যে কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার নেতা-নেতৃ ও ধর্মগুরুদের মধ্যে হুকুমতের লোভ ঢুকিয়ে দাও। ওরা পরস্পরকে হত্যা করতে দ্বিধা করবে না। তাদের জাতি না খেয়ে মরুক, চরিত্রহীনতার আস্তকুড়ে গিয়ে পড়ক, আত্মমর্যাদাবোধহীন হয়ে উঠুক এতে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই।
এখন এ দিকে মনোযোগ দিন। হাশিম বললো, এখনই আমি টলয়টায় যাচ্ছি। লোহা আরো উত্তপ্ত করে তুলতে হবে। এখন এই মেয়েকে সামলে রাখুন। আমি যাচ্ছি।
***
ফ্লোরার যুবক প্রতিবেশী তো তার ঘরে এসে গেলো। কিন্তু জীবিত নয়। তার লাশ আবাদীর মাঝখানে কোথাও পাওয়া যায়। এক লোক তাকে আবিস্কার করে। তার বুকের মাঝখানে তখন গভীর যখম। সে তোক তার লাশ ঘরে পৌঁছে দেয়।
বৃদ্ধ মা-বাবা তাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। চারপাশের বাড়ি ঘরে গভীর শোক নেমে আসে। কিন্তু কারো সন্দেহেও এটা আসার কথা নয় যে, ফ্লোরা তাকে হত্যা করতে পারে।
পরদিন সকালে ফ্লোরার বাপ ঘরে আসলে বদর তাকে গতকালের সব ঘটনা খুলে বললো, কাল গভীর রাতে ফ্লোরা পালিয়েছে।
ওর এভাবে পথভ্রষ্টতা আর পালানোর ব্যাপারে নিশ্চয় তোমার হাত রয়েছে। ফ্লোরার বাবা তার মাকে বললো। মনে হচ্ছে তুমি মুয়াল্লিদ-দুমুখো। বিশ বছর ধরে আমাকে ধোকা দিয়ে আসছে।
না, না। লিজা হাত জোড় করে স্বামীর পায়ের আছড়ে পড়লো এবং কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমাকে এভাবে অপবাদ দিয়ো না। আমি কখনো তোমাকে ধোকা দিতে পারবো না। আমাকে তোমার হাতে কতল করে দাওঃ কিন্তু আমার ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ করো না।
ও মনে হয় খ্রিষ্টান মেয়েদের সাথে উঠাবসা করেছে এবং ওরাই ওর মাথা বিগড়ে দিয়েছে। বদর ওকে জালিমদের মতো অনেক মেরেছে। এজন্যই ও পালিয়েছে। হায় ও না আবার নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করে বসে।
আমি ফ্লোরাকে বেশ কিছু দিন থেকে লক্ষ্য করেছি। বাবা মাসরূর বললো, এ মেয়ে আমার অন্য দুই মেয়ে থেকে একেবারেই অন্যরকম। ওকে আমি কখনোই নামাজ পড়তে দেখিনি।
মাসরূর খানিক চিন্তা করে বললো, আমি একজন গোয়েন্দা। আমি জানি সে কোথায় গিয়েছে?
