কমাণ্ডো সেনারা এখনো বেশ দূরে এবং পাহাড়ের চূড়ায় তাদের অবস্থান। সেখান থেকে তীর ছুঁড়লে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আবার সেখান থেকে নীচে নেমে আসাও অসাধ্য। নীচের দিকে কোন ঢালু নেই। সামনে খাড়া দেয়াল।
কমান্ডোরা বুঝে ফেলে মেয়েটিকে বলীর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ধারাল তরবারীর আঘাত তার মস্তক দ্বি-খণ্ডিত করলো বলে। হাতে সময় এতই কম যে, উড়ে গিয়ে বলীর স্থলে পৌঁছুতে না পারলে রক্ষা করা যাবে না তাকে। চূড়া থেকে নীচে তাকিয়ে তারা একটি ঝিল দেখতে পায়। এই সেই ঝিল, যেখানে বাস করে অসংখ্য কুমীর।
ডান দিকে খানিকটা ঢালু পথ। তা-ও প্রায় খাড়া দেয়ালের-ই মত। ঝোঁপ-জঙ্গল এবং গাছ-পালাও আছে এখানে। সেটি অবলম্বন করে একে অপরের হাত ধরে ঢালু বেয়ে নামতে শুরু করে তারা। পিছনের কমাণ্ডো হঠাৎ দেখতে পায়, সামনের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক হাবশী। তার এক হাতে ঢাল, অপর হাতে বর্শা। নিক্ষেপের জন্য তীরের মত তাক করে রেখেছে বর্শাটি। কমাণ্ডোদের উপর চাঁদের আলো পড়ছে না। নিশ্চিত কিছু বুঝে উঠতে পারেনি হাবশী এখনো। ধনুকে তীর জুড়ে দেয় পিছনের কমাণ্ডে। ছুটে যায় তীর। রাতের নিস্তব্ধতায় তীরের শাঁ শাঁ শব্দ কানে বাজে সকলের। হাবশীর ধমনিতে গিয়ে বিদ্ধ হয় তীরটি। মাটিতে পড়ে গিয়ে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে সে। ঢালু বেয়ে নীচে নেমে আসে কমান্তোরা।
***
তরবারীর ধারাল বুক উম্মে আরারার ঘাড়ে রাখেন পুরোহিত। আবার উপরে তোলেন। পার্শ্বস্থিত নারী-পুরুষরা সেজদা থেকে উঠে আসন গেড়ে বসে ধীর অথচ জ্বালাময়ী কণ্ঠে কী যেন পাঠ করতে শুরু করে। তরবারী উঁচু করে দাঁড়িয়ে পুরোহিত। দু-একটি নিঃশ্বাসের বিলম্ব আর। তরবারী নীচে নামলো বলে। ঠিক এমন সময়ে একটি তীর এসে বিদ্ধ হয় পুরোহিতের বগলে। তরবারী ধরা হাতটা তার নীচে পড়ে যায়নি এখনো। একই সঙ্গে আরো তিনটি তীর এসে বিদ্ধ হয় পাজরে। চীৎকার জুড়ে দেয় মেয়েরা। জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে হাবশী পুরুষরা। দেখতে না দেখতে আরো এক ঝাঁক তীর এসে আঘাত করে পুরোহিতের সহচরদের। ধরাশায়ী হয়ে পড়ে দু ব্যক্তি। এদিক-সেদিক দৌড়ে পালিয়ে যায় মেয়েরা। উম্মে আরারার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই সেদিকে। দিব্যি মাথা নত করে বসে আছে সে।
দ্রুত দৌড়ে বেদীতে এসে পৌঁছে কমান্ডোরা। চবুতরায় উঠে তুলে নেয় উম্মে আরারাকে। নেশার ঘোরে প্রলাপ বকছে সে এখনো। এক জানবাজ নিজের গায়ের জামা খুলে পরিয়ে দেয় তাকে। উম্মে আরারাকে নিয়ে রওনা দেয় তারা।
