দরজায় আওয়াজ শুনে হাশিম চমকে উঠলো। বিছানার নিচ থেকে খঞ্জর বের করে সাবধানে দরজা খুললো। গভীর রাতে তার দরজায় এক যুবতী মেয়েকে দেখে হকচকিয়ে গেলো।
আমি ফ্লোরা হাশিম! ফ্লোরা একথা বলে ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বললো,
পাশের বাড়ির এক মুসলিম যুবককে খুন করে এসেছি। আর ঘর থেকেও পালিয়ে এসেছি। এখন বলো কী করবো?
সে হাশিমকে পুরো ঘটনা শোনালো।
ফ্লোরা বহুবার হাশিমের বাড়ি এসেছে। ওর মা লিজা ওকে এখানে নিয়ে আসতো। ওকে হাশিম খ্রিষ্টবাদের শিক্ষা দিতো এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ ঢুকিয়ে দিতো। ওর ভেতরে এখন ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই নেই। আবেগ-ভালোবাসা এসবের যেন অস্তিত্বই নেই ওর ভেতরে। খ্রিষ্টবাদের সাথে ওর সম্পর্ক কোন ভালোবাসার নয়; বরং উন্মাদনার!।
আমি তোমাকে আমার কাছে রাখতে পারবো না। সকাল হতেই এখানে লোকজন বিভিন্ন কাজে আসা শুরু করবে। তোমাকে এক পাদ্রীর কাছে নিয়ে যাবো। তোমার মা তাকে চিনে। চলো। হাশিম বললো।
পাদ্রীর দরজায় শব্দ হলো। পাদ্রী ভয়ে কেঁপে উঠলেন। এত রাতে কে আসতে পারে? মারীদার বিদ্রোহের কারণে খ্রিষ্টান নেতাদের ধড়পাকড় চলছে। কাঁপা হাতে পাদ্রী দরজা খুললেন।
হাশিমকে দেখে পাদ্রী প্রাণ ফিরে পেলো। তার সঙ্গে সুদর্শন এক যুবক। পাদ্রীর অপরিচিত। ভেতরে গিয়ে ফ্লোরা পুরষালী আলখেল্লা খুলে ফেললো। মাথায় টুপি পরা ছিলো সেটাও নামিয়ে ফেললো।
এ হলো ফ্লোরা। হাশিম পাদ্রীকে বললো। এই মেয়ে আজ ওর বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে এবং আসার সময় এক মুসলিম যুবককে কতল করে এসেছে।
হাশিম পাদ্রীকে সেদিনের পুরো ঘটনা শোনালো।
বুড়ো পাদ্রী ফ্লোরার রূপ দেখে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন।
তুমি রূপের এক বিস্ময়কর নমুনা। পাদ্রী বললেন, উন্দলুসের ঐ মুসলিম বাদশাহদের ধ্বংসের ব্যাপারে তুমি তো অনেক বড় অবদান রাখতে পারবে। তুমি সালারদেরকে একে অপরের শত্রু বানাতে পারবে। তোমার একটু মুচকি হাসি মুসলিম সালারদেরকে যুদ্ধের ময়দান থেকে আমাদের কাছে বন্দি করে নিয়ে আসতে পারবে।…
বর্তমান শাহে উন্দলুস আব্দুর রহমান তোমার মতো রূপবর্তী মেয়ে দেখে তো পুরো উন্দলুস মন থেকে দূর করে দেবে। এটা তার এক দারুণ দুর্বলতা। তুমি তার ও সালারদের মধ্যে দ্বন্ধ সৃষ্টি করতে পারবে….। কিন্তু তোমাকে তোমার….
