তুমি কী অপরাধ করেছে ফ্লোরা? একদিন প্রহরী এক মহিলা তাকে জিজ্ঞেস করলো।
আমাকে আমার বাপ এক বুড়োর সঙ্গে বিয়ে করাতে চেয়েছিলো। ফ্লোরা বললো, এ লোক শুধু বুড়োই নয়, মদখোর, নারীবাজ। আমার বাপ ঐ বুড়োর সঙ্গে সওদা করে নিয়েছে। আমি তো সেটা মানতে পারি না। অস্বীকার করে দিয়েছি। এমন বুড়োর কাছে তোমরা কি কেউ বিয়ে বসতে পারবে?…
আমি রাজি হইনি বলে আমার ভাই আমাকে মারপিট করেছে। তারপর আমার বাপও আমাকে মেরেছে। আমি ওদেরকে গালি গালাজ করেছি। বাপ আমাকে ধরে আদালতে নিয়ে গেছে। আর বলেছে, আমার মেয়ে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করেছে। তাই আমি রেগে গেছি। আমার জায়গায় তোমরা হলে কি চুপ করে বসে থাকতে? রাগে আমি তখন কাঁপতে থাকি। তখন আমার বাপ ও বিচারককে দুকথা শুনিয়ে দিই।…..
বিচারক ফায়সালা দেন, এ মেয়ে বড় ঠোঁট কাটা, বড় বেয়াদব। একে পৃথক ঘরে নজরবন্দি করে রাখো। তাকে মহিলাদের প্রহরায় রাখতে হবে। ওকে শিষ্টাচার শেখাতে হবে।
তোমার ভাই কেন এসেছিলো? এক মহিলা বললো।
এটাই বলতে আমি যেন ঐ বুড়োকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাই। আমার ভাই আমাকে লোভ দেখিয়েছে, আমি রাজি হলে আমাকে ছেড়ে দেবে। ফ্লোরা বললো।
তুমি নাকি ইসলামের নামে অবমাননাসূচক কথা বলেছো? এজন্য তোমাকে নজরবন্দি করা হয়েছে। আরেক মহিলা বললো।
ফ্লোরা সুযোগ পেয়ে গেলো। আদালতের বিচারকের ব্যাপারে উল্টাপাল্টা সমালোচনা করতে শুরু করলো। বলতে লাগলো,
তোমরা ঐ বিচারককে ফেরেশতা মনে করো। বিচারক আমাকে যে দৃষ্টিতে দেখেছে আমিও যদি জবাবে তার দিকে সে দৃষ্টিতে তাকাতাম তাহলে আমার বাপের কথা একটাও শুনতো না। আমাকে কোন শাস্তিই দিতো না।…….
আর কার কথা বলবে, বিচারক, আমীরে উন্দলুস? সবাই মুখে ইসলামের কথা বলে আর ভেতরে ভেতরে মদ আর নারী নিয়ে পড়ে থাকে। অপরাধ করবেন তারা, আর শাস্তি পাবো আমরা।…..
সুন্দরী মেয়েদের রূপই তাদের জন্য বড় বিপদ টেনে আনে। তোমার দুর্ভাগ্য হলো তুমি একে তো যুবতী তারপর আবার দারুণ সুন্দরী। শাহে উন্দলুস তোমাকে দেখলে তো তার হেরেমে নিয়ে যাবে। তৃতীয় মহিলা বললো।
এমন হলে সেদিন হবে আমার শেষ দিন। ফ্লোরা বললো।
তোমার তো বাবা মারা গেছেন। মাও তোমার বোনকে নিয়ে এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। মুক্ত হলে কোথায় যাবে তুমি?
