সুলতান আইউবীর নির্দেশনা মোতাবেক তারা সামনে এগিয়ে চলে। ধোঁকায় পড়ে যায় সুদানীরা। ঠিক এমন সময়ে আচমকা পাঁচশত অশ্বারোহী টিলার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সুদানী বাহিনীর মধ্যস্থলে হামলা করে বসে। অশ্বারোহীদের এ আকস্মিক তীব্র আক্রমণে প্রলয় সৃষ্টি হয়ে যায় সমগ্র বাহিনীতে। পার্শ্ব থেকে তীরন্দাজ বাহিনী বৃষ্টির মত তীর ছুঁড়তে শুরু করে তাদের প্রতি। এভাবে সুলতান আইউবীর মাত্র তেরশত সৈন্য অন্তত ছয় হাজার শত্রুসেনাকে ক্ষণিকের মধ্যে বিপর্যস্ত করে তোলে। সু-কৌশলে গ্যাড়াকলে আটকিয়ে এমন শোচনীয়ভাবে তাদের পরাজিত করে যে, মিসরের মরুপ্রান্তর তাদের লাশে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। জীবনে রক্ষা পাওয়া সুদানীদের দু চারজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও বেশীর ভাগ-ই বন্দী হয় আইউবী বাহিনীর হাতে।
এ ছিলো সুদানীদের দ্বিতীয় বিদ্রোহ, যাকে তাদের-ই রক্তে ডুবিয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন সুলতান আইউবী।
বন্দীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য সংগ্রহ করেন সুলতান। গ্রেফতারকৃত সুদানী সব কমাণ্ডার এবং বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রে জড়িত সকল কর্মকর্তা ও সিপাহীদের তিনি কারাগারে প্রেরণ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত লোকদের নাম-পরিচয়ও পেয়ে যান সুলতান আইউবী। তিনি তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। রজব এবং তার মতো আরো যেসব সালার এই রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মতৎপরতায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলো, তাদেরকে আজীবনের জন্য জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হলো। এ ষড়যন্ত্র এমন কতিপয় কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেলো, যাদেরকে সুলতান আইউবীর একান্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত মনে করা হতো। এ তথ্য পেয়ে সুলতান আইউবী স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি তাঁর নির্ভরযোগ্য সালার ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেন, এ পরিস্থিতিতে মিসরের প্রতিরক্ষা এবং সালতানাতের অস্তিত্ব সুদৃঢ় করার জন্য এখনই আমাদের সুদান দখল করা একান্ত আবশ্যক।
সুলতান আইউবী খলীফা আল-আজেদের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেন। খেলাফতের মসনদ থেকে খলীফাকে অপসারণ ঘোষণা দেন, এখন থেকে মিসর সরাসরি বাগদাদের খেলাফতের অধীনে পরিচালিত হবে। খেলাফতের একমাত্র মসনদ থাকবে বাগদাদে।
সুলতান আইউবী আটজন রক্ষীর সঙ্গে উম্মে আরারাকে নুরুদ্দীন জঙ্গীর নিকট পাঠিয়ে দেন।
১.৬ ফিলিস্তীনের মেয়ে
ফিলিস্তীনের মেয়ে
গম্ভীর মুখে কক্ষে পায়চারী করছেন সুলতান আইউবী। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন–
দেশের সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে পারে এবং হয়েও যাচ্ছে। বিচ্ছিন্নতার পথ অবলম্বন করছে শুধু জাতির কর্ণধারগণ। আমীর-উজীর-শাসক নামের বড় বড় জাতীয় নেতাদের তুমি দেখে থাকবে আলী! মিসরবাসীদের মুখে তো আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। জাতির সংগে বিশ্বাসঘাতকতা করছে বড়। আমার সঙ্গে এই বড়দের শত্রুতা ব্যক্তিগত নয়। আমি তাদের স্বপ্লের মসনদ দখল করে আছি, এটাই তাদের অন্তর্জালার কারণ।
