এ বৈঠকে মিসরে বিশৃংখলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করার জন্যও রজব খৃষ্টানদের সাহায্যের আবেদন জানায়।
সুলতান আইউবী যে হাবশী গোত্রটির ধর্মীয় অধিকারে নির্দয় হস্তক্ষেপ করেছে, প্রতিশোধের জন্য প্রথমতঃ তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সুদানে আরো বে কটি ধর্ম আছে, সেগুলোর অনুসারীদেরকে আইউবীর বিরুদ্ধে এই বলে উত্তেজিত করে তুলতে হবে যে, এই মুসলিম রাজাটি মানুষের ধর্মীয় উপাসনালয় ও পুরোহিত-দেব-দেবীর উপর আগ্রাসন চালিয়ে বেড়াচ্ছেন। নতুন কোন অঘটন ঘটানোর আগে-ভাগে মিসরেই তার পতন ঘটাতে হবে। এভাবে মানুষের ধর্মীয় চেতনায় আগুন ধরিয়ে অনায়াসে তাদেরকে মিসর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। বললেন খৃষ্টান সম্রাট কনরাড।–এক খৃষ্টান কমান্ডার বলল, মিসরের মুসলমানদেরকেও আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারি। শ্রদ্ধেয় রজব যদি অসন্তুষ্ট না হন, তাহলে তার-ই উপকারার্থে আমি এর ব্যাখ্যা প্রদান করব। মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে এক মুসলমানের হাতে অন্য মুসলমানকে খুন করানো কঠিন কিছু নয়। আমাদের ধর্মে যেমন কোন কোন পাদ্রী নিজেই নিজেকে গীর্জার কর্তা বানিয়ে নিজের অস্তিত্বকে মানুষ ও খোদার মাঝে দাঁড় করিয়ে দেন, ঠিক তেমনি মুসলমানদের মধ্যেও কোন কোন ইমাম মসজিদের উপর নিজের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর এজেন্ট হয়ে বসেন।
আমাদের অর্থ আছে। এই অর্থ দিয়ে আমরা আমাদের পছন্দমত মুসলমান মৌলভী-মাওলানা তৈরি করে মিসরের মসজিদে মসজিদে বসাতে পারি। আমাদের কাছে এমন একজন খৃষ্টানও আছেন, যিনি ইসলাম ও কুরআন সম্পর্কে বেশ পারদর্শী। মুসলমান ইমামের বেশে তাকেও আমরা কাজে ব্যবহার করতে পারি। মসজিদে বসে ইমামদের সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে কথা বলা যাবেও না–প্রয়োজনও হবে না। ঐ মৌলতদের মুখে মুসলমানদের মধ্যে আমরা এমন চিন্তাধারা ও কুসংস্কার সৃষ্টি করে দেব যে, তাদের মন থেকে সালাহুদ্দীন আইউবীর ভক্তিশ্রদ্ধা এমনিতেই মুছে যাবে।
এ কাজ আমাদের এক্ষুণি শুরু করে দেয়া দরকার। সুলতান আইউবী মিসরে মাদ্রাসা খুলেছেন। সেখানে শিশু-কিশোর-যুবকদেরকে ইসলামের সঠিক চিন্তা-চেতনার তালীম দেয়া হচ্ছে। এর আগে মিসরে এমন কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ছিল না। মানুষ মসজিদে মসজিদে খোতবা শুনত। সে খুতবায় খলীফার স্তুতি-প্রশংসা-ই থাকত বেশী। এখন সালাহুদ্দীন আইউবী খোতবা থেকে খলীফার আলোচনা তুলে দিয়েছেন। যদি মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ও মনিসিক সচেতনা সৃষ্টি হয়ে যায়, তাহলে আমাদের মিশন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আপনারা নিশ্চয় জানেন, ক্ষমতা পাকাঁপোক্ত করতে হলে জনসাধারণকে মানসিকভাবে পশ্চাদপদ আর দৈহিকভাবে পরনির্ভরশীল করে রাখা একান্ত আবশ্যক। বলল রজব।
মোহতারাম রজব! আপনি দেখছি নিজের দেশ সম্পর্কে কোন খবরই রাখছেন না যে, পর্দার আড়ালে সেখানে কী ঘটছে! সালাহুদ্দীন আইউবী রোম উপসাগরে যেদিন আমাদের পরাজিত করেছিলেন, এ কার্যক্রম তো আমরা সেদিনই শুরু করে দিয়েছি। আমরা প্রকাশ্য ধ্বংসযজ্ঞে বিশ্বাসী নই। আমরা ধ্বংস করি মানুষের মন-মস্তিঙ্ক আর চিন্তা-চেতনা। একটু ভেবে দেখুন মোহতারাম! দু বছর আগে কায়রোতে কটি পতিতালয় ছিল, আর এখন কটি? এই অল্প কদিনে বেশ্যাবৃত্তি কি সন্তোষজনকহারে বৃদ্ধি পায়নি? বিত্তশালী পরিবারগুলোতে যুবক-যুবতীদের মধ্যে আপত্তিজনক মন দেয়া-নেয়ার খেলা কি শুরু হয়ে যায়নি? আমাদের প্রেরিত খৃষ্টান মেয়েরা মুসলমান নারীর বেশ ধরে সেখানে মুসলমান পুরুষদের মাঝে দ্বন্ধ সৃষ্টি করে তাদেরকে খুনাখুনিতে লিপ্ত করিয়েছে। কায়রোতে আমরা অতি আকর্ষণীয় একটি জুয়াবাজি চালু করেছি। আমাদের প্রেরিত লোক দুটি মসজিদে ইমামতি করছে। অত্যন্ত চমৎকারভাবে তারা ইসলামের রূপ পাল্টে দিচ্ছে। জিহাদের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে তারা সেখানকার মুসলমানদের চেতনা নষ্ট করছে। আলেমের বেশে আমরা আরো বেশ কিছু লোক সেখানে পাঠিয়ে রেখেছি। তারা মুসলমানদেরকে যুদ্ধ-জিহাদের বিপক্ষে প্রস্তুত করছে। শত্রু-বন্ধুর ধারণা পাল্টে দিচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি আশাবাদী যে, অল্প ক বছরের মধ্যে মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা এই দাঁড়াবে যে, তারা নিজেদেরকে গর্বভরে মুসলমান দাবি করবে; অথচ তাদের মন-মানসিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির উপর থাকবে ক্রুশের প্রভাব। শোন রজব! একটু বিলম্বে হলেও একটি সময় এমন আসবে, আজ যে মুসলমান ক্রুশের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, সে মুসলমান-ই সেদিন সভ্যতার প্রতীক বিশ্বাসে শ্রদ্ধাভরে ক্রুশ বুকে ধারণ করে চলবে। বলল এক খৃষ্টান কমান্ডার।
সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা বিভাগ অত্যন্ত দক্ষ ও অতিশয় সতর্ক। এ বিভাগের প্রধান আলী বিন সুফিয়ানকে যদি হত্যা করা যায়, তাহলে সালাহুদ্দীন অন্ধ ও বধির হয়ে যাবে। বলল রজব।
তার মানে নিজে আপনি কিছুই করতে পারবেন না; সব আমাদের-ই করে দিতে হবে। শত্রুর গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তাকেও হত্যা করার যোগ্যতা আপনার নেই, তাই না? আপনি যদি বিবেক-বুদ্ধিতে এতই দুর্বল হন, তাহলে তো আপনি আমাদের লোকদেরও ধরিয়ে খুন করাবেন, আমাদের অর্থ-সম্পদ নষ্ট করবেন। বললেন সম্রাট কোনার্ড।