আমি তোমাদেরকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, এখান থেকে কখনো আমি পালানোর চেষ্টা করবো না। ফ্লোরা বললো, আমি তোমাদেরকে থোকা দেবো না। আমি জানি, আমি পালালে শাস্তি ভোগ করতে হবে তোমাদের। মেয়ে হয়ে আরেক মেয়েকে আমি এমন থোকা কখনো দিতে পারবো না।
তোমরা তিনজন কিছু সময়ের জন্য এখান থেকে চলে গেলেও ফিরে এসে আমাকে এখানেই পাবে। আর মুক্ত হওয়ার পর কোথায় যাবো সেটা এখনও ভেবে ঠিক করিনি। তবে সবার আগে তোমাদের তিনজনের কাছে আমার মিনতি, তোমাদের কেউ একজন আমাকে আশ্রয় দাও না?
***
প্রহরী মহিলারা ফ্লোরার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেলো। ফ্লোরা পালিয়ে যাবে এমন আশংকা তাদের আর রইলো না। প্রহরায়ও তারা নমনীয় হয়ে এলো। তা ছাড়া ফ্লোরা মিথ্যা কৌশলে নিজের মজলুম জীবনের গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে ওদের মনে নিজের ব্যাপারে সহানুভূতি সৃষ্টি করে নেয়।
একদিন ফ্লোরার বন্দিখানার দরজায় ৪০/৪৫ বছরের এক আলেমে দ্বীন এসে আওয়াজ দিলো। পরনে তার সবুজ আলখেল্লা। মাথায় পাগড়ি। হাতে দুটি কিতাব। প্রহরী এক মহিলা দরজা খুলে দিলো।
লোকটি সরকারি একটি কাগজ বের করে দেখালো। তাতে লেখা, এ লোক একজন আলেমে দ্বীন। ফ্লোরাকে ধর্মীয় দীক্ষা দিবে।
আলেম লোকটিকে ফ্লোরা পা থেকে মাথা পর্যন্ত এক নজর দেখলো। ফ্লোরার চেহারায় ঘৃণার ভাব ফুটে উঠলো। কিন্তু ফ্লোরা সেটা মুচকি হেসে মুছে ফেললো।
তুমি নাকি ইসলাম ধর্ম নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছো? আলেম লোকটি বললেন, কিন্তু এজন্য তোমাকে এমন শাস্তি দেয়া উচিত হয়নি। আসল অপরাধী তো প্রথমে তোমার বাপ তারপর তোমার মা। বসো এখানে।…
নিজের মন থেকে সব বোঝা নামিয়ে ফেলো। তোমার বয়স কম। এই বয়সে অনেকেই খোদাকে বাঁকা চোখে দেখে। কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে, নিজের রূপ যৌবন নিয়ে তুমি এতই গর্বোদ্ধত যে, ধর্মকে কিছুই মনে করছে না। আমার ধারণা কি সত্যি?
না। ফ্লোরা মুখের ঘৃণার ছাপকে মুচকি হাসিতে লুকিয়ে বললো, এই আমি প্রথম কোন পুরুষ দেখছি, যে আমার রূপ সম্পর্কে আমাকে নতুন কথা শোনালো। কিন্তু আমি এখনো কিশোরী। নিজেকে যুবতী মনে করি না। আমাকে কি আপনার কাছে বাচ্চা মনে হচ্ছে না?
হ্যাঁ, তুমি এখনো বাচ্চাই। সেই আলেম বললেন, এজন্যই আমি শুরুতে বলেছি তোমার অপরাধ ক্ষমার যোগ্য। তোমার বয়স বিবেচনা করে বিচারকের শাস্তি দেয়া উচিত হয়নি। যা হওয়ার হয়েছে। আমার ওপর নির্দেশ হলো, ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষায় তোমাকে আলোকিত করে তুলি যেন। তুমি কি মন থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে?
ফ্লোর বয়স যত স্বল্প তার বোধ-বুদ্ধি তত স্বল্প নয়। বরং বুদ্ধি ও চতুরতার দৌড়ে ফ্লোরা বয়স্ক মানুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
সে ভাবছে, নিজের রূপ দিয়ে এক তাগড়া যুবককে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছি। দেখা যাক, একে নিয়ে কী করা যায়। তবে এ যেহেতু আপদমস্তক ধার্মিক, তাই একে রূপের মায়ায় খুন করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। লাগুক সময়।
