মুহতারাম হুররানী! যারিয়াব বললো, আপনাকে তা করতেই হবে যা সুলতানা আপনাকে বলেছে। আর না করলে আপনার পরিণাম কী হবে হবে সেটা আমি বলতে পারছি না।
ও আপনাকে আমীরে উন্দলুসের দৃষ্টি থেকে শুধু নিক্ষেপই করবে না। আপনার ওপর ভয়াবহ অপবাদ আরোপ করে আপনাকে সেসব কয়েদীদের সাথে কয়েদ করাতে পারবে যাদের শরীরের হাড়-মাংস প্রচন্ড আগুনের তাপে গলে গলে পড়ছে। আর তারা মরছেও না এবং বেঁচেও থাকতে পারছে না। তবে আপনি আপনার মতো করে কৌশলেও আমীরকে সুলতানার কথাগুলো বলতে পারেন।….
আমিও মানি, আমীরে উন্দলুস আব্দুর রহমান যেমন আরেকজন সুলতানা পাবেন না তেমনি উন্দলুস এমনকি খেলাফতও দ্বিতীয় আব্দুর রহমানও পাবে না। উন্দলুসের সার্বভৌমত্বের জন্য বরং সালতানাতে ইসলামিয়ার স্থায়িত্বের স্বার্থে আপনাকে মিথ্যা বলতেই হবে। এটা আমিও চাই।
হুররানী স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
আমার আরো কিছু বলার ছিলো। হুররানী বেশ কিছুক্ষণ পর চরম আহত গলায় বললেন, তবে বলবো না। আপনাকে বলে লাভও নেই। তবে যা আমার করা উচিত নয়, সেটাই করতে হবে।
***
ডাক্তার মিথ্যা বলতে চাচ্ছিলেন না। ওকে আমি রাজি করিয়েছি। যারিয়াব সুলতানাকে বলছিলো।
ডাক্তার আসছে সুলতানা বললো। ওকে আমি খবর দিয়েছি। শাহে উন্দলুসকেও বলে এসেছি, আপনার চেহারা মলিন দেখাচ্ছে এবং আপনার দৃষ্টির উজ্জলতাও স্নান হয়ে যাচ্ছে। আমি ডাক্তার নিয়ে আসছি।
তোমার আর কতদিন বাকি? যারিয়াব জিজ্ঞেস করলো।
এক মাসেরও কিছু কম। সুলতানা বললো, আমি একটি ছেলে জন্ম দিতে পারবো বলে আশা করছি। আর এ হবে আব্দুর রহমানের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। এখন তো আমার খ্রিষ্টানদের সাহায্য আরো বেশি দরকার। আর তোমার সাহায্যও।
এসময় খবর এলো হামিক হুররানী আসছেন। হুররানীকে সুলতানা তার কামরায় বসালো। আরেকবার তাকে মনে করিয়ে দিলো আমীরকে কী বলতে হবে।
ওদিকে আব্দুর রহমানের শাহী কামরায় একই সময়ে আব্দুর রহমানের কাছে গিয়ে বসলো মুদ্দাসসিরা। আব্দুর রহমান মুদ্দাসসিরার ব্যাপারেও বেশ প্রভাবান্বিত। মুদ্দাসসিরা তাকে ফ্লোরার ঘটনা শোনালো।
এমন মেয়েকে তো মৃত্যুদন্ড দেয়া উচিত ছিলো। আব্দুর রহমান বললেন।
আপনি কয়জনকে মৃত্যুদন্ড দেবেন? মুদ্দাসসিরা বললেন, ক্রুশের পূজারীদের ফেতনা আজ চারদিক থেকেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আপনার নিজ হাতে এখন এ ব্যাপারটার বিহিত করা দরকার। সালাররা তো ময়দানের ব্যাপারেই ভালো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। কিন্তু এ ব্যাপারে ফায়সালা আপনাকেই। করতে হবে। ফ্রান্সের ওপর হামলা করতে হবে। বিদ্রোহীদের মদদ ওখান থেকেই আসছে।
আমার অভিযানের সব আয়োজন তো এ উদ্দেশ্যেই। আব্দুর রহমান বললেন।
