আমি মন থেকে ধর্ম গ্রহণ করবো কি না এটা নির্ভর করছে তার ওপর যিনি ধর্মগ্রহণ করাতে এসছেন তিনি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য কি না! ফ্লোরা স্মিত হেসে বললো।
লোকটা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। এ ধরণের কথার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।
আপনিই যদি প্রতিদিন আসেন, তাহলে আপনি যা বলবেন তা আমি আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করবো। ফ্লোরা বললো, তবে শর্ত হলো, শক্ত ও কঠিন কথা আমাকে বলা যাবে না। এটা ভুলে যাবেন না, আমি সেই বন্দি পাখির মতো, যে শূন্যে উড়ে বেড়াতে অভ্যস্ত। এ অবস্থায় আমার মনে বিরক্তি খুব দ্রুত আসতে পারে।
তুমি কি মনের মতো উড়ে বেড়াতে চাও?
না, আমি মন ভরে হাসতে চাই, খেলতে চাই। বাধ্য বাধকতাকে ভয় পাই। আমার মনের বিরুদ্ধে কোন কিছু আমার ওপর চাপিয়ে দিতে চাইলে কোন ধর্মই আমি গ্রহণ করতে পারবো না।
এই আমার সাথে তুমি হাসতে খেলতে চাও?
আমার এই প্রয়োজন যদি আপনি পূরণ করে দেন তাহলে আমাকে আপনার দাসীও বানিয়ে নিতে পারেন। আর আপনি আমাকে যে শিক্ষাই দেবেন সেটা আমার রক্তে মিশে যাবে। ফ্লোরা বললো।
শিক্ষক লোকটি হেসে ফেললো। বললো,
তুমি খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে! আমি তোমার হাসি খেলার প্রয়োজন পূর্ণ করার সুযোগ দেবো। এর বিনিময়ে আমি তোমাকে যা বলবো তার প্রতিটা শব্দ তোমার অন্তরে বসাতে হবে। আমার সামনে বসে যাও।
***
হাকিম হুররানী! আমীরে উন্দুলুস আব্দুর রহমান ছানীর আমলের শাহী বিকিৎসক। ইতিহাসের পাতায় তার পূর্ণ নাম পাওয়া যায়নি। শুধু হামিক হুররানী লেখা রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট ও গবেষক চিকিৎসক হিসাবে তিনি কর্ডোভায় খুব অল্প বয়সেই সুনাম অর্জন করেন।
অত্যাশ্চার্য কিছু ঔষধও তিনি আবিস্কার করেন। তাই তাকে শাহী দরবারের চিকিৎসকের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়।
হুররানী শুধু বিদ্যাগত চিকিৎসকই ছিলেন না। অনেক বড় পন্ডিত আলেমও ছিলেন। কিন্তু আব্দুর রহমান তাকে কেবল চিকিৎসক হিসাবেই জানতেন। তার জ্ঞান বিদ্যার পান্তিত্য সম্পর্কে তার কোন ধারণা ছিলো না।
হুররানী একদিন বেশ পেরেশান হয়ে যারিয়ারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আমীরে উন্দলুসের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয়ে কোন কথা বলতে যারিয়াকে মধ্যস্ততাকারী হিসাবে মেনে নিয়েই এবং তার সুমতি মিললেই কেবল আমীরে উন্দলুসের সঙ্গে সাক্ষাত ঘটতো। তার সুপারিশ দ্বারা আমীরে উন্দুলুসকে দিয়ে যা ইচ্ছা তাই করানো যেতো।
আমি শাহী দরবারের চিকিৎসক! হুররানী বললেন, সরাসরি আমার তার কাছে যাওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু হুকমত বিষয় আপনি ততটা বুঝেন যতটা আমি ডাক্তারি বিষয় বুঝি। আমাকে কিছু একটা পরামর্শ দিন। আমি খুবই পেরেশান?