মাসরূর ছেলে বদরকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। দুজনে দুই ঘোড়ায় সাওয়ার হলো। তারপর সেনা ব্রাকে গিয়ে সঙ্গে চারজন সেনা সদস্য নিয়ে নিলো। একটু পরই এক গির্জায় রেড করলো তারা। মাসরূর গির্জায় পাদ্রীকে বললো,
গতকাল রাতে আপনার এখানে এক যুবতী মেয়ে এসেছ। ওকে এখনই বের করুন।
আপনি গির্জা ও আমার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে দেখুন। কোন যুবতী মেয়ে দিয়ে আমার কী কাজ? পাদ্রী কিছুটা উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন।
পাদ্রীকে সেনা কর্মকর্তারা তাদের হেফাজতে নিয়ে নিলো। তারপর কর্ডোভার আরেকটি গির্জায় গেলো ওরা। কর্ডোভায় তখন দুটি গির্জায় ছিলো। এ গির্জার বৃদ্ধ পাদ্রীকে ফ্লোরা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে পাদ্রী কিছু জানে না বলে জানালেন।
আমরা জানি এসব গির্জা চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আচ্ছা ছাড়া কিছুই নয়। ফ্লোরার বাপ বলো।
কিন্তু কোন মেয়ের সাথে তো আমার কোন সম্পর্ক নেই। পাদ্রী ধমকের সুরে বললেন।
ওকে টেনে হেচড়ে নিয়ে চলো। এক ফৌজি কমান্ডার বললো।
দুজনকেই গ্রেফতার করে তাদের হেফাজতে নিয়ে নিলো। দুজনকে যখন ধাক্কা দিয়ে বললো এসো, তখন এক নারী কণ্ঠোর আওয়াজ ভেসে এলো।
আমার ধর্মপিতাকে ছেড়ে দাও। আমাকে গ্রেফতার করো।
সবাই তাকিয়ে দেখলো, ফ্লোরা গির্জার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। অতি কঠিন সুরে বললো,
উনাদের এই অপমান আমি সয্য করতে পারবো না। আমি নিজেই এখানে এসেছি।
***
বদর ফ্লোরার ওপর টুটে পড়লো। মারতে মারতে আধামরা করে ফেললো। কিন্তু ফ্লোরা কাঁদলো না। চিৎকার করলো না। শুধু বলতে থাকলো,
আমি খ্রিষ্টান। খ্রিষ্টবাদ আমার প্রাণ। আমি কুমারী মরিয়মের দাসী। এসব বলে বলে ইসলামের বিরুদ্ধে অবমাননাসূচক অনেক কিছুই বলে ফেললো।
থামো বদর! ফৌজি কমান্ডার বললো, ধর্ম তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ ব্যাপারে শাস্তি দেয়ার বিধান আমাদের এখানে নেই। তবে সে ইসলামের ব্যাপারে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করায় ইসলাম অবমাননার দায়ে সে অপরাধী। তাকে আমরা বিচারকের আদালতে পেশ করবো।
তাকে যখন বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো তখন সে চিৎকার করে করে ইসলামের বিরুদ্ধে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে করতে এক পর্যায়ে বললো,
আমার লজ্জা স্থান থেকে যা বের হয় ইসলাম তার চেয়ে নোংরা?
এজলাসে বসা মুসলমান খ্রিষ্টান প্রত্যেকে ছিঃ ছিঃ করে উঠলো। অনেকে দুআঙ্গুল দিয়ে কান বন্ধ করে বিস্ফোরিত চোখে ফ্লোরার দিকে তাকিয়ে রইলো।
কেউ কল্পনাও করতে পারেনি এমন রূপসী একটি মেয়ের মুখ দিয়ে এমন কদর্য কথা বেরোতে পারে।
বিচারক তখন ফায়সালা শোনালেন,
তুমি মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার উপযুক্ত কাজ করেছে। আর তোমার মতো এমন রূপসী মেয়েকে মুক্ত করে দিলে সেটা অনেক বড় ধ্বংসজ্ঞের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
মৃত্যুদন্ডের কথা শুনে ফ্লোর বাপ মাসরূরের মনে করুণার ঢেউ উঠলো। সে বিচারকের আদালতে আর্জি পেশ করলো,
আদালত যদি তাকে এবারের মতো ক্ষমা করে দেয় তাহলে আমি ওর দায়িত্ব নিতে পারি। এ আমার সন্তান। আমি ওকে সঠিক পথে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবো।
আদালত আবেদন মঞ্জুর করছে। বিচারক রায় শোনালেন, তবে এক বছরের জন্য ওকে ঘরের এমনভাবে নজরবন্দি করে রাখতে হবে যেখানে শুধু মহিলারাই প্রহরায় থাকবে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ইসলামের সঠিক শিক্ষা দেয়া হবে।
