এই প্রথম ওকে এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছে। যুবকের চোখে মুখে চরম ক্ষুধার ভাব ফুটে উঠলো। এই মধ্য রাতে একলা ফ্লোরা তো তার দয়ার ওপরই বেঁচে থাকবে।
কেন এসেছো?
তোমার সাথে দেখা করতে। ফ্লোরা বললো এবং যুবকের ডান হাত তার দুহাতে তুলে নিয়ে চুমু খেলো এবং আবেগী গলায় বললো, নিজের মনে অনেক পাথর চাপা দেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তোমার ভালোবাসাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারিনি।
এই মাত্র ঘুমে তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি। চোখ খুলেই টের পাই ভীষণ ঘাবড়ে গেছি। জানি না কিসে আমাকে ওই জানালা দিয়ে নামিয়ে তোমাদের ছাদের ওপর রেখে গিয়েছে। এসো কাছে এসো।
ফ্লোরার রূপ যৌবনের তীব্র আচ এই উঠতি যুবক কি করে সহ্য করবে। তার সব বোধ বুদ্ধি নিমিষেই উড়ে গেলো। ফ্লোরাকে সে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো। ফ্লোরা তাকে বললো,
চলো, বাইরে চলো। আমাদের বাড়ির কেউ জেগে উঠল বড় বিপদ সামলাতে হবে। আর তোমার বাড়ির লোকজনের সামনেও পড়া যাবে না। তাই তাড়তাড়ি চলো।
দুজনে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো।
যুবক খুব সাবধানে বাড়ির প্রধান দরজা খুললো। তার বৃদ্ধ মা-বাবা মোটেও টের পেলো না। দুজনে বের হয়ে গেলো। সে আগে এবং ফ্লোরা পেছনে।
কোথায় যাবে? যুবক জিজ্ঞে করলো।
ঐ দিকে। ফ্লোরা একদিকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলো।
যুবক সেদিকে হাটা দিলো। ফ্লোরা তার এক দুই কদম পেছনে। সে খাপ থেকে খঞ্জর বের করে নিলো। তারপর একটু এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে তার দিকে ঘোরালো। যুবক ভেবেছে, মেয়েটি বুঝি তাকে ভালবেসে তার দিকে আকর্ষণ করেছে। এজন্য সে ফ্লোরার স্পর্শ পেতেই আবেগে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
কিন্তু ফ্লোরা বিলম্ব না করে তার কাজ সেরে ফেললো। যুবকটি তার দিকে ঘুরতেই খঞ্জরটি সজোরে তার বুকে বিদ্ধ করে দিলো। এত জোড়ে খঞ্জর তার বুকে বিদ্ধ করেছে যে সেটা টেনে খুলতে ফ্লোরার বেশ জোর প্রয়োগ করতে হলো।
যুবকের মুখ থেকে একটু ভোঁতা শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ বেরোলো। সে বুকে হাত রেখে উপুড় হয়ে পড়ে গেলো।
তোমাদেরকে আমি ঘৃণা করি, ঘৃণা… ঘৃণা…।
ফ্লোরা রক্ত ভেজা খঞ্জরটি মাটিতে ঘষতে ঘষতে বললো এবং লাশের গায়ে লাথি মেরে দ্রুত ছুটতে শুরু করলো।
***
আমীরে উন্দলুসের মহলে এই মধ্য রাতেও যেন রাত নামেনি। ভেতরে রঙবেরঙের ফানুস আর চোখ ধাঁধানো আলোক সজ্জা রাতকে দিনে রূপান্তরিত করেছে। প্রথমে তিন কবি পালা করে আমীরে উন্দলুসের নামে কবিতা আবৃত্তি করলো। তাকে সপ্ত মহাদেশের বাদশাহ বানিয়ে দিলো। তার তলোয়ারকে হযরত আলী র. এর তলোয়ারের সঙ্গে তুলনা করা হলো।
