দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। দেবতাদের কোন সংবাদ আসছে না। সংশয়ে পড়ে যায় এক শ্রেণীর যুবক। সব মিথ্যা বলে সন্দেহ জাগে তাদের মনে। কিন্তু কারুর এতটুকু সাহস নেই যে, ওখানে গিয়ে দেখে আসবে, পুরোহিত আসছেন না কেন।
***
ডাক্তারকে ডেকে আন। মেয়েটা নেশার ঘোরে এমন করছে। বললেন সুলতান আইউবী।
উম্মে আরারা সুলতান আইউবীর সামনে বসে আছে এবং বিড় বিড় করে বলছে–আমি আঙ্গুকের মা। তুমি কে? তুমি তো দেবতা নও। আমার স্বামী কোথায়? আমার মাথাটা কেটে ফেলো এবং দেবতাকে দিয়ে দাও; আমাকে আমার ছেলেদের জন্য উৎসর্গ করো।
অনর্গল-বকে যাচ্ছে উম্মে আরারা। নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন সে। মাথাটা দুলছে তার।
ডাক্তার আসেন। মেয়েটির অবস্থা দেখেই তিনি সব বুঝে ফেলেন। সামান্য ঔষধ খাইয়ে দেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই তার চোখ দুটো বুজে আসে। বিছানায় শুইয়ে দেয়া হলো তাকে। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে উম্মে আরারা।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শুনলেন আইউবী। অভিযান চালিয়ে সেই পার্বত্য অঞ্চলে কী কী পাওয়া গেলো, তা-ও শোনানো হলো তাকে। সুলতান আইউবী নায়েব সালার আন-নাসের ও বাহাউদ্দীন শাদ্দাদকে নির্দেশ দেন, পাঁচশত সৈন্য নিয়ে আপনারা এক্ষুনি রওনা হন। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিন। মূর্তিটিকে ধুলায় মিশিয়ে দিন। জায়গাটিকে ঘেরাও করে রাখুন। আক্রমণ আসলে মোকাবেলা করবেন। এলাকার মানুষ যদি নতি স্বীকার করে, তাহলে তাদেরকে স্থানটি দেখিয়ে মমতার সাথে বুঝিয়ে দেবেন, এ ছিলো স্রেফ প্রতারণা।
বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তার ডায়রীতে লিখেছেন
পাঁচশত সৈন্য নিয়ে আমরা ওখানে পৌঁছি। পূর্ব থেকে আমাদের যে বাহিনীটি ওখানে অবস্থান নিয়েছিলো, তার কমাণ্ডার আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। হাজার হাজার সুদানী কাফ্রী দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কেউ কেউ উট-ঘোড়ায় সওয়ার হাতে তাদের বর্শা, তরবারী ও কামান-ধনুক।
আমাদের সমুদয় সৈন্যকে আমরা সেই পার্বত্য অঞ্চলের চারদিকে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দেই যে, তাদের মুখ বাইরের দিকে। তারা তীর-ধনুক বর্শা নিয়ে প্রস্তুত দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছিলাম।
আমি আন-নাসেরের সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করি। মূর্তিটি দেখেই আমি বললাম, এতো ফেরাউনদের প্রতিকৃতি।
আশে-পাশে পড়ে আছে হাবশীদের লাশ। আমরা পুরো এলাকা ঘুরে-ফিরে দেখি । দুটি পাহাড়ের মাঝে একটি জীর্ণ প্রাসাদ। ফেরআউনী আমলের একটি মনোরম প্রাসাদ এটি। দেয়ালের গায়ে সে যুগের কিছু লিপি। আমাদের সন্দেহ রইলো না, এখানে ফেরআউনের-ই বাস ছিলো।
