বেশ কজন ঐতিহাসিক লিখেছেন, আল-আজেদ বিলাসপ্রিয় ও বিভ্রান্ত লোক ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। সুলতান আইউবী-বিরোধী ষড়যন্ত্রেও তার পৃষ্ঠপোষকতা ছিল, তাও ঠিক। কিন্তু আইউবীর প্রতি তার বেশ অনুরাগও ছিল। আইউবীকে তিনি অন্তর দিয়ে ভালবাসতেন।
দুজন ঐতিহাসিক এ-ও লিখেছেন, সুলতান আইউবী যদি আজেদের ডাকে সাড়া দিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তাহলে আজেদ তাকে আরও অনেক তথ্য জানাতেন।
যা হোক, ইতিহাস একথা প্রমাণ করে যে, আজেদের ডাকে কোন প্রতারণা ছিল না। নিজের পাপমোচন এবং আইউবীর প্রতি হৃদ্যতা প্রকাশের উদ্দেশ্যেই তিনি আইউবীকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। এই দুঃখ আইউবীকে বহুদিন পর্যন্ত দংশন করতে থাকে। আল-আজেদ যাদের ব্যাপারে যে তথ্য প্রদান করে গিয়েছিলেন, পরবর্তী অনুসন্ধানে তার প্রতিটি তথ্য অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
ঐসব লোকের নামের তালিকা আলী বিন সুফিয়ানের হাতে দিয়ে সুলতান নির্দেশ দেন, এদের পিছনে গুপ্তচর নিয়োগ কর। অতীব গুরুত্ব সহকারে সতর্কতার সাথে এদের ব্যাপারে তথ্য সগ্রহ কর। তবে নিশ্চিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করবে না। এমন পন্থা অবলম্বন কর, যেন অভিযুক্তকে হাতে-নাতে ধরা যায়, পাছে বিনা দোষে যেন কারো প্রতি অবিচার করা না হয়।
সুলতান আইউবী আজেদের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করান। সেদিনেই অপরাহ্ন-বেলায় আজেদকে সাধারণ কবরস্তানে দাফন করা হয়। অল্প কদিনের মধ্যেই তার সেই কবরের নাম-চিহ্ন মুছে যায়।
সুলতান আইউবী মহলে তল্লাশী চালান। উদ্ধার করেন এত বিপুল পরিমাণ সোনা-হিরা-মাণিক্য ও মূল্যবান উপহার সামগ্রী, যা দেখে তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান।
হেরেমের সকল নারী ও যুবতী মেয়েদেরকে আলী বিন সুফিয়ানের হাতে সোপর্দ করে সুলতান আদেশ দেন যে, প্রত্যেকের নাম-পরিচয় ও বাড়ি-ঘরের ঠিকানা জেনে নাও। যারা নিজ বাড়িতে চলে যেতে চায়, নিজের তত্ত্বাবধানে তাদের পৌঁছিয়ে দাও। অমুসলিম কেউ থাকলে তাদের ব্যাপারে পূর্ণ তদন্ত চালিয়ে তথ্য নাও, কে কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে। কাউকে সন্দেহ হলে বন্দী করে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ কর।
সুলতান আইউবী মহল থেকে উদ্ধারকৃত অর্থ-সম্পদগুলো মিসরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলোতে বন্টন করে দেন।
***
মৃত্যুর আগে আল-আজেদ তার রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার রজব সম্পর্কে বলেছিলেন, রজব সুদানে আত্মগোপন করে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে বাহিনী গঠন করছে এবং সহযোগিতার জন্য খৃষ্টানদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আলী বিন সুফিয়ান এমন ছয়জন জানবাজ বেছে নেন, যারা অভিজ্ঞ গুপ্তচর হওয়ার পাশাপাশি দুঃসাহসী যোদ্ধাও। তাদের কমান্ডার রজবকে চিনে। পূর্ণ পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়ে আলী বিন সুফিয়ান বণিক বেশে তাদেরকে সুদান প্রেরণ করেন। তাদেরকে আদেশ দেয়া হয়, সম্ভব হলে রজবকে জীবিত ধরে আনবে, অন্যথায় সেখানেই হত্যা করবে।
তারা যখন রওনা হয়ে যায়, রজব তখন সুদানে ছিল না। তখন ফিলিস্তীনের এক বিখ্যাত দুর্গ শোবকে অবস্থান করছিল সে। ফিলিস্তীন তখন খৃষ্টানদের দখলে। সোবক তাদের প্রধান ঘাঁটি। খৃষ্টানদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শোবকের মুসলমানরা দলে দলে পালিয়ে যাচ্ছিল। সেখানকার কোন মুসলমানের ইজ্জত তখন নিরাপদ ছিল না। ডাকাত বেশে খৃষ্টানরা মুসলমানদের কাফেলা লুট করে বেড়াত। অপহরণ করে নিয়ে যেত মুসলিম মেয়েদের। এ কারণেই সুলতান আইউবী সর্বপ্রথম ফিলিস্তীনকে পদানত করতে চাইছিলেন। তাছাড়া মুসলমানদের প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাসও খৃষ্টানদের দখলে। কিন্তু মুসলিম শাসকগণের অবস্থা ছিল এই যে, তারা খৃষ্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা ও খাতির-তোয়াজে ব্যস্ত। রজবও ছিল তেমনি একজন। সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে মদদ হাসিল করার জন্য-খৃষ্টানদের দুয়ারে ধরণা দিয়ে বসে আছে সে।
রজবের সম্মানে সোবকে নাচ-গান-বাদ্যের আসর চলছে। রজব কায়োমনে উপভোগ করছে সে অনুষ্ঠান। অপূর্ব সুন্দরী যুবতীরা নগ্নদেহে তার সামনে নাচছে, গাইছে। কিন্তু একটিবারও সে ভেবে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি যে, এই গায়িকাদের অধিকাংশই মুসলিম পিতা-মাতার সেইসব কন্যা, খৃষ্টানরা শৈশবে যাদের অপহরণ করে এনে বেহায়াপনার প্রশিক্ষণ দিয়ে এ পেশায় নিয়োজিত করেছে। স্বজাতির মেয়েদের নাচ দেখে, গান শুনে, তাদের হাতে মদ পান করে কাফিরদের আতিথেয়তা উপভোগ করছে রজব। রাতভর মদ আর নাচ-গানে মত্ত থাকে সে। পরদিন সকালে আলোচনার জন্য খৃষ্টানদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেয়।
বৈঠকে উপস্থিত আছেন খৃষ্টান সম্রাট হে অফ লুজিনান ও কনরাড। আছেন বেশ কজন খৃষ্টান সেনা কমান্ডার।
রজব আগেই খৃষ্টানদের অবহিত করেছিল, সুলতান আইউবী এক সুদানী হাবশী গোত্রের উপাসনালয়কে ভেঙ্গে চুরমার করে তার পুরোহিতকে হত্যা করে ফেলেছে। জবাবে সুদানীরা আইউবী বাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু তাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা পিছনে সরে আসতে বাধ্য হয়।
শুধু তা-ই নয়–খলীফা আল-আজেদের ফাতেমী খেলাফত বিলুপ্ত করে আইউব খেলাফতে আব্বাসীয়াও ঘোষণা দেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মিসরের শাসন ক্ষমতায় কোন খলীফা থাকছেন না। সুলতান আইউবী নিজেই মিসরের স্বাধীন-সার্বভৌম শাসক হতে চাইছেন। এসবের মোকাবেলায় সুদানে গিয়ে আমি বাহিনী গঠন করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এ কাজে আমি আপনাদের সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতা একান্তভাবে কামনা করছি।
