জাতির বিবেক বলে খ্যাত কবিরা পর্যন্ত যখন শত্রুর বেতনভোগী, তখন জাতির জন্য অপমান ও লাঞ্ছনা অবধারিত। ক্ষুণ্ণ কণ্ঠে বললেন সুলতান আইউবী।
কক্ষে প্রবেশ করে দারোয়ান। বলে, ক্ষমতাচ্যুত খলীফা আল-আজেদের দূত সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চাইছেন।
সুলতানের কপালে ভাজ পড়ে যায়। ক্ষণকাল কি যেন চিন্তা করে বললেন, খেলাফত ছাড়া বুড়া আর আমার কাছে কি-ই চাইবে। দারোয়ানকে বললেন, ওকে আসতে বল।
আজেদের দূত কক্ষে প্রবেশ করে। বলে, খলীফা আপনাকে সালাম বলেছেন।
তিনি তো এখন আর খলীফা নন। দু মাস হয়ে গেল, আমি তাকে বরখাস্ত করেছি। এখন আপন প্রাসাদে তিনি আমার বন্দী। সুলতান বললেন।
অপরাধ মার্জনা করবেন সুলতান! দীর্ঘদিনের অভ্যাস কিনা, তাই মুখ ফসকে বেরিয়ে এসেছে। সালামান্তে আল-আজেদ বলেছেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ, বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। কিন্তু আপনার সাক্ষাৎ তার একান্ত প্রয়োজন। আমীরে মুহতারাম দয়া করে একটু আসলে ভীষণ উপকার হবে। দূত বলল ।
খানিকটা ঝাঁঝ মেশানো কণ্ঠে সুলতান বললেন, এখনো তাহলে তিনি নিজেকে খলীফা-ই মনে করছেন। সে জন্যে-ই বুঝি আমাকে এই ডেকে পাঠানো, না!
না, আমীরে মেসের অবস্থা তার ভাল নয়। মহলের ডাক্তার আশংকা ব্যক্ত করেছেন। তিনি পুরনো এক রোগে ভুগছেন। চিন্তা ও রাগের সময় এ রোগ তার বেড়ে যায়। এখন তিনি রীতিমত শয্যাশায়ী।
একটু থেমে দূত আরো বলে, আপনাকে তিনি একা যেতে বলেছেন; কি যেন গোপন কথা আছে, যা আপনি ছাড়া আর কাউকে বলা যাবে না।
তুমি যাও, আমার সালাম জানিয়ে বলবে, সালাহুদ্দীন আইউবীর সব গোপন কথা-ই জানা আছে। তাকে বল গিয়ে গোপন কথা আল্লাহকে বলুক। আল্লাহ তার অপরাধ ক্ষমা করুন। বললেন সালাহুদ্দীন আইউবী।
নিরাশ মনে ফিরে যায় দূত।
সুলতান আইউবী দারোয়ানকে বললেন, ডাক্তারকে ডেকে আন। আলী বিন সুফিয়ান ও বাহাউদ্দীন শাদ্দাদের প্রতি তাকিয়ে সুলতান বললেন, আচ্ছা, লোকটি আমাকে একা যেতে বলল! কোন ষড়যন্ত্র আছে বোধ হয়। মহলে ডেকে নিয়ে আমাকে সে খুন করাতে চাইছে, এ আশংকা কি আমার অমূলক? আমার হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এখন কৌশলে তার প্রতিশোধ নেয়ার সাধ জাগা বিচিত্র কি?