ডাক্তার যদি পেরেশান হয়ে যান তাহলে রোগীর কী দশা হবে? দয়া করে বলুন আমি আপনার পেরেশানী কি করে দূর করতে পারি।
সুলতানা মালিকায়ে তরূব আমাকে বলেছেন, আমি যেন আমীরে উন্দলুসের মনে এটা ঢুকিয়ে দিই যে, তিনি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছেন। হুররানী বললেন, মালিকায়ে তরুব চাচ্ছেন আমীরে উন্দলুস যেন কোন অভিযানে বের না হন। আর আমি তার মনের মধ্যে এমন রোগের অনুভূতি যেন ঢুকিয়ে দিই যেটা আসলেই তার মধ্যে নেই।
আপনি তাকে কী জবাব দিলেন?
আমি উনাকে বলেছি, আমার পেশা অত্যন্ত পবিত্র। হুররানী বললেন, আমি আমার দুশমনকেও ধোকা দিতে পারবো না। যে আমার রোগী নয় তার সঙ্গেও আমি মিথ্যা কথা বলতে পারবো না। আর ইনি তো আমীরে উন্দলুস। তার আনুগত্য করা আমার ওপর ফরজ। তা ছাড়া আমি তার চিকিঙ্ক। আমি মালিকাকে বললাম, আমি এ পাপ করতে পারবো না।
তিনি বললেন, এটা পাপ হলে এর মধ্যে পূণ্যও আছে একটা। তা হলো, আমীরে উন্দলুস আব্দুর রহমান অত্যন্ত মূল্যবান মানুষ। তিনি রণাঙ্গনে সেনাদলের নেতৃত্ব দিতে দিতে এবং লড়তে লড়তে যখমী হয়ে মারা না গেলেও অবিরাম ক্লান্তি ও রাত্রি জাগরণ ইত্যাদি কারণে অসুস্থ হয়ে সময়ের আগেই খতম হয়ে যাবেন।
আর যদি এমন ঘটে তাহলে তো উন্দলুসের জন্য এমন শাসক আর দ্বিতীয় জনকে পাওয়া যাবে না। আমি মালিকায়ে সুলতানাকে বললাম, তাকে এতটুকু বলতে পারি যে, তিনি লড়াইয়ের ময়দান থেকে যেন দূরে থাকেন এবং নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখেন। এ ছাড়া কোন মিথ্যা কথা তাকে বলতে পারবো না।
আপনি কি আব্দুর রহমানের কাছে সুলতানার ব্যাপারে অভিযোগ করতে চান? যারিয়াব জিজ্ঞেস করলো।
এটাই তো আপনাকে জিজ্ঞেস করতে এসেছি। হুররানী বললেন, কথা এখানেই শেষ হয়নি। আমি অস্বীকার করায় সুলতানা বিগড়ে গেলেন।………
তিনি বললেন, মুহতারাম হাকীম! আমীরে উন্দলুসের জন্য প্রয়োজনে আরো অনেক চিকিৎসক পাওয়া যাবে। কিন্তু আরেকজন সুলতানা পাওয়া যাবে না। তার ওপর আমার যে প্রভাব আছে এর সিকিভাগও আপনার নেই।……..
আমার এক ইশারায় আপনাকে আমীরে উন্দলুসের নজর থেকে আতঁকুড়ে নিক্ষেপ করতে পারবো। আমাকে ক্ষেপালে আপনার পরিণাম শুধু এটাই হবে যে, লোকে বলবে, এখানে হুররানী নামে একজন চিকিৎসক ছিলো। তিনি আর নেই। আপনাকে আমি যা বলছি তা আপনি করুন। দেখবেন আপনাকে দুহাত ভরে বখশিশ দেয়া হবে।….
মুহতারাম যারিয়ার! আমার ভালো করেই জানা আছে, আমীরে উন্দলুসের চোখে সুলতানার যে অবস্থান তার অর্ধেক ও আমার নেই। ডাক্তার তো আছে অনেক। কিন্তু সুলতানা তো ঐ একজনই। কিন্তু আমি আমার বিবেককে কী করে থোকা দেবো?
