না, জনাব! আমাকে অত দুর্বল ভাববেন না। আলী বিন সুফিয়ানকে হত্যা করার দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। ফেদায়ীদের সঙ্গে এ বিষয়ে আমি আলোচনাও করেছি। তারা সালাহুদ্দীন আইউবীর্কেও হত্যা করতে প্রস্তুত। বলল রজব।
সুদানের দিক থেকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে আপনি মিসরের সীমান্তকে অস্থিতিশীল করে। তুলুন। দেশের ভিতরে মানসিক ও অন্যান্য ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাব আমরা। এদিকে আরবের কয়েকজন মুসলমান আমীর আমাদের কজায় এসে গেছেন। তাদের দু চারজনকে তো আমরা এমনভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছি যে, এখন তারা আমাদেরকে কর দিচ্ছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আক্রমণ চালিয়ে আমরা একটু একটু করে তাদের ভূখন্ড দখল করে চলেছি। সুদানের দিক থেকেও আপনি এ কৌশল অবলম্বন করে কাজ করুন। মুসলমানদের দুজন লোক এখনো রয়ে গেছে। নুরুদ্দীন জঙ্গী আর সালাহুদ্দীন আইউবী। এ দুজনের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর পশ্চিম আকাশে ইসলামী দুনিয়ার সূর্য ডুবে যাবে। শর্ত হল, আপনাকে দৃঢ়পদ থাকতে হবে। আর আপনাদের মিসর যে আপনাদের-ই থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। বললেন সম্রাট কনরাড।
মৌলিক আলাপ-আলোচনার পর বৈঠকে কাজের কৌশল ও পদ্ধতি নিয়েও পর্যালোচনা চলে দীর্ঘক্ষণ। শেষে উদ্ভিন্ন-যৌবনা অনিন্দ্যসুন্দরী ও অতিশয় বিচক্ষণ তিনটি মেয়ে এবং বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে রজবকে বিদায় করা হয়। কায়রোর দুজন লোকের ঠিকানাও দেয়া হয় তাকে। তাদের যে কোন এজনের নিকট মেয়েগুলোকে গোপনে পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয় রজবের হতে। দুজনের একজন হল সুলতান আইউবীর সামরিক বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তা ফয়জুল ফাতেমী।
মেয়েদের দিয়ে কিভাবে কাজ নিতে হয়, রজবকে তা বলা হয়নি। তাকে শুধু এতটুকু অবহিত করা হয়েছে যে, ফয়জুল ফাতেমীর সঙ্গে এদের সম্পর্ক আছে। মেয়েদেরকে কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, তার তা জানা আছে। তাছাড়া মেয়েরাও জানে তাদের কর্তব্য কী। রজবের সঙ্গে দেয়া এই মেয়ে তিনটি আরব ও মিসরের ভাষায় পারদর্শী।
দশজন রক্ষীর প্রহরায় রজব মেয়েদের নিয়ে রওনা হয়। আপাততঃ তার গন্ত সুদানের একটি পাহাড়ী অঞ্চল, যেখানে নারী বলি হত এবং যেখানে সুলতান আইউবীর জানবাজরা উম্মে আরারাহকে হাবশীদের কবল থেকে মুক্ত করে পুরোহিতকে হত্যা এবং তার আস্তানাকে ধ্বংস করেছিল । সুদানীদের পরাজয় এবং খলীফা আল-আজেদের ক্ষমতাচ্যুতির পর রজব পালিয়ে এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছিল এবং এ স্থানকে নিজের আখড়ায় পরিণত করেছিল। হাবশীদের