বিচারকের হুকুম অনুযায়ী ফ্লোরাকে আলাদা এমন এক ঘরে রাখা হলো, যেখানে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা রক্ষা করা যাবে। তিনজন বিশ্বস্ত মহিলাকে ফ্লোরার বাপ ফ্লোরার প্রহরায় নিযুক্ত করলো।
বাপের অতি প্রিয় মেয়ে ছিলো ফ্লোরা। তাকে বাপ বেশ শান্ত মেয়ে মনে করতো। তার মাকে বলতো, মেয়েটি বেশ লাজুক। আমার সাথেও পর্দা করে। বাপ কখনো জানতে পারেনি, মা তার বাচ্চাকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক রূপসী কালনাগিনীরূপে গড়ে তুলছে।
বিচারককে মৃত্যুদন্ডের কথা শুনে ফ্লোরার বাপের মনে হলো, তার কলিজার একটি টুকরো কেউ কেটে নিয়েছে। মাসরূর ছট ফট করে উঠলো। সবচেয়ে আঘাত পেলো মাসরূর তার মনে। যে মেয়েকে এমন লাজুক, আর নিষ্পাপ মনে করতো, যাকে অন্যান্য সন্তানদের তুলনায় অধিক ভালোবাসতো সে মেয়ে এত বড় ইসলামের শত্রু!
তার মতো এমন বিচক্ষণ এক মুসলিম গোয়েন্দার কোলে এতদিন ধরে লালিত-পালিত হয়ে আসছে এক কালনাগিনী!
ফ্লোরার বাপ এই আঘাত আর সইতে পারলো না। এরপর দিনই তার মুখ ভরে রক্ত বমি হলো। চিকিৎসক পৌঁছার আগেই ফ্লোরার বাপ মাসরূর দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলো।
বদর ক্রোধে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে ফ্লোরার কাছে গিয়ে বললো, তোমার ব্যাপারে দুঃখ আর মানসিক আঘাত সইতে না পেরে আজ আমার বাবা মারা গেলেন।
দুঃখে শোকে আরো বহু মানুষই তো মারা যায়। ফ্লোরা তাচ্ছিল্যের সুরে বললো। সে মারা যাওয়াতে আমার এজন্য আফসোেস হচ্ছে যে, সে আমার বাপ ছিলো। কিন্তু যখন ভাবি সে একজন মুসলমান ছিলো তখন আমার আফসোস আর অবশিষ্ট থাকে না।
এর অর্থ হলো, তুমি সোজাপথে আসবে না। বদর রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো।
আমি সোজা পথেই যাচ্ছি। ফ্লোরা তিক্ত হেসে বললো। তোমরা এক বছর অপেক্ষা করে কী করবে? আজ আমার মুখ থেকে যা শুনছো এক বছর পরও তাই শুনবে। যদি শুনতাম আমাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে তাহলে এটা আমার জন্য বড়ই সৌভাগ্যের ব্যাপার হবে। আমি সরল পথের সন্ধান পেতে মৃত্যুর জন্য ব্যকুল হয়ে আছি।
এত সহজে তুমি মরবে না ফ্লোরা! বদর ক্রোধ যথাসম্ভব চেপে রেখে বললো। সেই মৃত্যু তোমার কখনো ঘটবে না যার জন্য তুমি ব্যকুল হয়ে আছো। তোমার জীবন এখন থেকে কাটবে বন্দি অবস্থায়। আমি তোমার ভাই। আমি এটা ফরজ মনে করছি যে, নিজের বোনকে তার মনের মধ্যে এটা গেঁথে দেয়া যে, বাতিলকে বুকে ধারণ করে তুমি দুনিয়াতেও শাস্তি পাবে এবং পরকালেও পাবে আরো কঠিনতর আযাব।
দুনিয়ার শাস্তিই আমাকে পরকালের শাস্তি থেকে বাঁচাবে। ফ্লোরা গর্বের সুরে বললো এবং প্রহরারত মহিলাদেরকে ডেকে বললো, তোমাদেরকে কি নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, এ ঘরে যাতে কেউ না আসে। ও কিভাবে এলো?
