সফর তার যেমন দীর্ঘ, তেমনি বিপদসংকুল। রজব আইউবী বাহিনীর দলত্যাগী ও বিদ্রোহী কমান্ডার। সুলতান আইউবী যে তার সীমান্তে টহল-প্রহরার ব্যবস্থা করে রেখেছেন, তা তার জানা আছে। তাই সীমান্তের অনেকদূর ভিতর দিয়ে কাফেলাকে নিয়ে আসছে সে।
রজবের কাফেলায় আছে তিনটি উট। পানি, খাবার এবং খৃষ্টানদের দেয়া মাল-পত্রে বোঝাই উটগুলো। নিজেরা চলছে ঘোড়ায় চড়ে।
কয়েকদিন পথ চলার পর রজব দেবতার পাহাড়ে এসে পৌঁছে। শ্বেতাঙ্গী দুটি রূপসী মেয়ে বলি দিতে হবে পুরোহিত এ ঘোষণা দিয়েছিল মাত্র তার আগের দিন।
রজব এসে সর্বপ্রথম সাক্ষাৎ করে পুরোহিতের সঙ্গে। রজবের সঙ্গে সাদা চামড়ার তিনটি সুন্দরী মেয়ে দেখে পুরোহিতের চক্ষু তো চড়ক গাছ। সীমাহীন আনন্দে প্রফুল্প হয়ে উঠেন পুরোহিত। দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেয়ার জন্য ঠিক এমৃনি দুটি মেয়ে-ই তার এয়োজন। পুরোহিত মেয়েদের ব্যাপারে জানতে চাইলে রজব বলে, আমি বিশেষ উদ্দেশ্যে এদেরকে সঙ্গে এনেছি।
পাহাড়ের অভ্যন্তরে সবুজ-শ্যামল মনোরম একটি জায়গা। স্থানটি তিনদিক থেকে পাহাড়ঘেরা। পূর্ব থেকেই তাঁবু খাটানো আছে। এটি-ই রজবের আস্তানা। রজব মেয়েদের নিয়ে যায় সেখানে।
মেয়েদের আরাম-আয়েশের সব আয়োজন-ই আছে এখানে। তাদের জন্য মদের ব্যবস্থাও করে রেখেছে রজব।
অনেক দীর্ঘ ও বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে রজব নিরাপদে এখানে এসে পৌঁছেছে। মনে তার বেশ আনন্দ। তাই সকলকে নিয়ে রাতে উৎসবের আয়োজন করে। নিজে মদপান করে, ক্ষী এবং মেয়েদেরও মদপান করায়।
মধ্যরাত। চারদিক নীরব-নিস্তব্ধ। রজবের রক্ষীরা গভীর নিদ্রায় বিভোর। এমন সময়ে পা টিপে টিপে রজব এগিয়ে আসে মেয়েদের তাঁবুতে। একটি মেয়ের বাহ ধরে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করে নিজের তাঁবুতে। রজবের মতলব বুঝে ফেলে মেয়েটি। বলে, আমি গণিকা নই। এখানে এসেছি আমি ক্রুশের দায়িত্ব পালন করতে অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়। আপনার সঙ্গে আমি মদপান করতে পারি–যৌনকর্মে লিপ্ত হতে পারি না।
রজব হাসতে হাসতে মেয়েটিকে জোর করে তার তাঁবুতে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। মেয়েটি ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে রজবের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয়। রজব পুনরায় হাত বাড়াতে চাইলে মেয়েটি দৌড়ে তাঁবুতে চলে যায়।
ঘটনাটি অপর দুমেয়ের কানে গেলে তারা তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে আসে। রজব বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তারা রজবকে বুঝাতে চেষ্টা করে যে, আপনি আমাদের ভুল বুঝবেন না, এ আচরণ আপনার ঠিক হয়নি।
ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে রজব। বলে, তোমরা কত পবিত্র মেয়ে আমার তা জানা আছে। বেহায়াপনা যাদের পেশা, তারা গণিকা নয় তো কি?
