তার সামরিক বিভাগে ফয়জুল ফাতেমী পদস্থ একজন অফিসার। কিন্তু সে জানে না, সে-ও তার শত্রুদের একজন। রজবের ডান হাত সে। তার বাহিনীর তুর্কি, সিরীয় এবং আরব বংশোদ্ভূত কমান্ডার ও সৈন্যদের ব্যতীত আর কাউকে যেন সে বিশ্বাস না করে। এরাই শুধু তার ওফাদার এবং ইসলামের সংরক্ষক। মিসরী সৈন্যদের মধ্যে উভয় চরিত্রের লোক-ই আছে।
সালাহুদ্দীনকে বলবে, তুমি হয়ত জান না, সুদানী সৈন্যদের উপর যখন তুমি চুড়ান্ত আক্রমণ চালিয়েছিলে, তখন তোমার আক্রমণকারী বাহিনীতে দুটি বাহিনীর দুই কমান্ডার তোমার নির্দেশনা লংঘন করে তোমার অভিযানকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তোমার নিবেদিতপ্রাণ তুর্ক ও আরব সৈন্যরা তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে শেষ পর্যন্ত কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও তাদের কমান্ড অমান্য করে সুদানীদের উপর বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অন্যথায় এই দুই কমান্ডার যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন করে তোমাকে ব্যর্থ-ই করে। দিয়েছিল বলা যায়।
মরণোন্মুখ ক্ষমতাচ্যুত খলীফা আল-আজেদ মর মর কণ্ঠে থেমে থেমে কথা বলছেন। ডাক্তার এক-দুবার তাকে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু হাতের ইশারায় তিনি ডাক্তারকে থামিয়ে দেন।
বৃদ্ধের মুখমন্ডল ঘামে ভিজে গেছে, যেন কেউ তার মুখে পানির ছিটা দিয়েছে। দুই মহিলা রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে দেয়। কিন্তু ঘাম যেন ফোয়ারার মত নির্গত হচ্ছে। এ অবস্থায় আজেদ আরো কজন প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মকর্তার নাম বললেন, যারা সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর হল ফেদায়ী, রহস্যময় উপায়ে হত্যাকান্ড ঘটানো যাদের একমাত্র কাজ। আজেদ মিসরে খৃষ্টানদের জেঁকে বসার বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে বললেন—
আমি যাদের কথা বললাম, আইউবীকে বলবে, এদেরকে তুমি মুসলমান মনে কর না। এরা ঈমান বিক্রি করে ফেলেছে। শোন ডাক্তার! সালাহুদ্দীনকে আরো বলবে, আল্লাহ তোমাকে কামিয়াব করুন এবং বিজয় দান করুন। তবে মনে রাখবে, আপনদের মধ্যে তোমার শত্রু দুপ্রকার। প্রথমতঃ তারা, যারা গোপনে তোমাকে ধোঁকা দিয়ে বেড়াচ্ছে, দ্বিতীয়তঃ তারা, যারা খোশামোদ করতে করতে তোমাকে খোদার আসনে নিয়ে বসাবে। মনে রাখবে, এই দ্বিতীয় শ্রেণীর দুশমন প্রথম শ্রেণী অপেক্ষা বেশী ভয়ংকর।
ডাক্তার! আইউবীকে আরো বলবে, শত্রুকে পরাজিত করে যখন তুমি নিশ্চিন্তে গদিতে বসবে, তখন আমার মত তুমিও উভয় জগতের রাজা হয়ে বস না যেন। নিরংকুশ রাজত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ্। মানুষ আল্লাহর অনুগত প্রতিনিধি মাত্র। এই মিসরে ফেরআউনের ধ্বংসাবশেষের প্রতি দৃষ্টি দাও, আমার পরিণতি দেখ। নিজেকে এম্নি পরিণতি থেকে রক্ষা করে চল।
