তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ, তোমরা এই মসনদ আমার থেকে নিয়ে নাও। আমাকে শুধু তোমরা এই প্রতিশ্রুতি দাও যে, আমার পথে তোমরা কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। আর কিছু চাই না আমি। যে লক্ষ্য নিয়ে আমি ঘর থেকে বের হয়েছি, আমায় সে উদ্দেশ্য পূরণ করতে দাও। হাজারো জীবন কোরবান করে এবং আরব মুজাহিদদের রক্তে নীল নদের পানির স্লং পরিবর্তন করে নুরুদ্দীন জঙ্গী মিসর ও সিরিয়াকে একীভূত করেছেন। এই ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যকে আরো সম্প্রসারিত করতে হবে। সুদানকে মিসরের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ফিলিস্তীনকে মুক্ত করতে হবে ক্রুসেডারদের হাত থেকে। ইউরোপের ঠিক মধ্যাঞ্চলের কোথাও নিয়ে কোণঠাসা করে রাখতে হবে খৃষ্টানদের। এসব বিজয় আমাকে অর্জন করতে হবে আমার শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নয় আল্লাহর রাজ্যে তাঁর-ই শাসন প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু মিসর যে পাঁকে জড়িয়ে রেখেছে আমায়। আমাকে তোমরা মিসরের এমন একটি ভূখন্ড দেখাও, যা ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ ও গাদ্দারী থেকে মুক্ত! আপুতকণ্ঠে বললেন সালাহুদ্দীন আইউবী।
এইসব ষড়যন্ত্রের মূলে রয়েছে খৃষ্টানরা। কত জঘন্যভাবে ওরা ওদের মেয়েদেরকে বেহায়াপনার প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। ভাবলে আমার মাথা হেঁট হয়ে আসে। ওরা ওদের চুম্বকাৰ্যক রূপ আর চাটুবাক্য দিয়ে ঘায়েল করছে আমাদের শাসকদের। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
ভাষার আঘাত তরবারীর আঘাতের চেয়েও মারাত্মক আলী। আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচর খৃষ্টান মেয়েরা তোমার দুর্বলতা বুঝে এমন ধারায়, এমন ক্ষেত্রে, এমন যথোপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করবে যে, মোমের মত গলে গিয়ে তুমি তোমার তরবারী কোষবদ্ধ করে দুশমনের পায়ে অর্পণ করবে। খৃষ্টানদের অস্ত্র হল দুটি। ভাষা আর পশুবৃত্তি। মানবীয় চরিত্র ধ্বংস করে আমাদের মধ্যে এই পশুবৃত্তি ঢুকিয়ে দেয়ার জন্য ওরা সুন্দরী যুবতী মেয়েদের ব্যবহার করছে। এই অস্ত্র ব্যবহার করে-ই ওরা আমাদের মুসলিম আমীর-শাসকদের হৃদয় থেকে ইসলামী চেতনাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বললেন সালাহুদ্দীন আইউবী।
শুধু আমীর-শাসক-ই নন সুলতান! মিসরের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই অশ্লীলতার বিষবাষ্প মহামারীর ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ অভিযানে খৃষ্টানরা সফল। অর্থশালী মুসলিম পরিবারগুলোতেও এই বেহায়াপনার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
এটি-ই সর্বাপেক্ষা বড় আশংকা। খৃষ্টানদের সকল সৈন্য যদি আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবু আমি তাদের মোকাবেলা করতে পারব; করেছিও। কিন্তু তাদের এই চারিত্রিক আগ্রাসনকে প্রতিহত করতে পারব কিনা আমার ভয় হয়। মুসলিম মিল্লাতের ভবিষ্যতপানে দৃষ্টিপাত করলে আমি শিউরে উঠি। তখন আমার কাছে মনে হয়, যদি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এ ধারা রোধ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে মুসলমান হবে নামমাত্র মুসলমান। তাদের মধ্যে ইসলামের নীতি-আদর্শ, সংস্কৃতি-চরিত্র কিছুই থাকবে না। খৃষ্টান সভ্যতা-সংস্কৃতি লালন করে মুসলমানরা গর্ববোধ করবে। প্রকৃত ইসলাম বলতে তাদের মধ্যে কিছুই থাকবে না।
মুসলমানদের দুর্বলতাগুলো আমার জানা আছে। মুসলমান শত্রু চিনে না। তারা শক্রর পাতা আকর্ষণীয় জালে সরলমনে আটকে যায়।
পাশাপাশি খৃষ্টানদের দুর্বলতাগুলোও আমার অজানা নয়। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তা সন্দেহাতীত সত্য। কিন্তু ভিতরে তাদের মনের মিল নেই। ফরাসী-জার্মানী একে অপরের দুশমন। বৃটিশ-ইতালীয়রা একে অপরের অপছন্দ। মুসলমান তাদের সকলের শত্রু বলেই কেবল এই ইস্যুতে তারা একতাবদ্ধ হয়েছে। অন্যথায় তাদের পারস্পরিক বিরোধ শত্রুতার অপেক্ষা কোন অংশে কম নয়। তাদের ফিলিপ অগাস্টাস একজন কু-জাত ব্যক্তি। অন্যরাও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা মুসলিম শাসকদেরকে নারীর রূপ ও হিরা-মাণিক্যের চমক দেখিয়ে অন্ধ বানিয়ে রেখেছে। মুসলিম শাসকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাড়া দিলে ওরা পালাবার পথ পাবে না।
ফাতেমী খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে আমি শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি করেছি। মসনদ পুনর্দখলের জন্য ফাতেমীরা সুদানী ও খৃষ্টানদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছে। আমার জন্য এ এক নতুন সমস্যা। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
ফাতেমীদের কবিকে কাল মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
সালাহুদ্দীন আইউবী বললেন, আম্মারাতুল ইয়ামানীর কবিতা শুনে এক সময় আমিও আপুত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু খৃষ্টানরা তার সেই ভাষা আর গীতিকে বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত করিয়ে ইসলামী চেতনাকে ভষ্ম করে দেয়ার চেষ্টা করেছে।
আম্মারাতুল ইয়ামানী ছিল তকালের একজন নামকরা কবি। সে যুগে এবং তার আগেও সাধারণ মানুষ কবিদের প্রবল ভক্তি ও শ্রদ্ধা করত। অগ্নিঝরা কবিতার মাধ্যমে তারা সৈন্যদেরকে উজ্জীবিত করে তুলত। শত্রুর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলত জনতাকে। আম্মারাতুল ইয়ামানীও সে–মানের একজন কবি। এক সময় সে কবিতার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে জিহাদী চেতনা জাগিয়ে তুলত।
কিন্তু পরবর্তীতে হতভাগাকে লোভে পেয়ে বসেছে। ফাতেমী খেলাফতের পৃষ্ঠপোষকতায় সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে বিষ উদগীরণ করতে শুরু করে কবি আম্মারা। _ সন্দেহবশতঃ আকস্মিকভাবে একদিন হানা দেওয়া হয় তার গৃহে। অনুসন্ধান করে এমন কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় যে, লোকটি কেবল ফাতেমী খেলাফতের-ই নিমকম্বোর নয়–খৃষ্টানদের বেতন-ভোগী চরও বটে। মিসরীদের হৃদয়ে নপুংসক ফাতেমী খেলাফতের প্রতি সমর্থন এবং সুলতান আইউবীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে পুষত তাকে খৃষ্টানরা।