আপনি যাননি ভালো-ই করেছেন। বললেন বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ। আলী বিন সুফিয়ানও সমর্থন করলেন।
ডাক্তার আসলে সুলতান বললেন, আপনি আজেদের নিকট যান। লোকটি দীর্ঘদিন যাবত গুরুতর অসুস্থ বলে শুনেছি। মনে হচ্ছে, তার ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়েছে। আপনি গিয়ে তাকে দেখুন, চিকিৎসা করুন। তবে হতে পারে প্রাপ্ত সংবাদ মিথ্যে; তিনি অসুস্থ নন। তা-ই যদি হয়, আমাকে জানাবেন।
খলীফা থাকা অবস্থায় আল-আজেদ যে মহলটিকে খেলাফতের মসনদ হিসেবে ব্যবহার করতেন, ক্ষমতাচ্যুতির পর তাকে সে ভবনে-ই বাস করতে দেয়া হয়। মহলটিকে তিনি অপূর্ব এক বিলাস-ভবন বানিয়ে রেখেছিলেন। দেশ-বিদেশের সুন্দরী নারীদের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল তার হেরেম। দাসীদের ভীড় লেগে থাকত সব সময়। হাজার হাজার মোহাফেজ বাহিনী প্রস্তুত থাকত সর্বক্ষণ। সেনা কমান্ডারগণ দরবারে আসলে বসবারও অনুমতি ছিল না থাকতে হত হাতজোড় দাঁড়িয়ে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিপ্লব পাল্টে দেয় এ মহলের রূপ। আজেদ এখন : খলীফা নন। একজন সাধারণ নাগরিকের মত এ মহলে জীবন যাপন করছেন তিনি। মহলের বিলাসোপকরণগুলো যেমন ছিল তেমন-ই পড়ে আছে সেখানে। সেনা কমান্ডার আর মোহাফেজ বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয় এখান থেকে। তবে একটি সেনাদল চোখে পড়ছে এখনো। এরা খলীফা আল-আজেদের মোহাফেজ নয়–বন্দী আজেদের প্রহরী। খেলাফতের এই মসনদটি ছিল ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র, তাই এখন পাহারা বসিয়ে রাখা হয়েছে এখানে। আজেদ এখন নিজ মহলে আইউবীর বন্দী। বৃদ্ধ হৃদরোগের রোগী। ক্ষমতা হারাবার শোক, বার্ধক্য, মদ-মাদকতায় এখন তিনি শয্যাগত।
অল্প কদিনেই মরণাপন্ন হয়ে পড়ে লোকটি। দুজন বিগত-যৌবনা মহিলা আর এক খাদেম সেবা-শুশ্রূষা করছে তার।
মহলের ডাক্তার বৃদ্ধকে ঔষধ খাইয়ে যান। ইত্যবসরে কক্ষে প্রবেশ করে দুই যুবতী। এক সময় তারা আল-আজেদের হেরেমের শোভা ছিল। একজন বৃদ্ধের হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে তার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে অবস্থা জানতে চায়। অপরজন বৃদ্ধের মুখমন্ডলে দু হাতের পরশ দিয়ে তার সুস্থতার জন্য দুআ দেয়। মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে দুই যুবতী। একজন বলে, আপনি আরাম করুন। আমরা আপনার বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটাতে চাই না। অপরজন বলল, আমরা সারাক্ষণ পাশের কক্ষে-ই থাকি। প্রয়োজন হলে ডেকে পাঠাবেন। যুবতীয় কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
আরো একরাশ বেদনা চেপে ধরে বৃদ্ধকে। আহ! বলে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পার্শ্বে দন্ডায়মান পৌঢ়া মহিলাদ্বয়কে ইঙ্গিতে কাছে ডেকে এনে ক্ষীণ কণ্ঠে ভাঙ্গা স্বরে বলেন, মেয়ে দুটো কেন এসেছে জান? ওরা দেখতে এসেছে আমি কবে মরব। ওরা শকুন। ওদের শ্যেণদৃষ্টি আমার সম্পদের উপর। অপেক্ষা শুধু আমার মৃত্যুর। তোমরা ছাড়া এখন আমার আপন আর কে আছে? কেউ নেই, একজনও নেই। ফাতেমী খেলাফতের শ্লোগান দিয়ে যারা আমাকে উস্কে দিয়েছিল, তারা এখন কোথায়?
মৃতকল্প আজেদ নিজের বুকে হাত রেখে পার্শ্ব পরিবর্তন করেন। বড় কষ্ট হচ্ছে তার।
