সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানকে বললেন, যে একশত সৈন্যকে সুদানী বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে পাঠাবে, তাদের বলে দেবে যেন তারা ছাউনিতে গুজব ছড়ায়, ছয়-সাত দিনের মধ্যে সালাহুদ্দীন আইউবী ফিলিস্তীন আক্রমণ করতে যাচ্ছেন। কাজেই আমাদের কটা দিন অপেক্ষা করে তার অনুপস্থিতির সময়টাতে কায়রো আক্রমণ করতে হবে।
এমনি বেশ কিছু আদেশ-নির্দেশনা দিয়ে সুলতান আইউবী বললেন, আজ আমি কায়রো থাকবো না। কায়রো থেকে বেশ দূরের একটি জায়গার নাম বললেন তিনি। সেখানে তিনি দুশমনের কাছাকাছি তার হেডকোয়ার্টার রাখতে চান; যাতে সরাসরি নিজে যুদ্ধের তত্ত্বাবধান করতে পারেন।
বৈঠকখানায়-ই ফজর নামায আদায় করেন সকলে। সুলতান আইউবীর পরিকল্পনা মোতাবেক কর্মতৎপরতা শুরু হয়ে যায়। প্রস্তুতির জন্য সুলতান নিজ কক্ষে চলে যান।
সুদানীদের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে চলেছে। ইতিপূর্বে তাদের একটি বিদ্রোহ শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছিলো দু বছর হলো। আবার বিদ্রোহ করার জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলো তখন থেকেই। সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিলো খৃষ্টানরা। বিপুলসংখ্যক গুপ্তচর ছড়িয়ে দিয়েছিলো তারা মিসরে। একদিন যে সুদানীরা কায়রো আক্রমণ করবে, তা ছিলো সুনিশ্চিত। কিন্তু তা এতো তাড়াতাড়ি, এমন আচম্বিত হয়ে যাবে, তা ভাবেননি সুলতান আইউবী। হাবশী গোত্রের উপর সুলতান আইউবীর সামরিক অভিযানে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলো সুদানীরা। তার-ই প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে তার এই আকস্মিক সেনা অভিযান। হাবশীদের উপর আইউবীর সামরিক অভিযানের পর পাঁচ-সাত দিনের মধ্যেই তারা সেনা সমাবেশ ঘটায় এবং কায়রো আক্রমণের জন্য রওনা হয়।
দু উষ্ট্রারোহীর সঙ্গে একশত সশস্ত্র মুসলিম সেনা যখন সুদানী বাহিনীতে যোগ দেয়, সুদানীরা তখন মিসর সীমান্ত থেকে বেশ ভিতরে পৌঁছে গিয়ে ছাউনী ফেলেছে। সুলতান আইউবী রাতে শহর ত্যাগ করে এমন স্থানে চলে যান, যেখান থেকে সুদানীদের গতিবিধির খবর নেয়া ছিলো নিতান্ত সহজ। সুদানী বাহিনীতে অনুপ্রবেশকারী আইউবীর সেনারা কর্মকর্তাদের জানায়, সুলতান আইউবী কয়েকদিনের মধ্যে ফিলিস্তীন আক্রমণ করতে যাচ্ছেন। এ সংবাদ শুনে সুদানী সেনা কর্মকর্তারা উফুল্ল হয়ে ওঠে। আইউবীর অনুপস্থিতির সময়টিতে-ই তারা কায়রো অভিযান পরিচালিত করবে বলে স্থির করে। ফলে এ ছাউনী আরো দু দিন বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। পরদিন রাত থেকে সুলতান আইউবীর নিকট তাদের খবরা-খবর আসতে শুরু করে।
তারও পরের রাতে সুলতান আইউবী পাঁচটি মিজানিক, বেশ কিছু অগ্নিগোলা ও অগ্নিতীর দিয়ে পঞ্চাশজন অশ্বারোহী প্রেরণ করেন।