যে গোত্রটির পুরোহিতকে সুলতান আইউবী হত্যা করিয়েছিলেন, রজব তাদেরকে নিজের পাশে এনে জড়ো করেছিল। এখনো সে স্থানটিকে তারা দেবতার আখড়া বলে বিশ্বাস করছে। তারা পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাচ্ছে না। মাত্র চারজন বৃদ্ধ ভিতরে যাওয়া-আসা করছে। তাদের একজন গোত্রের-ই ধর্মগুরু। পরলোকগত পুরোহিতের স্বঘোষিত স্থলাভিষিক্ত হয়ে বসেছে সে। ক্ষী হিসেবে তিনজন লোককে বেছে নিয়ে এখন সে পাহাড়ে আসা-যাওয়া করছে। সে অঞ্চলের-ই নিভৃত এক কোণে রজব তার আস্তানা গেড়েছিল। ফেরার হয়ে সে প্রথমে সেখানে আশ্রয় নিয়ে পরে মিসরের অধিবাসী এক খৃষ্টান এজেন্টের সঙ্গে ফিলিস্তীন চলে গিয়েছিল।
***
হাবশীদের এ গোত্রটি–যার নাম আংগুক–ভয়ে তটস্থ। কারণ, প্রথমতঃ তাদের দেবতার বলি পূরণ হয়নি। দ্বিতীয়তঃ তাদের পুরোহিত খুন হয়েছে। তৃতীয়তঃ তাদের দেবমূর্তির আস্তানাটিও ধ্বংস হয়ে গেছে। সর্বোপরি গোত্রের হাজার হাজার যুবক দেবতার আপমানের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পরাস্ত হয়ে অধিকাংশ নিহত হয়েছে আর অবশিষ্টরা পরাজয়ের গ্লানি ও জখম নিয়ে ফিরে এসেছে। আংগুকের ঘরে ঘরে মাতম চলছে। সর্বত্র বিরাজ করছে শোকের ছায়া।
তাদের কেউ কেউ এমনও ভাবতে শুরু করেছে যে, যিনি তাদের দেব-মূর্তিটি ভেঙ্গেছেন, তিনি বোধ হয় তদপেক্ষাও বড় দেবতা হবেন।
নিহত পুরোহিতের স্থলাভিষিক্ত ও ধর্মগুরু এ অবস্থা দেখে বললেন, দেবতার কুমীর কদিন যাবত অভুক্ত; তার পেটে খাবার দাও। তবেই তোমরা এই বিপদ থেকে মুক্তি পাবে। হাবশীরা দেবতার কুমীরের জন্য কয়েকটি বকরি পাঠিয়ে দেয়। একজন আবেগের আতিশয্যে নিজের উটটি পর্যন্ত পুরোহিতের হাতে তুলে দেয়। কয়েকদিন পর্যন্ত এ পশুগুলো কুমীরদের ঝিলে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। কিন্তু গোত্রের মানুষের মনের ভীতি এতটুকুও কমল না।
এক রাতে পুরোহিত গোত্রের লোকদেরকে এক স্থানে সমবেত করে ঘোষণা দেয় যে, তিনি দেবতাদের সাক্ষাৎ লাভে সমর্থ হয়েছেন। দেবতারা তাকে ইংগিত করেছে যে, যেহেতু সময়মত নারী বলি হয়নি, তাই গোত্রের উপর এ বিপদ নেমে এসেছে। দেবতারা বলেছেন, এখন যদি একত্রে দুটি মেয়ে বলি দেয়া যায়, তাহলে বিপদ দুর হতে পারে। অন্যথায় দেবতা গোত্রের একটি মানুষকেও শান্তিতে থাকতে দেবেন না।
পুরোহিত আরো জানান যে, মেয়ে দুটো আংগুক হতে পারবে না, সুদানীও নয়। হতে হবে ভিনদেশী শ্বেতাঙ্গী।
পুরোহিত আরো কি যেন বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এতটুকু শোনার সঙ্গে সঙ্গে গোত্রের অসংখ্য অকুতোভয় সাহসী যুবক দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বলে উঠে, যে কয়ে হোক, মিসর থেকে দুটি খৃষ্টান কিংৰা মুসলমান মেয়ে আমরা তুলে আনবই। যে কোন ত্যাগের বিনিময়ে হোক, এ বিপদ থেকে নিষ্কৃতি আমাদের পেতেই হবে।
