***
সৈন্যরা স্থানটিকে ঘিরে ফেলে। প্রস্তর-নির্মিত বেদীটি ভেঙ্গে চুরমার করে। চবুতরাটিও গুঁড়িয়ে দেয়। পাতাল-কক্ষটি ভরে দেয় ইট-পাথর দিয়ে। বাইরে হাজার হাজার হাবশী বিস্ময়াভিভূত দাঁড়িয়ে কাণ্ড দেখছে। ডেকে তাদেরকে ভিতরে নিয়ে দেখান হয়, এখানে কিছু-ই ছিলো না। বলা হয়, ধর্ম-বিশ্বাসের নামে তোমাদের সাথে এতোকাল শুধু প্রতারণা-ই করা হয়েছে। মেয়ে চারটিকে তাদের হাতে তুলে দেয়া হলো। মেয়েদের বাপ-ভাইরাও উপস্থিত ছিলো সেখানে। আপন আপন কন্যা ও বোনকে নিয়ে যায় তারা। তাদেরকে বলা হলো, এখানে একজন অসৎ লোক বাস করতো। ধর্মের নামে নারীর ইজ্জত ও মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা করতো সে। এখন সে কুমীরের পেটে। এই হাজার হাজার হাবশীকে সমবেত করে তাদের উদ্দেশে কমাণ্ডার বক্তৃতা করেন তাদের ভাষায়। তারা সকলে-ই নীরব। তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করা হয়। এবারও তাদের মুখে কোন কথা নেই। কখনো কখনো মনে হচ্ছিলো, রক্ত নেমে এসেছে তাদের চোখে। প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে মরছে যেন তারা। অবশেষে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলা হয় যদি তোমাদের সত্য খোদাকে দেখার ইচ্ছে থাকে, তাহলে এসো দেখিয়ে দিই। আর এখন তোমরা যে স্থানে বসে আছে, যদি তাকে মিথ্যা দেব-দেবীর আবাস মনে করে থাকো, তা-ও বলো; এই পাহাড়গুলোকেও আমরা ধুলোয় মিশিয়ে দিই। তার পরে তোমরা দেখবে কোন্ খোদা সত্য।
জ্ঞান ফিরে এসেছে উম্মে আরারার। মেয়েটি সুলতান আইউবীকে সে নিজের সব ঘটনা খুলে বলে। চৈতন্য ফিরে আসার পর এবার তার সব ঘটনা-ই মনে আসে। সে বলে, পুরোহিত দিন-রাত যখন-তখন তাকে উপভোগ করতো। বারবার একটি ফুল শোকাত তার নাকে। বলি দেয়ার কথাও পুরোহিত বলে রেখেছিলো তাকে। কমাণ্ডা বাহিনী যথাসময়ে গিয়ে না পৌঁছুলে এখন তার মস্তক থাকতো গর্তে আর দেহ থাকতো কুমীরের পেটে। ভয়ে কাঁপতে লাগলো মেয়েটি। চোখে অশ্রু নেমে আসে তার। সুলতান আইউবীর হাতে চুমো খেয়ে বললো, আল্লাহ আমাকে আমার পাপের শাস্তি দিয়েছেন। আমি জীবনে বহু পাপ করেছি। আপনি আমাকে আশ্রয় দিন। মানসিকভাবে বড় বিধ্বস্ত উম্মে আরারা।
সিরিয়ার এক বিত্তশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে উম্মে আরারা জানায়, আমি তার কন্যা। লোকটি মুসলমান। বিখ্যাত ব্যবসায়ী। সিরিয়ার আমীরদের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
তৎকালে আমীরগণ একটি শহর কিংবা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূখণ্ড শাসন করতো। কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে কাজ করতো তারা। দশম শতাব্দীর পর এই আমীরগণ সম্পূর্ণরূপে বিলাসিতায় ডুবে যায়। বড় বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। তারা তাদের সঙ্গে ব্যবসা করতো এবং সুদও গ্রহণ করতো। সুন্দরী মেয়েদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তাদের হেরেম। তারা নারী আর মদে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।