হঠাৎ বার-তেরজন হাবশী বর্শা ও ঢাল নিয়ে ছুটে আসে একদিক থেকে। বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে সুলতান আইউবীর কমাণ্ডোরা। তীর-কামান ছিলো তাদের চারজনের কাছে। তীর ছুঁড়ে তারা। অবশিষ্টরা লুকিয়ে থাকে এক জায়গায়। হাবশীরা নিকটে এলে পিছন দিক থেকে তাদের উপর হামলা চালায় লুকিয়ে থাকা কমাণ্ডোরা। এক তীরন্দাজ কমাণ্ডো কামানে সলিতাওয়ালা তীর স্থাপন করে। সলিতায় আগুন ধরিয়ে ছুঁড়ে মারে উপর দিকে। বেশ উপরে উঠে থেমে যখন তীরটি নীচে নামতে শুরু করে, তখন প্রজ্বলিত হয়ে উঠে তীরের মাথায়। জড়ানো সলিতার শিখা।
মেলার জাঁকজমক মন্দীভূত হয়নি এখনো । উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের পাঁচশত লোক মেলাঙ্গন থেকে পৃথক হয়ে তাকিয়ে আছে পাহাড়ী ভূখণ্ডের প্রতি। বেশ দূরে শূন্যে একটি শিখা দেখতে পায় তারা। হঠাৎ প্রজ্বলিত হয়ে নীচে নামছে শিখাঁটি। তারা উট-ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আছে। কমার আছে তাদের সঙ্গে। প্রথমে ধীরপায়ে এগিয়ে চলে তারা, যেন সন্দেহ না জাগে কারুর মনে। খানিক দূরে গিয়েই দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটায়। মেলার লোকেরা মদ-জুয়া, উলঙ্গ নারীর নাচ-গান আর গণিকাদের নিয়ে এতই ব্যস্ত যে, তাদের দেবতাদের উপর কি প্রলয় ঘটে যাচ্ছে, তার খবরও নেই তাদের।
কমান্ডো বাহিনী এই আশঙ্কায় অগ্নি-তীর নিক্ষেপ করেছিলো যে, হাবশীদের সংখ্যা বোধ হয় অনেক হবে। কিন্তু পাঁচশত সৈন্য অকুস্থলে পৌঁছে মাত্র চৌদ্দ-পনেরটি লাশ দেখতে পায়। তেরটি হাবশীদের আর দুটি তাদের দু । কমাণ্ডোর। হাবশীদের বর্শার আঘাতে শাহাদাতবরণ করেছিলো কমাণ্ডো দুজন।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে চারদিকের খোঁজ-খবর নেয় সৈন্যরা। তারা পাথরের মুখমণ্ডলের নিকট ও পাতাল কক্ষে যায়। যা পেলো কুড়িয়ে নেয় সব। তন্মধ্যে ছিলো একটি ফুল। ফুলটি প্রাকৃতিক নয়–কৃত্রিম। কাপড় দিয়ে তৈরী করা হয়েছিলো ফুলটি। নির্দেশনা মোতাবেক পাঁচশত সৈন্য জায়গাটি দখল করে অবস্থান নেয় সেখানে। আর উম্মে আরারাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে কায়রো অভিমুখে রওনা হয় কমাণ্ডো বাহিনী।
ভোর বেলা।
মেলার রওনক শেষ হয়ে গেছে। রাতভর মদপান করে এখনও অচেতন পড়ে আছে বহু লোক। দোকানীরা যাওয়ার জন্য মালামাল গুটিয়ে নিচ্ছে। মেয়ে-বেপারীরাও যাচ্ছে চলে। মেলাঙ্গন থেকে বের হওয়ার জন্য মরুবাসীদের ভীড় পড়ে গেছে রাস্তায়।
আংগুক গোত্রের লোকেরা-অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুণছে কখন তাদের মাঝে বলী দেয়া মেয়ের চুল বিতরণ করা হবে।
এ গোত্রের যারা দূর-দূরান্তের পল্লি অঞ্চলে বাস করে, তারা এক নাগাড়ে পাহাড়ী অঞ্চল থেকে দূরে দাঁড়িয়ে দেবপুরীর প্রতি তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধ ও প্রবীণরা নবীনদের সান্ত্বনা দিচ্ছে, একটু অপেক্ষা করো, পুরোহিত এক্ষুনি চলে আসবেন, দেবতাদের সন্তুষ্টির সুসংবাদ প্রদান করবেন এবং আমাদের মাঝে চুল বিতরণ করবেন। কিন্তু দেবতাদের কোন পয়গাম যে আসবে না, তা কেউ জানে না।
