উম্মে আরারাহ সুলতান আইউবীকে জানায়, সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে তার জন্ম হয়েছিলো। কিন্তু পিতা তাকে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর-ই মূলোৎপাটনের প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং ইসলামী সাম্রাজ্যের আমীরগণ শত্রুর সঙ্গে যোগ দিয়ে তাকে আপন সাম্রাজ্যের পতনের কাজেই ব্যবহার করে।
রূপ-যৌবন, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও বাকচাতুর্যে অল্প কদিনে খলীফাকে নিজের মুঠোয় নিয়ে আসে উম্মে আরারা। সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে সে খলীফাকে। রজবকে-ও জড়িত করে নেয় এ ষড়যন্ত্রে। আরো দুজন সামরিক কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে আইউবীর বিরুদ্ধে মাঠে নামে রজব। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীতে মিসরীদের বাদ দিয়ে সুদানীদের টেনে আনতে শুরু করে সে।
উম্মে আরারা খলীফার মহলে এসেছে দু-আড়াই মাস হলো। এই স্বল্প সময়ে-ই সে রাণী হয়ে গেছে মহলের। গোটা কসরে খেলাফত এখন ওঠে-বসে তার-ই ইঙ্গিতে।
উম্মে আরারা সুলতান আইউবীকে আরো জানায়, খলীফা আপনাকে হত্যা করাতে চান। হাশীশীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে হত্যার আয়োজন সম্পন্ন করেছে। রজব।
ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা এবং বিলাস-প্রিয়তায় বিরক্ত হয়ে সুলতান আইউবী খলীফার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে দিয়েছিলেন আগেই। এর মধ্যে কাকতালীয়ভাবে ঘটে গেলো এসব ঘটনা। খলীফা যাদের দ্বারা সুলতান আইউবীকে কোণঠাসা করাতে চেয়েছিলেন, তাদেরই হাতে মহলের রাণী উম্মে, আরারার অপহরণ এবং আইউবীর হাতে তার উদ্ধারের মধ্য দিয়ে দৈবাৎ ফাঁস হয়ে গেলো অনেক তথ্য। অবশেষে সুলতান কর্তৃক আইউবীর হত্যার ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনাও গোপন রইলো না। উম্মে আরারার অপহরণকে কেন্দ্র করেই। ইতিমধ্যে সুলতান আইউবী খলীফার নিরাপত্তা বাহিনী থেকে বদলি করে দিয়েছেন রজবকে। তার স্থলে প্রেরণ করেছেন নিজের বিশ্বস্ত এক নায়েব সালারকে। কিন্তু এসব ঘটনা সুলতান আইউবীর জন্য জন্ম দেয় নতুন এক বিপদ।
উম্মে আরারাকে নিজের আশ্রয়ে রাখলেন সুলতান। অনুতাপের আগুনে পুড়ে মরছে মেয়েটি। অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় সে। ভয়াবহ এক বিপদে ফেলে আল্লাহ তার চোখ খুলে দিয়েছেন। ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেবেন, ঠাণ্ডা মাথায় ভাবছেন সুলতান আইউবী।
ফেরআউনদের শেষ চিহ্ন ধুলোয় মিশিয়ে পরদিন আন-নাসের ও বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ ফিরে আসেন কায়রো।
***
আট দিন পর।
রাতের শেষ প্রহর। ঘুমিয়ে আছেন সুলতান আইউবী। চাকর এসে তাকে জাগিয়ে বলে, আন-নাসের, আলী বিন সুফিয়ান এবং আরো দুজন নায়েব এসেছেন। ধড়মড় করে উঠে বৈঠকখানায় ছুটে যান সুলতান। অভ্যাগতদের একজন এক টহল বাহিনীর কমাণ্ডার।
