এ সময়ে দূত ফিরে এসে কক্ষে প্রবেশ করে এবং বলে, আমীরে মেসের আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন।
আহ! হতভাগা, বদনসীব সালাহুদ্দীন! আমার এই মুমূর্ষু অবস্থায় একটিবার আসলে কি হত তোমার! কুঁকিয়ে কুঁকিয়ে অব্যক্ত কণ্ঠে বললেন বৃদ্ধ।
সালাহুদ্দীন আইউবীর না আসার ব্যাথায় বৃদ্ধের কষ্ট আরো বেড়ে যায়। অতি ক্ষীণ কণ্ঠে থেমে থেমে বললেন, আমার সেবার জন্য এক সময়ে একপায়ে খাড়া থাকত যেসব দাসী-বাদী, হাত তালির শব্দ পাওয়া মাত্র ছুটে আসত যারা, তারাই এখন আমার মিনতিভরা ডাকেও আসে না, তা মিসরের আমীর সালাহুদ্দীন আইউবী আসবে কেন? এ আমার পাপের শাস্তি। এ শাস্তি আমাকে ভোগ করতেই হবে। আমার রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়রাও কেটে পড়েছে। তাদের কেউ এখন আর আসে না। তবে আসবে। আসবে আমার জানাযায় । তারপর মহলে ঢুকে হাতে ধরে যার যা ইচ্ছে নিয়ে যাবে। সকলের দৃষ্টি এখন আমার মৃত্যু আর আমার সম্পদের উপর!
রোগযন্ত্রণা বেড়ে যায় আজেদের। দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত কোঁকাতে থাকেন তিনি। শুশ্রূষাকারী মহিলাদ্বয় ব্যথিত-হৃদয়ে শুনছে তার জীবনের অন্তিম কথাগুলো। সান্ত্বনা দেয়ার অষা তাদের নেই । চেহারায় তাদের কেমন যেন এক ভীতির ছাপ। যেন তারা আল্লাহর সেই গজবের ভয়ে ভীত, যা রাজাকে পথের ভিখারী আর ধনীকে ফকীরে পরিণত করে।
হঠাৎ–কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পায় তারা। চমকে উঠে দরজার দিকে তাকায় । দেখে, অনুমতির অপেক্ষায় দরজায় দাঁড়িয়ে সাদা দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক। অনুমতি পেয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন লোকটি। আজেদের শিরায় হাত রেখে সালাম করে বলেন, আমি মিসরের গভর্নর সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রাইভেট ডাক্তার। আপনার চিকিৎসার জন্য তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন।
সালাহুদ্দীন আইউবীর এতটুকু মানবতাবোধও কি নেই যে, এসে আমাকে এক নজর দেখে যেত! ডেকে পাঠাবার পরও তো একটু আসল না। বৃদ্ধ বললেন।
সে ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। পাঠিয়েছেন তিনি আমাকে আপনার চিকিৎসার জন্য। তবে আমি এতটুকু বলতে পারি যে, তার ও আপনার মধ্যে যে অঘটন ঘটে গেছে, তারপর তিনি এখানে আসবেন না। দুজনের মধ্যে রীতিমত যুদ্ধ হল, জীবন হারাল হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু আপনার রোগমুক্তির চিন্তা তাঁর আছে। অন্যথায় আপনার চিকিৎসা করার আদেশ তিনি আমাকে দিতেন না। এ অবস্থায় বেদনাদায়ক কোন কথা আপনি মনে আনবেন না। নতুবা চিকিৎসা করা সম্ভব হবে না। ডাক্তার বললেন।
চিকিৎসা আমার হয়ে গেছে। মনোযোগ সহকারে তুমি আমার একটি পয়গাম শুনে নাও। সালাহুদ্দীন আইউবীকে হুবহু শব্দে শব্দে পয়গামটি পৌঁছিয়ে দিও। আমার শিরা থেকে হাত সরিয়ে নাও। ইহজগতের সব হেকমত-বিজ্ঞান আর তোমার ঔষধ-পথ্যাদি থেকে আমি এখন সম্পূর্ণ নিরাশ।