ওষ্ঠাধর কেঁপে ওঠে আজেদের। কণ্ঠে জড়তা এসে যায় তার। আরো কিছু বলতে চায় বৃদ্ধ। কিন্তু কথার পরিবর্তে কণ্ঠনালী থেকে বেরিয়ে আসে গড়গড় শব্দ। মাথাট হেলে পড়ে একদিকে। ক্ষমতাচ্যুত খলীফা আল-আজেদ চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যান। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস।
মহলে আজেদের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। ডাক্তার সুলতান আইউবীর নিকট সংবাদ পাঠান। এক কালের দোর্দন্ড প্রতাপশালী খলীফা আজেদ মারা গেছেন। কিন্তু আশ্চর্য, তার মৃত্যুতে কাঁদছে না কেউ। জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত যে দু মহিলা তার পাশে ছিল, তাদেরকেই শুধু আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে দেখা গেল।
কয়েকজন কর্মকর্তাসহ মহলে প্রবেশ করলেন সুলতান আইউবী। বহিরাগত লোকজন আর দাসী-চাকরে গম্ গম্ করছে সমগ্র মহল। কারো মুখে শোকের ছায়া দেখতে পেলেন না সুলতান। সলেহে পড়ে যান তিনি। একজন সাবেক খলীফার মৃত্যু সংবাদে এলাম; কিন্তু অবস্থা দেখে তো এ মহলে কেউ মারা গেছে বলে মনে হচ্ছে না! তাহলে বিষয়টা কী?
রক্ষী বাহিনীর কমান্ডারকে সুলতান আদেশ দিলেন, মহলের প্রতিটি কক্ষে ঘুরে দেখ, তল্লাশী চালাও। নারী-পুরুষ-যুবতী যাকে যেখানে পাও, বের করে বারান্দায় বসিয়ে রাখ। কাউকে মহলের বাইরে যেতে দেবে না। যত প্রয়োজন-ই দেখাক, কাউকে আস্তাবল থেকে ঘোড় নিতে দেবে না। সুলতান সমগ্র মহল পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার নির্দেশ দেন।
সুলতান মৃত আজেদের কক্ষে প্রবেশ করেন। কিন্তু আশ্চর্য, একটি প্রাণীকেও শিয়রে বসে আজেদের জন্য কাঁদতে দেখলেন না তিনি। গোটা মহল নারী-পুরুষে পরিপূর্ণ। কিন্তু এতটুকু বিষাদের ছাপ নেই কারো মুখে । এক ফোঁটা অশ্রু পর্যন্ত নেই কারো চোখে ।
ডাক্তার সুলতান আইউবীকে ইংগিতে নিভৃতে নিয়ে যান। আজেদের অন্তিম কথাগুলো শোনান। অবশেষে ডাক্তার অভিমত ব্যক্ত করেন, এই বিদায়ের মুহূর্তে একবার এসে আপনার তাকে দেখে যাওয়া উচিত ছিল। সুলতান বললেন, উচিত ছিল অস্বীকার করি না। তবে আসিনি দুটি কারণে। প্রথমতঃ লোকটাকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তার এই ডেকে পাঠানোকে আমি ষড়যন্ত্র হতে পারে বলে সন্দেহ করেছিলাম। দ্বিতীয়তঃ ঈমান-বিক্রেতা বলে তার প্রতি আমার প্রচণ্ড ঘৃণা ছিল। একজন বিশ্বাসঘাতক ঘৃণ্য ব্যক্তিকে দেখতে আসায় আমার মন চাচ্ছিল না।
ডাক্তারের মুখে আল-আজেদের শেষ কথাগুলো শুনে অনুশোচনায় ফেটে পড়েন আইউবী। অস্থির-চিত্তে বললেন, হায়! না এসে তাহলে ভুল-ই করলাম! আসলে বোধ হয় তার মুখ থেকে আরো অনেক গোপন তথ্য বের করতে পারতাম। তাকে কোন গোপন কথা বুকে চেপে কবরে যেতে দিতাম না! …