সুলতান আইউবীকে জানানো হলো, প্রায় ছয় হাজার সুদানী সৈন্য মিসরের সীমান্ত অতিক্রম করে একস্থানে শিবির স্থাপন করেছে। তাদের মধ্যে আছে পদচ্যুত সুদানী বাহিনীর কিছু সদস্য এবং কাফ্রী গোত্রের বেশ কিছু লোক। এই কমাণ্ডার তথ্য জানার জন্য ছদ্মবেশে দুজন উষ্ট্রারোহীকে তাদের ছাউনিতে প্রেরণ করেছিলো। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক কায়রো আক্রমণ করা তাদের উদ্দেশ্য। নিজেদেরকে পর্যটক দাবি করে উষ্ট্রারোহীদ্বয় বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে কথা বলে এবং এই বলে ফিরে আসে যে, এ অভিযানকে সফল করার জন্য প্রয়োজনে তারা সৈন্য দিয়ে তাদের সাহায্য করবে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক তারা এদিক-ওদিক থেকে আরো সৈন্য আগমনের অপেক্ষা করছে এবং আগামী কাল-ই সেখান থেকে কায়রো অভিমুখে রওনা হবে।
সব শুনে সুলতান আইউবী আদেশ করলেন, খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীতে মাত্র পঞ্চাশজন সৈন্য আর একজন কমাণ্ডার রেখে অন্যদের ছাউনিতে ডেকে আনন। খলীফা আপত্তি জানালে বলবে, এ আমার আদেশ।
সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানকে বললেন, আপনার ব্রাঞ্চের সুদানী ভাষায় পারদর্শী এমন একশত লোককে সুদানী বিদ্রোহী বেশে এই কমাণ্ডারের সঙ্গে এক্ষুনি রওনা করিয়ে দিন। কমাণ্ডারের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন, এ একশত লোক ঐ দু উজ্জ্বারোহীর সঙ্গে সুদানী বাহিনীতে গিয়ে যোগ দেবে। উষ্ট্রারোহী সান্ত্রী দুজন বলবে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা তোমাদের সাহায্য নিয়ে এসেছি। তাদেরকে বলে দেবে, যেন তারা বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে আমাদের অবহিত করে এবং রাতে তাদের পশু ও রসদ কোথায় থাকে, তা চিহ্নিত করে রাখে সুলতান আইউবী আন-নাসেরকে বললেন, আপনি অতি দ্রুতগামী অশ্বারোহী, কমাণ্ডা বাহিনী এবং ক্ষুদ্র একটি মিনজানিক প্লাটুন প্রস্তুত করে রাখুন।
আমি ভেবেছিলাম, সরাসরি আক্রমণ চালিয়ে শহর থেকে দূরে থাকতেই ওদের শেষ করে দেবো। বললেন আন-নাসের।
না, মনে রেখো নাসের! দুশমনের সংখ্যা তোমাদের অপেক্ষা কম হলেও মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে চলবে। রাতে কমাণ্ডো বাহিনী ব্যবহার করবে, দুশমনের উপর অতর্কিতে হামলা চালাবে। পার্শ্ব থেকে, পিছন থেকে আঘাত হেনে পালিয়ে যাবে । দুশমনের রসদ নষ্ট করবে, পশু ধ্বংস করবে। তাদের অস্থির করে রাখবে ও শত্রু বাহিনীতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে। তাদের সামনে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দেবে না। ডানে-বাঁয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে বাধ্য করবে। মুখোমুখি সংঘাতে লিপ্ত হতে হলে মনে রাখবে, রণাঙ্গন মরুভূমি। সর্বপ্রথম পানির উৎস দখল করবে। সূর্য এবং বায়ুকে তাদের প্রতিকূলে রাখবে। তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে নিজের যুৎসই জায়গায় নিয়ে যাবে। মনে রাখবে, সুদানীদের কায়রো পর্যন্ত পৌঁছার কিংবা আমাদের সৈন্যদেরকে মুখোমুখি লড়াইয়ে জড়িয়ে ফেলার স্বপ্ন আমি পূরণ হতে দেব না।