মধ্য রাত। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সুদানী বাহিনী। এমন সময়ে তাদের রসদ-ডিপোতে অগ্নিগোলা নিক্ষিপ্ত হতে শুরু করে। পরক্ষণেই ছুটে আসতে শুরু করে অগ্নিতীর। ভয়ঙ্কর অগ্নিশিখায় আলোকিত হয়ে ওঠে মধ্য রাতের নিঝুম শূন্য আকাশ। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সুদানী বাহিনীতে। সঙ্গে সঙ্গে মিনজানিকগুলোকে সেখান থেকে পিছনে সরিয়ে নিয়ে যায় আইউবীর সেনারা। পঞ্চাশজন অশ্বারোহী তিন-চারটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে দ্রুত ঘোড়া ছুটায় এবং সুদানী বাহিনীর ডান ও বাম পার্শ্বের সৈন্যদের পায়ে পিষে এবং বর্শা দ্বারা দমাদম আঘাত হেনে চোখের পলকে উধাও হয়ে যায়। খাদ্য-সম্ভারে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে আর আতঙ্কিত উট-ঘোড়াগুলো দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করছে। সুলতান আইউবীর সৈন্যরা এ ছাউনীতে আরো একবার হামলা চালায় এবং বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করে হাওয়া হয়ে যায়।
পরদিন সংবাদ পাওয়া গেলো, আগুনে পুড়ে, ঘোড়া ও উটের পদতলে পিষ্ট হয়ে ও সুলতান আইউবীর কমাণ্ডা বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে অন্তত চারশত সুদানী সৈন্য নিহত হয়েছে। সমুদয় খাদ্যসম্ভার ও তীরের ডিপো পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে।
অবশেষে সুদানী সৈন্যরা ছাউনী তুলে সেখান থেকে চলে যায় এবং রাতে এমন এক স্থানে শিবির স্থাপন করে, যার আশে-পাশে উঁচু উঁচু মাটির টিলা । কমাণ্ডো হামলার আশঙ্কা নেই এখানে। এবার টহল বাহিনী ছাউনীর চারপাশে অনেক দূর পর্যন্ত পাহারা দিতে শুরু করে। কিন্তু তারপরও আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেলো না। তারা ঠিক আগের রাতের মত আক্রমণের শিকার হয়। দুজন প্রহরীকে কাবু করে খুন করে ফেলে সুলতান আইউবীর কমাণ্ডোরা। টিলার উপর থেকে অগ্নিতীর ছুঁড়তে শুরু করে তীরন্দাজ বাহিনী। ভোরের আলো ফোঁটার পূর্ব পর্যন্ত এ হামলা চালিয়ে তারা উধাও হয়ে যায়। আক্রমণকারীরা কোত্থেকে এলো, কোথায়-ই বা গেলো কিছুই বুঝতে পারলো না সুদানী বাহিনী। এ হামলায় তারা গত রাত অপেক্ষা বেশী ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়।
সন্ধ্যার পর আলী বিন সুফিয়ান সুলতান আইউবীকে গুপ্তচর মারফত প্রাপ্ত রিপোর্ট সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি জানান, সুদানী বাহিনী আমাদের কমান্ডো বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে অবগত হয়ে এ্যাকশন নেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ পরিকল্পনা মোতাবেক তারা আগামী কাল-ই অভিযান পরিচালনা করবে। সুলতান আইউবী একটি রিজার্ভ ফোর্স আটকে রেখেছিলেন নিজের কাছে। গত দু রাতের অভিযানে অংশ নেয়নি তারা। তিনি জানতেন, দু একটি অপারেশনের পর দুশমন সতর্ক হয়ে যাবে। পর দিন তিনি সুদানী বাহিনীর ডানে ও বাঁয়ে চারশত করে পদাতিক বাহিনী প্রেরণ করেন। তাদেরকে বলে দেন, যেন তারা সুদানী বাহিনী থেকে আধা মাইল দূর দিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে। সুদানীরা যখন দেখলো, শত্রু বাহিনীর দুটি দল রণসাজে তাদের পার্শ্ব দিয়ে এগিয়ে চলছে, তখন তারা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং শত্রুবাহিনী পিছন অথবা পার্শ্ব থেকে আক্রমণ করতে পারে, এ আশঙ্কায় দু পার্শ্বের সৈন্যদেরকে দুদিকে ছড়িয়ে দেয় এবং সুলতান আইউবীর এ দু পদাতিক বাহিনীর মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