আমাকে আমার সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে হবে। ফ্লোরা পাদ্রীর কথা কেড়ে নিয়ে বললো। কিন্তু মনে রাখবেন আমি আজীবন কুমারী থাকতে চাই। আমি মরিয়ম কুমারীর দাসী। আমি জানি, মুসলমান উমারা, রঈস ও ওযীরদের মধ্যে অনেক বড় ত্রুটি হলো, ওরা সুন্দরী মেয়ে দেখলে নিজেদের সব দায়-দায়িত্ব ভুলে যায়। কিন্তু আমি কোন মুসলমানের গন্ধও সইতে পারবো না।
আমাদেরকে ভাবতে দাও ফ্লোরা! পাদ্রী বললেন, এখানে তুমি সব দিক থেকে নিরাপদ থাকবে। মনের উত্তেজনাকে দূর করো। জযবায় উম্মাতাল হওয়া ভালো নয়। তিনি হাশিমকে জিজ্ঞেস করলেন, আর কোন খবর?
লোহা এখনো গরম আছে। হাশিম বললো, আমি লোহার মিস্ত্রী কামার। লোহা কখন শীতল হবে সেই প্রতীক্ষা আমি করি না। উত্তপ্ত থাকতে লোহা দিয়ে যা ইচ্ছা তাই বানানো যায়। মারীদা থেকে অনেক খ্রিষ্টান পালিয়ে টলয়টায় পৌঁছে গেছে। আমার লোকজন ওখানে চলে গেছে। ওরা আমাকে ওদের নেতৃত্ব দিতে চাচ্ছে। আমি ভাবছি।
এত ভাববার সময় নেই হাশিম। পাদ্রী বললেন, পরিকল্পনার সবটাই যেহেতু তোমার, নেতৃত্বও তোমার হওয়া উচিত। আমি জানি, তুমি লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিতে পারবে না। কিন্তু যে বুদ্ধিমত্তা ও তীক্ষ্মতা তোমার রয়েছে সেটা আর অন্য কারো মধ্যে নেই।
ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের মনোবল ও জযবায় তুমি যেভাবে প্রাণ সঞ্চার করতে পারো সেটা আর অন্য কেউ পারে না। তুমি টয়টা থেকে ঘুরে আসো। ওখানে ইউগেলিস ও ইলওয়ারকে যে কোন ছদ্মবেশে পেয়ে যেতে পারো।
সামান্য কিছু সময় আগে আমার কাছে খবর পৌঁছেছে যে, আমীরে উন্দলুস আনন্দ-উৎসবে মতোয়ারা হয়ে আছে। পাদ্রী বললেন, আর সুলতানা আজ রাতে নতুন শরবতের উপকরণ দিয়ে তাকে প্রথম বারের মতো শরাব পান করাতে যাচ্ছে। আমীরে উন্দলুস অতি ভোগ বিলাস প্রিয়। কিন্তু শরাব পান করে না।
আমাদের দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, আমীরে উন্দলুসের ওপর তার সবচেয়ে রূপসী স্ত্রী মুদ্দাসসিরা বেশ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। সুলতানা আজ রাতে ঐ বিশেষ ধরণের শরবত পান করিয়ে সেই প্রভাব নামিয়ে ফেলবে।
এই আমীরের ব্যাপারে আমাদের কোন ভয় নেই। হাশিম বললো, আমাদের ভয় হলো ঐ সালারদেরকে নিয়ে। এই সালাররা এমন যে, ওদের সামনে সোনার স্তূপ রেখে দাও, ফ্লোরার মতো সুন্দরী মেয়েদেরকে ওদের শয়নকক্ষে ঢুকিয়ে দাও, ওই হতভাগারা শিলাপাথরের চেয়ে কঠিন হয়ে যাবে। স্বাধীনতার চেতনাকে ওরা ওদের ঈমান বানিয়ে নিয়েছে।
এসব সালারদের মধ্যে যদি সিংহাসন আর নেতৃত্বের লোভ ঢুকিয়ে দেয়া যায় তাহলে ওদের ফৌজকে অল্প সময়েই ময়দান থেকে তাড়িয়ে দেয়া যাবে। পাদ্রী বললেন, কোন সালার যখন সিংহাসনে বসতে পারে তখন সে পুরোপুরি বাদশাহ বনে যায়। নিজের বাদশাহী স্থায়ী করার জন্য শত্রুকেও বন্ধু মনে করে। যা ইচ্ছা তাই করে বেড়ায়। তারপর আর তার কোন ধর্ম বা জাতীয়তাবোধ থাকে না।…