আমি তো লক্ষ্য করেছি, আপনি কোন অভিযানে গেলে আপনার শরীর স্বাস্থ্য তরতাজা থাকে। মুদ্দাসসিরা হাসতে হাসতে বললো, এখানে পড়ে থাকাটা আপনার স্বভাব বিরুদ্ধ ব্যাপার।
শুধু আমার নয়, মুসলমানদেরও স্বভাব বিরুদ্ধ ব্যাপার এটা যে, দুশমন কোথাও বসে মুসলমানদের ধ্বংসের নীলনকশা তৈরি করছে আর মুসলমানরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। আমি জিহাদে আমার প্রাণ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। বার্ধক্যের দুর্বলতায় যখন আমার হাত কাঁপতে থাকবে তখনও আমার হাতে তলোয়ার থাকবে এবংআমার ঠিকানা হবে তখন ঘোড়ার পিঠ।
দৈহিকভাবে মুদ্দাসসিরার রেশম কোমল চুল, তার ডাগর ডাগর চোখ, রাঙা ঠোঁটে লেগে থাকা মিষ্টি হাসি এবং তার দারুণ আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন আব্দুর রহমান দারুণ ভালোবাসতেন।
তার শুধু অসাধারণ রূপই নয়, তার মধ্যে এমন স্বচ্ছ-স্বাধী প্রাণময়তা সবসময় সমুজ্জ্বল থাক যে, আব্দুর রহমান তাকে দেখলে মুগ্ধ না হয়ে পারেন না।
তোমার মধ্যে ও সুলতানার মধ্যে কেমন একটা পার্থক্য আমি অনুভব করি। কিন্তু প্রকাশ করতে পারবো না সেটা। আব্দুর রহমান ঘোরলাগা গলায় বললেন, তুমি কি জানো এ পার্থক্যটা কী?
কখনো জানতে চেষ্টা করিনি। মুদ্দাসসিরা বাচ্চাদের মত খিল খিলিয়ে হেসে বললো। কখনো নিজের মাথায় এ চিন্তা আসতে দেয়নি যে, আমিই একমাত্র আপনার এবং আপনি শুধু আমারই। সুলতানা আর আমার মধ্যে পার্থক্য ততটুকুই যতটা বিভিন্ন ফুলের মধ্যে থেকে থাকে। প্রত্যেক ফুলেরই নিজস্ব সৌন্দর্য ও সুগন্ধি রয়েছে। আমি কখনো এমন করে ভাবিনি, আমি সেই ফুল যা পুরো বাগানে একাই কর্তৃত্ব করে।
এমন রোমাঞ্চ জাগানো পরিবেশে দরজায় হালকা শব্দ হলো। এই শব্দের ধরণ যেমন আব্দুর রহমান চিনেন তেমনি চিনে মুদ্দাসসিরাও।
এটা কি ওর আসার সময় হলো? আব্দুর রহমান বললেন।
আসতে দিন। মুদ্দাসসিরা আব্দুর রহমানের বাহুমুক্ত হয়ে উঠতে উঠতে বললো, ওরও তো আসতে হয়।
মুদ্দাসসিরা দরজা খুলে দিলো।
সুলতানা ভেতরে ঢুকেই কর্তৃত্বের সুরে বললো,
হাকিম হুররানী এসেছেন। সুলতানার পেছনে যারিয়াব ও তার সঙ্গে হুররানী। হুররানী এসেই আব্দুর রহমানের হাতের কব্জি ধরলেন এবং চোখে-মুখে একটা চিন্তার ছাপ ফোঁটালেন। তারপর আব্দুর রহমানের পেট, বুক, হাতে মৃদু চাপ দিয়ে দিয়ে পরীক্ষা করলেন। দুচোখ আঙ্গুল দিয়ে খুলে দেখলেন।
হুররানী! আমীরে উন্দলুস বললেন, আপনি মনে হয় দেখতে এসেছেন আমি কেন অসুস্থ হচ্ছি না। তিনি হেসে উঠে বললেন, আল্লাহ তাআলা আমার ভেতরে অতিরিক্ত একটা রগ দিয়েছেন সেটা যেকোন ধরনের রোগ ব্যাধিকে তার জন্মকালেই শেষ করে দেয়। হঠাৎ করে আপনার কেন সন্দেহ হলো যে, আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি, হুররানী?