দেয়ালের মত খাড়া একটি পাহাড়ের পাদদেশে একটি ঝিল। ঝিলে অনেকগুলো কুমীর। পাহাড়ের কোল ঘেষে পাহাড়ের ভিতরে ঢুকে গেছে ঝিলের পানি। পানির উপর পাহাড়ের ছাদ। বড় ভয়ঙ্কর জায়গা। আমাদের দেখে সবগুলো কুমীর এসে পড়ে কুলে । চেয়ে চেয়ে আমাদের দেখতে থাকে।
আমি সৈনিকদের বললাম, হাবশীদের লাশগুলো ধরে ধরে ঝিলে নিক্ষেপ করো; ক্ষুধার্ত প্রাণীগুলোর ভাল আহার মিলবে। সৈনিকরা লাশগুলোকে টেনে-হেঁচড়ে ঝিলে নিক্ষেপ করে। কুমীরের সংখ্যা যে কতো, তার হিসেব নেই। ফেলা মাত্র দেখলাম, লাশগুলো যেন দৌড়ে পাহাড়ের অভ্যন্তরে চলে গেলো। সব শেষে আসলো পুরোহিতের লাশ। বহু মানুষকে সে কুমীরের মুখে নিক্ষেপ করেছিলো। আর আজ সে নিজেই নিক্ষিপ্ত হলো সেই কুমীরের মুখে।
দুজন সিপাহী চারটি সুদানী মেয়েকে ধরে আনে। তারা এক স্থানে লুকিয়ে ছিলো। মেয়েগুলো বিবস্ত্র । কোমরে বাঁধা দুটি পাতা। একটি সামনে, অপরটি পিছনে। আমি ও নাসের অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। সৈনিকদের বললাম, জলদি এদের ঢাকো। সৈনিকরা তাদের পোশাক পরায়। এবার আমরা তাদের পাণে তাকালাম। মেয়েগুলো বেশ রূপসী। তারা কাঁদছে। ভয়ে থ থ করে কাঁপছে। তারা অভয় পেয়ে কথা বলে। খুলে বলে সেখানকার সব ইতিবৃত্ত। বড় লজ্জাকর সেসব ঘটনা। নারী জাতির এ অবমাননা কোন মুসলমানের সহ্য হওয়ার কথা নয়। আপন-পর, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ইসলাম সব নারীকে সমান ইজ্জত করে। একজন মুসলমানের নিকট একজন মুসলিম নারীর যে মর্যাদা, একজন অমুসলিম নারীর মর্যাদা তার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। যা হোক, মেয়েগুলোর বক্তব্যে আমরা বুঝলাম যে, তারা ফেরআউনদের খোদা বলে বিশ্বাস করে। তাদের গোত্রের মানুষ মানুষকে খোদা মানে।
স্থানটি বেশ মনোরম। সবুজ-শ্যামলিমায় ঘেরা সমগ্র এলাকা। ভেতরে পানির ঝরনা। এই ঝরনার পানি থেকেই ঝিলের উৎপত্তি। ঘন সন্নিবিষ্ট বৃক্ষরাজি ছায়া দিয়ে রেখেছে। কোন এক সৌখিন ফেরআউনের স্থানটি পসন্দ হয়ে গেলে একে সে বিনোদপুরি বানিয়েছিলো। নিজের খোদায়িত্বের প্রমাণস্বরূপ তৈরী করেছিলো এ মূর্তিটি। নির্মাণ করেছিলো পাতাল-কক্ষ। বহুদিন আমোদ করে গেছে সে এখানে।
অবশেষে এক সময় দিন বদলে যায়। খসে পড়ে ফেরআউনদের ক্ষমতার নক্ষত্র। মিসরে আসে আরেক মিথ্যা ধর্ম। কেটে যায় কিছু দিন। সবশেষে জয় হয় সত্যের। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর মুখরিত ধ্বনি শুনতে পায় মিসর। আল্লাহর সমীপে মাথা নত করে মিসরের মানুষ। কিন্তু সকলের চোখে ধুলো দিয়ে মিথ্যা তখনো টিকে থাকে এই পার্বত্য অঞ্চলে। আল-হামদু লিল্লাহ, মহান আল্লাহর অপার কৃপায় আমরা মিথ্যার এই শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেললাম। মূর্তিপূজাসহ জঘন্যতম কুসংস্কার থেকে এ ভূখণ্ডটিকে পবিত্র করলাম।