আলী বিন সুফিয়ান ও বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ বসে নিবিষ্টচিত্তে শুনছেন সুলতানের বেদনাভরা কথাগুলো।
সময়টি ছিল ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের এক অপরাহ্ন বেলা। জুন-জুলাইয়ে বিদ্রোহ দমন করে সুলতান আইউবী সঙ্গে সঙ্গে আল-আজেদকে খেলাফতের মসনদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তার আগে তিনি সুদানীদের বিদ্রোহকে কৌশলে দমন করে সেনাবাহিনী থেকে সুদানী বাহিনীকে বিলুপ্ত করেছিলেন। কিন্তু তিনি কোন বিদ্রোহী নেতা, কমান্ডার কিংবা সৈনিককে সাজা দেননি; কৌশলে কার্যসিদ্ধি করেছিলেন।
তারপর যখন তারা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, তখন সুলতান আইউবী এই উদ্ধত মস্তকগুলোকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য রণাঙ্গনে সুদানীদের লাশের স্তূপ তৈরি করেন। পদ-পদবীর তোয়াক্কা না করে তিনি গ্রেফতারকৃতদের কঠোর শাস্তি দেন। অধিকাংশকে জল্লাদের হাতে তুলে দেন আর অবশিষ্টদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন কিংবা দেশান্তর করে সুদান পাঠিয়ে দেন।
দু মাস হয়ে গেল, আমি রাজ্যের কোন খোঁজ নিতে পারছি না! এক একজন অপরাধী ধরে আনা হচ্ছে আর বিচার করে আমি তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে চলছি। দুঃখে আমার কলজেটা ছিঁড়ে যাচ্ছে আলী! মনে হচ্ছে, আমি গণহত্যা করছি। আমার হাতে যারা জীবন দিচ্ছে, তাদের অধিকাংশই যে মুসলমান! বুক ফেটে কান্না আসতে চায় আমার। আক্ষেপের সাথে কললেন সুলতান আইউবী।
মুখ মুখলেন বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ। বললেন—
সম্মানিত আমীর! একজন কাফির এবং একজন মুসলমান একই অপরাধে লিপ্ত হলে শাস্তি মুসলমানের-ই বেশী পাওয়া উচিত। কাফিরের না আছে বুদ্ধি-বিবেক, না আছে ধর্ম-চরিত্র। কিন্তু আল্লাহর দ্বীনের আলো পাওয়ার পরও একজন মুসলমান কাফিরের মত অপরাধ করা গুরুতর নয় কি? মুসলমানদের শাস্তি দিচ্ছেন বলে আপনি মর্মাহত হবেন না মহামান্য সুলতান! ওরা বিশ্বাসঘাতক, মুসলিম নামের কলংক। ইসলামী সাম্রাজ্যের বিষফোঁড় ওরা। ইসলামের নাম-চিহ্ন ধূলোয় মিশিয়ে দেয়ার জন্য যারা কাফিরদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে, এ জগতে মৃত্যুদন্ড-ই তাদের উপযুক্ত শাস্তি। পরকালে তাদের জন্য আছে জাহান্নাম।
শাদ্দাদ। আমার ব্যথা হল, মিসরে আমি শাসক হয়ে আসিনি। দেশ শাসন করার নেশা যদি আমার থাকত, তাহলে মিসরের বর্তমান পরিস্থিতি আমার সম্পূর্ণ অনুকূল। কিন্তু আমি জানি, ক্ষমতার লোেভ মানুষকে অন্ধ করে তোলে। মসনদপ্রিয় মানুষ চাটুকার-চালবাজদের পসন্দ করে বেশী। কিছু-ই না দিয়ে মিথ্যা প্রলোভন আর মনভোলানো রঙ্গিন ফানুস দেখিয়ে-ই তারা মাতিয়ে রাখে জাতিকে। শয়তানী চরিত্রের মানুষকে তারা আমলা নিয়োগ করে। তারা অধীনদের রাজপুত্রের মর্যাদা দিয়ে রাখে। নিজে হয় শাহেনশাহ। ক্ষমতার মসনদ রক্ষা করা ব্যতীত তারা আর কিছুই বুঝে না।