আরে মেয়ে এ তোমার ভাই এবং সেই তোমার বর্তমান অভিভাবক। ও তো যে কোন সময় এখানে আসতে পারবে।
ও আমার জন্য বেগানা পুরুষ। ফ্লোরা বললো, কোন মুসলমান কোন খ্রিষ্টানের ভাই বা বোন হতে পারে না। ওকে এই ঘর থেকে বের করে দাও।
পাগল মেয়ে এসব কী বলছো তুমি? এই ঘরের মালিক তো এখন তোমার এই ভাই! তাকে আমরা বের করবো কিভাবে?
বদর আর কিছু না বলে থমথমে মুখে ওখান থেকে চলে এলো।
বদর ওখান থেকে সোজা তার মায়ের ঘরে গেলো।
মা! বদর তার মাকে বললো, আমার তো মনে হচ্ছে ফ্লোরার মাথা তুমিই নষ্ট করেছে। বাবা আমাকে বলে গেছেন তুমি তাকে এত বছর থোকা দিয়ে এসেছে।
শোন বদর! মা বললো, আমি তোমার বাবাকে কোন ধোকা দেইনি। সে আমাকে কিছু মানবরূপী হিংস্র প্রাণী থেকে বাঁচিয়ে ছিলো। আমার কোন ঠিকানা ছিলো না। কোন আশ্রয় ও সহায় ছিলো না। তোমার বাপ আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। আমার ঠিকানা হয়েছে। তাই তাকেই আমি ভালোবেসেছি। এক দিকে ছিলো তার ভালোবাসা, আরেকদিকে আমার পূর্বপুরুষদের ধর্মের ভালোবাসা।..
এই উভয় ভালোবাসাই আমার বুকে ধারণ করে এই জীবনটা পার করে দিলাম। আর এর মধ্যে এক ভালোবাসা আমার মেয়ে ফ্লোরার হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছি। এখন তোমার বাবা চলে গেছে। এই ঘরে আমার আর এখন কোন কিছুই যেন নেই। আমি তোমার ছোট বোন বালদীকে সঙ্গে নিয়ে চলে যাচ্ছি।
কোন মা কি তার সন্তানকে এভাবে ছেড়ে যেতে পারে? সারা দুনিয়ায় এর কোন নজির আছে? তোমার বিকৃত ধর্মই তোমাকে এ অন্যায় কাজ করতে উৎসাহিত করছে। ধর্ম তো মানুষের সম্পর্কের বন্ধনকে আরো দৃঢ় করে। যে ধর্ম মানুষের সম্পর্ককে ছিন্ন করে, এমনকি মা সন্তানকে পৃথক করে সে ধর্ম অভিশাপ ছাড়া কিছুই না।
আমি এত কিছু বুঝি না। আমার সাথে থাকতে চাইলে আমার ধর্মে এসে যাও। মা বললো, আমি আমার ধর্মের জন্য আমার সন্তানকে বিসর্জন দিতে পারি।
তাহলে তো আমি আমার ধর্মের জন্য আমার মা ও দুই বোনকে বিসর্জন দিতে পারি। বদর চ্যালেঞ্জের সুলে বললো, যেতে চাইলে চলে যাও। আমার ঘরে আমি কালনাগিনীদের পালতে পারবো না। এমন নিষ্ঠুর মা বোনদের মুখও আমি দেখতে চাই না।
বদর অশ্রুসজল চোখে বেরিয়ে গেলো। পেছনে মায়ের মুখে বিদ্রুপের হাসি ছড়িয়ে পড়লো।
রাতে যখন সে ঘরে ফিরলো, তখন পুরো বাড়ি শূণ্য- খা খা করছে।
***
৭. ফ্লোরা এখন নজরবন্দি
ফ্লোরা এখন নজরবন্দি অবস্থায়ও বেশ শান্ত। প্রহরায় নিযুক্ত তিন মহিলা বেশ দুশ্চিন্তামুক্ত। ফ্লোরা তাদেরকে কোন পেরেশান করছে না। ওদেরকে এই মেয়ে সম্পর্কে যা বলা হয়েছে এতে ওরা ভেবেছিলো, এই মেয়ে ভয়ংকর কোন পাগল। যাকে কেউ সামলাতে পারছে না।
