আমরা এটাই দেখতে এসেছি আমাদের সন্দেহ কতটা ঠিক। যারিয়াব হেসে বললো, খেলাফত ও উন্দলুসের সুস্থ এক আব্দুর রহমানের প্রয়োজন।
আব্দুর রহমান তো অনেক আছে, আপনার সমতুল্য তো কেউ হবে না।
সুলতানা মুখে মায়াবী এক হাসি ছড়িয়ে বললো, যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে আসার পর কত দিন হয়ে গেলো কিন্তু এখনো আপনার চেহারা থেকে ক্লান্তির ছাপ গেলো না। জনাব হুররানীকে এ ব্যাপারে জানালে তিনি বললেন, আপনার হার্ট দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তিনি যুদ্ধের ময়দানে যাওয়া থেকে বিরত না হলে তার হার্ট এ্যাঁটাক হয়ে যাবে।
তোমাদের দেখার মধ্যে এত পার্থক্য কেন? আব্দুর রহমান দ্বিধান্বিত গল বললেন, মুদ্দাসসিরা আমাকে দেখে সুস্থ সবল। যুদ্ধের ময়দানে থাকলে আমার শরীর স্বাস্থ্য তরতাজা থাকে। আর তোমরা বলছো, আমার হার্ট এ্যাঁটাক হয়ে যাবে।
সুলতানা চোখ ঘুরিয়ে মুদ্দাসসিরার দিকে তাকালো।
আমীরে উন্দুলুসের দীর্ঘ এক বিশ্রামের প্রয়োজন। হুররানী ঘোষণা দেয়ার মতো বললেন, হৃদযন্ত্র অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আপনার শাহরগ বলছে, রক্তের চলমান গতি ধীর হয়ে আসছে। আরো দ্বিগুণ- দ্রুততর হতে হবে।
হুররানী! মুসলমানদের রক্ত ঘরে বসে আরাম করলে দ্রুততর হয় না। আমীরে উন্দলুস বললেন, রক্তের গতি কেবল যুদ্ধের ময়দানেই ক্ষিপ্রতর হতে পারে।
আপনার স্বাস্থ্যের প্রতি আরেকটু গুরুত্ব দেয়া উচিত আমীরে উন্দলুস! সুলতানা বললো, কোন তোষামোদকারী যদি বলে আপনার স্বাস্থ্য খুবই ভালো তাহলে সে নিশ্চয় আপনার মঙ্গল চায় না। মুহতারাম হুররানী! আপনি ঔষধ বানিয়ে পাঠিয়ে দিন। আমি তাঁর বিশ্রামের ভার নিচ্ছি।
বিশ্রামও এত বেশি করা যাবে না যে, রক্তের বর্তমান যে গতি রয়েছে তাও শ্লথ হয়ে যায়। মুদ্দাসসিরা বললো, কোন দরবারী চাটুকারদের দল যদি বলে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এর মধ্যেও কম চাটুকারিতা থাকে না। সঠিক সিদ্ধান্ত ডাক্তারই দিতে পারেন। আর সময়ই বলে দেবে, কে আমীরে উন্দলুসের মঙ্গল চায় আর কে তাকে কালনাগিনীর মতো দংশন করতে চায়।
হুররানী অপ্রতিভ আর অপ্রস্তুত সুরে এমনভাবে কথা বলতে লাগলেন যেন কথা তিনি বলছেন না, বলছে অন্য কেউ।
আমি প্রয়োজনী ঔষধ পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমীরে মুহতারামের বিশ্রামে থাকা উচিত। হুররানী একথা বলে অনুমতি নিয়ে চলে গেলেন।
চলে গেলো মুদ্দাসসিরাও।
যারিয়াব ও সুলতানা এমনভাবে আব্দুর রহমানকে বুঝালো যে, তার মধ্যেও এ সন্দেহ বসে গেলো যে, তিনি সুস্থ নন এবং তার শুধু বিশ্রামে থাকলেই হবে না। নারী-সঙ্গও বর্জন করে চলতে হবে। এসব কথায় সুলতানার আসল উদ্দেশ্য হলো, তাকে ছাড়া যেন কোন নারী আব্দুর রহমানের কামরায় না আসে।