এ পেশার প্রয়োগ আমরা সেখানেই করি, যেখানে কর্তব্য পালনে এ-কাজ প্রয়োজন । হয়। নিছক বিনোদনের জন্য আমরা ও-সব করি না। বলল মেয়েটি।
মেয়েদের কথায় নিরস্ত হতে চাইল না রজব। অবশেষে কঠোর হল মেয়েরা। বলল, আমাদের সঙ্গে দশজন রক্ষী আছে। তারা আমাদের নিরাপত্তার জন্য-ই এসেছে। আগামীকাল-ই তাদের ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রয়োজন বোধ করলে আমরা তাদেরকে এখানে রেখে দিতে পারি কিংবা তোমাকে ফেলে রেখে তাদের সঙ্গে আমরা চলেও যেতে পারি। আশা করি সীমালংঘন থেকে তুমি বিরত থাকবে।
চুপসে যায় রজব। কিন্তু ভাবে মনে হচ্ছে, মেয়েদেরকে সে ক্ষমা করবে না।
কেটে যায় রাত।
পরদিন ফিলিস্তীন থেকে আসা দশ রক্ষীকে রজব বিদায় করে দেয়। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা এল। রজব মেয়েদের নিয়ে আড্ডায় বসেছে। হঠাৎ চারজন হাবশীসহ পুরোহিত এসে উপস্থিত। সুদানী ভাষায় পুরোহিত রজবকে বলে, দেবতা আমাদের উপর রুষ্ট হয়ে আছেন। তিনি দুটি ফিরিঙ্গী বা মুসলমান মেয়ের বলি চাচ্ছেন। তোমার এই মেয়েগুলো বলির জন্য বেশ উপযুক্ত। এর থেকে দুটি মেয়ে তুমি আমাকে দিয়ে দাও।
আঁতকে উঠে রজব। আগুন ধরে যায় তার মাথায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে উঠে তার। বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে থাকে পুরোহিতের প্রতি। অবশেষে বলে, এরা তো বলির মেয়ে নয়। এদের দ্বারা আমাকে বিশেষ ফজি নিতে হবে। এদের হাতে-ই তোমাদের দেবতাদের দুশমনকে হত্যা করতে হবে।
পুরোহিত বলল, না, তুমি মিথ্যে বলছ। তুমি এদেরকে এখানে আমোদ করার জন্য এনেছ। এদের দুজনকে আমরা বলি দেব-ই দেব।
রজব পুরোহিতকে নানাভাবে বুঝাতে চেষ্টা করে; কিন্তু পুরোহিত কিছুতেই কিছু মানছে না। দেবতা সাওয়ার হয়ে বসেছে যেন তার মস্তকে। দুটি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে পুরোহিত বলল, এরা দুজন দেবতার জন্য উৎসর্গিত। আংকের মুক্তি এখন এদের হাতে। রজবকে বলল, মেয়েদের নিয়ে ব্যথা পালাবার চেষ্টা করবে না; আমাদের ফাঁকি দিয়ে তুমি এখান থেকে পালাতে পারবে না।
মেয়েরা সুদানী ভাষা বুঝে না। পুরোহিত চলে যাওয়ার পর রজবকে বিমর্ষ দেখে তারা জিজ্ঞেস করে, লোকটা কী বলে গেল? তার কথা শুনে তুমি-ই বা এত অস্থির হয়ে পড়লে কেন? রজব রাখঢাক না করে পরিষ্কার বলে দেয় যে, লোকটা এখানকার দেব-মন্দিরের পুরোহিত। তোমাদেরকে তিনি বলি দিতে চাইছেন। দেবতারা নাকি তাদের উপর রুষ্ট হয়ে গেছেন। এখন নারী বলি দিয়ে তিনি এই অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পেতে চান।