শোন ডাক্তার! সালাহুদ্দীন আইউবীকে বলবে, আমি তার শক্ত ছিলাম না আমি শুক্রর ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্য আমার না আইউবীর, তা জানিনা, নিজের পাপের কথা স্বীকার করছি আমি এমন এক সময়ে, যখন এ জগতে আমি ক্ষণিকের মেহমান মাত্র। সালাহুদ্দীনকে বলবে, আমার হৃদয়ে সবসময়ই তার প্রতি ভালবাসা ছিল এবং তার ভালবাসা হৃদয়ে বহন করেই আমি দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমার অপরাধ, আমি সোনা-রূপা, হিরা-মাণিক্য আর ক্ষমতার মোহ হৃদয়ে স্থান দিয়েছিলাম, যা ইসলামের মর্যাদার উপর বিজয়ী হয়ে গিয়েছিল।
আজ আমার মন থেকে সব নেশা দূর হয়ে গেছে। যারা সারাক্ষণ আমার পায়ে পড়ে থাকত, আমার দুর্দিনে সকলেই তারা কেটে পড়েছে। যে দাসীরা আমার আঙ্গুলের ইশারায় নাচ-গাইত, তারা আমার মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে আছে। আমার দরবারে নগ্নদেহে নাচত যেসব রূপসী মেয়ে, আমি এখন তাদের ঘৃণার পাত্র।
শোন ডাক্তার! মানুষের সবচে বড় ভুল হল, মানুষ মানুষের দাসত্বে লিপ্ত হয়ে আল্লাহর কথা ভুলে যায়। একদিন যে তার আল্লাহর নিকট উপস্থিত হতে হবে, যেখানে কোন মানুষ মানুষের পাপের বোঝা বহন করবে না–মানুষ সে কথা বেমালুম ভুলেই যায়। বদমাশরা আমাকে খোদার আসনে বসিয়েছিল। কিন্তু এখন যখন প্রকৃত খোদার ডাক এসে গেল, তখন সৰ হাকীকত আমার সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
জীবনের এই অন্তিম মুহূর্তে আজ আমি মুক্তির পথ খুঁজছি। শক্রর প্রতারণার শিকার হয়ে যত পাপ আর যত অন্যায় করেছি, অবলীলায় সব স্বীকার করে দয়াময় আল্লাহর নিকট তাওবা করে এবং সালাহুদ্দীনকে এমন কিছু বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে আমি মরতে চাই, যা বোধ হয় তার জানা নেই।
তুমি সালাহুদ্দীনকে বলবে, আমার মোহাফেজ বাহিনীর সালার রজব জীবিত আছে এবং সুদানের কোথাও আত্মগোপন করে আছে। যাওয়ার সময় সে আমাকে বলে গিয়েছিল, ফাতেমী খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সে সুদানী এবং আস্থাশীল মিসরীদের নিয়ে বাহিনী গঠন করবে এবং খৃষ্টানদের থেকে সামরিক ও আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করবে।
সালাহুদ্দীনকে তুমি আরো বলবে, সে যেন নিজের রক্ষীদের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখে। তাকে একাকী চলাফেরা করতে নিষেধ করবে। রাতে যেন অধিক সতর্ক থাকে। ফেদায়ীদের নিয়ে রজব তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আইউবীকে তুমি আরো বলবে, তোমার জন্য মিসর এক আগ্নেয়গীরি। যাদেরকে তুমি আপন বলে মনে করছ, তাদের অনেকেই তোমার শত্রু। যারা তোমার সুরে সুর মিলিয়ে বিস্তৃত ইসলামী সাম্রাজ্যের শ্লোগান দিচ্ছে, তাদের মধ্যে খৃষ্টানদের পোয্য বিষধর সাপও আছে।