***
তিন-চারদিন পরের কথা। মুদ্দাসসিরা হাকিম হুররানীর পয়গাম পেলো যে, তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। কিন্তু মহলে আসতে সাহস পাচ্ছেন না। মুদ্দাসসিরা পয়গামের জবাব দিলো, আগামীকাল তাকে সংবাদ দেয়া হবে যে, মুদ্দাসসিরার পেটে ভীষণ ব্যথা। সংবাদ পেতেই হুররানী যেন চলে আসে।
পরদিন হুররানীকে মহল থেকে সংবাদ দেয়া হলো, মুদ্দাসসিরার পেটে ভীষণ ব্যথা। হুররানী তখনই এসে উপস্থিত হলো। মুদ্দাসসিরা তার কামরায় শোয়া ছিলো। খাদেমকে সে বাইরে পাঠিয়ে দিলো।
আমার বিশ্বাস, আপনার সঙ্গে আমি কথা বলতে পারবো। হুররানী বললেন, আমার বিবেকের ওপর অপরাধের এক বোঝা চেপে আছে। যেটা আমি একমাত্র আপনার সামনেই ব্যক্ত করতে পারি।
সম্ভবত আমি জানি, সেই বোঝাটা কী? মুদ্দাসসিরা স্মিত হাস্যে বললো, আমীরে উন্দলুসের হৃদযন্ত্রে কোন রোগ-ব্যাধি নেই। আপনি বাধ্য হয়ে তাকে অসুস্থ বানিয়েছেন।
হুররানী বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন। অসম্ভব রূপবতী এবং যৌবনবতী একটি মেয়ের ভাবনার দৃষ্টির এতটা গভীরে পৌঁছতে পারে সেটা তিনি কল্পনাও করেননি।
আপনি কি এটা আমীরে উন্দুলুসকে বলতে চান?
আমি শুধু তার ভেতরের সন্দেহ দূর করতে পারি। মুদ্দাসসিরা বললো, তবে এটা আমি বলবো না যে, সুলতানা ও যারিয়াব তার মনের মধ্যে এই দ্বিধা-দন্দ্ব সৃষ্টি করছে, তাকে মানসিকভাবে স্থবির করে দিতে চাচ্ছে। ওরা দুশমনের হাত শক্তিশালী করছে, এসব কথা আমি আমীরে উন্দলুসকে বলবো না। যদি বলি তাহলে তিনি ওদেরকে বিজ্ঞেস করবেন। তারপর ওরা দুজন আমার ওপর যে কোন মূল্যে প্রতিশোধ নিবে।
তারপর আমি এই লড়াইয়ের একটি পক্ষ হয়ে যাবো। এর ফলে আমার চিন্তা ভাবনা হয়ে যাবে ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত প্রবণ। আমি আমার চিন্তা-ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে এমন নোংরা মানসিকতায় সীমাবদ্ধ করতে চাই না। আপনি আপনার বিবেককে বোঝামুক্ত করে ভালো করেছেন এবং আপনি সুলতানার কথা মেনেও ভালো করেছেন। যদি তা না করতেন তাহলে ও আপনাকে সত্যিই কোন এক আস্তাকুঁড়ে নিয়ে ফেলতো।
সত্যিই আপনি এক মহীয়সী নারীর আসন্ন অলংকৃত করার যোগ্য এক নারী। হুররানী পরম সম্মান প্রদর্শনের কণ্ঠে বললেন, আপনি সত্যিই আমার বিবেক ও হৃদয়ের ভারী বোঝা নামিয়ে দিলেন।
হুররানী চুপ করে গেলেন। এদিক ওদিক তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন। আমি একটি পাপ আপনার পায়ে পেশ করছি।
কাল রাতে কোন এক সময় আপনার এক খাদেমা আপনাকে একটি দুধের পাত্রে দুধ দিয়ে বলবেন, এর মধ্যে মিসরের সেই মধু মিশানো হয়েছে যা কোন সৌভাগ্যবানই পান করতে পারে। এ মধু মানুষের যৌবনকে আজীবন ধরে রাখে। আর রক্তের মধ্যে সবসময় এমন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে থাকে যে, সুখের লাবন্য-রূপ দিন দিন উজ্জল হতে থাকে।…..