উম্মে আরারাও এমনি এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর কন্যা। বার-তের বছর বয়সেই সে পিতার সঙ্গে আমীরদের নাচ-গানের আসরে যোগ দিতে আরম্ভ করে। অসাধারণ সুন্দরী বলে-ই বোধ হয় পিতা শৈশব থেকেই তাকে আমীরদের কালচারে অভ্যস্ত করে তুলতে শুরু করেছিলো।
উম্মে আরারাহ জানায় আমার বয়স যখন চৌদ্দ, তখন-ই আমীরগণ আমার প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে ওঠে। দুজন আমীর আমাকে বহুমূল্যবান উপহারও দিয়েছিলেন। আমি নিজেকে পাপের হাতে তুলে দেই। মোল বছর বয়সে পিতার অজান্তে গোপনে রক্ষিতা হয়ে যাই এক আমীরের। কিন্তু বাস করতাম নিজের ঘরে।
বিত্তশালী পিতার কন্যা উম্মে আরারা। ঐশ্বর্যের মাঝে তার জন্ম, লালন-পালন ও যৌবন লাভ। লাজ-লজ্জার সঙ্গে কোন পরিচয় ছিলো না তার। তিন বছরের মাথায় পিতার হাত থেকে বেরিয়ে যায় সে। স্বাধীন চিত্তে আরো দুজন আমীরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নেয়। বাকপটু রূপসী কন্যা হিসেবে উম্মে আরারার নাম এখন সকলের মুখে মুখে।
অবশেষে পিতা তার সঙ্গে সমঝোতা করেন। পিতার সহযোগিতায় তিনজন। আমীর তাকে নতুন এক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। ইসলামী সাম্রাজ্য ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এই তিন আমীর। উম্মে আরারার পিতাও এই ষড়যন্ত্রে জড়িত। খেলাফতের মূলোৎপাটন করার কাজে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে উম্মে আরারাকে। এক সময়ে এক খৃষ্টানও এসে যোগ দেয় এ প্রশিক্ষণে।
স্বাধীন শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন এই আমীরগণ। এর জন্যে প্রয়োজন খৃষ্টানদের সহযোগিতা। নুরুদ্দীন জঙ্গী ও খেলাফতের মাঝে ভুল-বুঝাবুঝির কাজে ব্যবহার করা হয় উম্মে আরারাকে। এ অভিযানে তিন খৃষ্টান মেয়েকে যুক্ত করে একটি টিম গঠন করে ক্রুসেডাররা।
কঠোর প্রশিক্ষণ দিয়ে উম্মে আরারাকে, তারা উপহারস্বরূপ খলীফা আল-আজেদের খেদমতে প্রেরণ করে। তার দায়িত্ব, প্রথমত খলীফার অন্তরে সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করা এবং সাবেক সুদানী ফৌজের যে কজন অফিসার এখনো বাহিনীতে রয়ে গেছে, তাদেরকে খলীফার কাছে ভিড়িয়ে সুদানীদেরকে আরেকটি বিদ্রোহের প্রতি উৎসাহিত করা। দ্বিতীয়ত সুদানী ফৌজকে বিদ্রোহে নামিয়ে অস্ত্র ও নানাবিধ উপায়ে তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য খলীফাকে প্রস্তুত করা এবং সম্ভব হলে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একটি দলকে প্ররোচনা দিয়ে বিদ্রোহী বানিয়ে তাদেরকে সুদানীদের সঙ্গে যুক্ত করা। খলীফা আর কিছু করতে না পারলেও তাকে দিয়ে অন্তত এতটুকু করানো যে, নিজের নিরাপত্তা বাহিনীকে সুদানীদের হাতে অর্পণ করে নিজে সুলতান আইউবীর নিকট চলে যাবেন এবং তাকে বলবেন, আমার রক্ষী বাহিনী বিদ্রোহী হয়ে গেছে। সারকথা, সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে এমন একটি যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করা, যা তাকে মিসর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে এবং বাকি জীবনটা তার একঘরে হয়ে কাটাতে হয়।