বলা হলো, ইহুদী-খ্রিষ্টান তো আপনার সামনে কীটপতঙ্গ ছাড়া আর কিছুই নয়, তাদেরকে আপনি পায়ে পিষ্ঠ করে এগিয়ে চলেছেন দূরন্ত গতিতে।
একজন বললো, আপনার সামনে যে মাথা তুললো তার মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেলো। যদি আপনার প্রতিমূর্তি পেতাম তাহলে আমারা তার ইবাদত করতাম।
তারপর চাটুকার আমীর-উমারারা তোহফা পেশ করলো। তার হাত চুম্বন করলো। কেউ তার জুতাকেও চুমু খেলো। তারপর অর্ধউলঙ্গ নর্তকীরা নৃত্য পরিবেশন করলো। এর সঙ্গে চললো যারিয়াবের উম্মাতাল করা সঙ্গীত।
আব্দুর রহমানের ডান দিকে সুলতানা এবং বাম দিকে মুদ্দাসসিরা বসেছে। তাদের পেছনে অন্যান্য স্ত্রী ও হেরেমের রূপসী কিছু মেয়ে বসে আছে। এই উৎসব সভায় সেনাবাহিনীর সব সালারও আছে। তারা অপলক চোখে তাদের আমীরকে দেখছে। তাদের কাছে মনে হচ্ছে এই আব্দুর রহমান অন্য কোন মানুষ।
এই লোককে আমাদের সবসময় রণাঙ্গনেই ধরে রাখতে হবে। সালার আব্দুর রউফ তার সঙ্গী সালারদেরকে বললেন।
তার মতো ইসলামী সালতানাতের আমীরের এভাবে ভোগমত্ততয়ায় ডুবে থাকা কখনো বৈধ হতে পারে না। সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ বললেন, এসব কবি আর চাটুকাররা এই একজন মানুষের ওপর নিজেদের অসংখ্য শব্দ জাদু দিয়ে নেশাগ্রস্ত করছে আর ইসলামী সালতানাতের শিকড় উপড়ে ফেলছে। তোমরা দেখো গিয়ে আমাদের দুশমনরা পরিকল্পনা করছে, কিভাবে প্রতিশোধমূলক আঘাত হানা যায়। ওরা মদ আর নর্তকী নিয়ে মাতলামি করছে না।
আমার তো মনে হচ্ছে, এবার টয়টায় খ্রিষ্টানরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। সালার মূসা ইবনে মুসা বললেন, এখন থেকেই আমাদের পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রাখতে হবে। বিদ্রোহ হলে কী উপায়ে তা দমন করা হবে।
এরা মাথা চাড়া দিয়ে যাতে না উঠতে পারে এর জন্য এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। সিপাহসালার উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ বললেন, এর একমাত্র উপায় হলো, ফ্রান্সের ওপর হামলা। শাহ লুইকে খতম করা। সেই উন্দলুসের খ্রিষ্টানদেরকে গোপনে মদদ জুগিয়ে যাচ্ছে। সেই উন্দলুসকে খন্ড বিখন্ড করার ঘৃণ্য চক্রান্তের জাল এখানে বিস্তার করে চলেছে। এদেরকে এক জায়গায়, দমন করা হলে আরেক জায়গায় গিয়ে মাথা তুলে।
***
এ দিকে যখন আমীরে উন্দলুসের দরবারে মদমত্ত নতৰ্কীদের উদ্দাম নৃত্য চলছে তখন হাশিম কামারের দরজার কড়া নড়ে উঠলো। হাশিম কামার এখন প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে গেছে। তবে তার মাথা এখন আরো তীক্ষ্ম হয়ে উঠেছে।
তার গোপন সন্ত্রাসীদল এখন আরো বড় ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মারীদার বিদ্রোহ দমনের পরই তার সন্ত্রাসী বাহিনীর এক অংশকে সে টলয়টায় পাঠিয়ে দিয়েছে।
