একথা বলে ফ্লোরা ইসলামের বিরুদ্ধে অতি অপমানসূচক কিছু কথা বলে ফেললো। বদর রাগে লাল হয়ে উঠলো। ফ্লোরার মুখে এত জোড়ে চড় বসিয়ে দিলো যে, সে ছিটকে গিয়ে ঘরের দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেলো এবং পড়ে গেলো।
মেয়েদের মতো ইনিয়ে বিনিয়ে কান্নাকাটি বা অভিমান কিছুই করলো না সে।
ফ্লোরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো এবং অন্য কামরার দিকে দৌড়ে গেলো। সে কামরার একটি তলোয়অর ও দুটি বর্শা রাখা আছে।
বদর ও তার পিছু পিছু সে কামরায় ছুটে গেলো। ফ্লোরা খাপ থেকে তলোয়ার বের করছিলো। বদর তার হাত থেকে তোয়ার কেড়ে নিয়ে এমন শক্ত পিটুনি দিলো যে, ফ্লোরা খাটের ওপর গড়িয়ে পড়লো। মা ও ফ্লোরার আরেক বোন যার বয়স পনের, দুজনে মিলেও বদরকে নিরস্ত্র করতে পারলো না। ফ্লোরা প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলো। তার মা হাউমাউ করে তার ওপর গড়িয়ে পড়লো।
***
বদর তার মাকে সেখান থেকে টেনে তুললো এবং মাকে নিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর দরজায় শিকল চড়িয়ে দিলো। অন্য ঘরে গিয়ে মাকে সামনে বসালো।
মা! খ্রিষ্টবাদের ব্যাপারে ওর মনে এমন গোঁড়ামি কোত্থেকে আসলো? বদর জিজ্ঞেস করলো, তুমি নিশ্চয়ই জানো মা! মা মেয়ের সবকিছুই জানে।
বদর তার বোনকেও জিজ্ঞেস করলো,
তুমি কিছু বলতে পারবে?
ওর ছোট বোন কিছুই জানে না বলে বললো। মাও একই জবাব দিলো।
তুমি কিছুই জানো না এতটুকু জবাব দিয়েই কি বাবাকে তুমি সন্তষ্ট করতে পারবে মা! বদর বললো, নিশ্চয় গোপনে কোন খ্রিষ্টানের সঙ্গে ওর সাক্ষাত হয়েছে। কোন মুসলমানের সঙ্গে ওর সম্পর্ক থাকলে সে নিশ্চয় বলতো, খ্রিষ্টানদেরকে কেন এভাবে হত্যা করা হয়েছে? আর এটা পাইকারি দরে হত্যা নয়, বরং এটা ছিলো দুপক্ষের যুদ্ধ। ওরা ওদের ধর্মের পক্ষে লড়াই করেছে। মুসলমানরাও নিজেদের ধর্মের পক্ষে লড়াই করেছে।
ওদের কাছে যেমন অস্ত্র আছে তেমনি আমাদের সেনাবাহিনীর কাছেও অস্ত্র আছে। মারীদায় কী হয়েছিলো? তোমার জন্মভূমি ক্যথলিনিয়ার কাহিনী আমাকে শুনিয়েছিলে। ওখানে আগে কারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলো? টলায়টায় কী হয়েছিলো?…..
আমরা মুসলমান মা! মুসলমানের দায়িত্ব হলো, ইসলামকে সবার কাছে বিস্তার করা। পবিত্র কুরআন মুসলমানদেরকে হুকুম দিয়েছে, কুফুরের ফেতনা খতম করতে লড়াই করে যাও যে পর্যন্ত ওদরে তৎপরতা অব্যহত থাকবে।
কান্না ছাড়া ওর মা আর কোন জবাব দিলো না।
আব্লু কাল সকালেই আসছেন। এর আগ পর্যন্ত ও ওখানেই বন্ধি থাকবে। বদর তার মাকে বললো।
সে রাতের ঘটনা। ফ্লোরা সে কামরায় বন্ধ। রাতে ওর ছোট বোন খাবার নিয়ে গিয়েছিলো। ফ্লোরা খাবার খায়নি। সে বলে দেয়, এ বাড়ির খাবার তো দূরের কথা পানিকেও সে হারাম মনে করে। ওর মাও একবার চেষ্টা করে দেখেছে। ফ্লোরা খায়নি।
রাতে সে ঘুমায়নি। মাঝ রাতের দিকে উঠে বন্ধ দরজায় কান লাগালো। সে কামরায় তার মা বোন ও পাশের কামরায় তার ভাই ঘুমুচ্ছে। তাদের ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফ্লোরা ঘরের জানালার পাল্লা খুললো। পাল্লায় লোহা বা কাঠের গারদ।
এটা দ্বিতীয় তলা। এখান থেকে নিচে নামা ওর জন্য বেশ কঠিন ব্যাপার। জানালা বরাবর সোজা নিচের দিকে একটু পর পর কিছু ইট বেরিয়ে আছে। বাড়তি ইটের মধ্যে পুরো পা রাখা যাবে না। বাড়তি ইটে পায়ের পাতা মাত্র রাখা যাবে।
ফ্লোরার এখন আর মরার ভয় নেই। সে তো মুসলমানদের বিরুদ্ধে জানবাজি রাখার সংকল্প করে নিয়েছে। সে খুব সাবধানে অতি ধীরে ধীরে খাজ কাটা ইটগুলোতে পা রেখে রেখে এবং দেয়ালের খাজে ধরে ধরে নিচের দিকে নেমে যেতে লাগলো।
একেবারে লাগোয়া বাড়িটি এক তলা। সে এবাড়ির ছাদে পৌঁছে গেলো। এখন কাজ হলো এখান থেকে নামা। সে ওপর থেকে বাড়ির উঠানের অবস্থা দেখে নিলো। কাঠের একটি সিঁড়ি রয়েছে। পূর্ণ চাঁদনী রাত। চাঁদের আলোয় এ সিঁড়ি দিয়ে সহজেই নিচে নামা যাবে। তারপর উঠোন পেরিয়ে গেট খুলে বাইরে চলে যাওয়া যাবে।
এই বাড়িতে এক বৃদ্ধ মুসলমান ও তার স্ত্রী এবং তার এক যুবক ছেলে থাকে। ভয় এই যুবক ছেলেটিকে নিয়ে। ফ্লোরা তার জামার নিচে একটি খঞ্জর নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এটা দিয়ে এমন তাগড়া যুবকের বিরুদ্ধে লড়া প্রায় অসম্ভব।
হঠাৎ তার সামনে থেকে মূর্তিমান এক আতংক উঠে আসতে লাগলো। এই যুবক ছেলে সম্ভবত ছাদে কারো পায়ের আওয়াজে জেগে উঠেছিলো। কিংবা বিনা কারণেই হয়তো সে ছাদে আসছে। যুবক সিঁড়ির কাছে আসতেই ফ্লোরা পিছু হটতে গেলো।
কিন্তু যুবক তাকে দেখে ফেললো। যুবকটি এও দেখেছে এ কোন পুরুষ নয়, মেয়ে। সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে লাগলো। ফ্লোরার মাথাটা ঘুরে গেলো। পালানোর কোন পথ নেই।
আচমকা একটা কথা তার সাহস বাড়িয়ে দিলো। যুবক সিঁড়ি বেয়ে আসছে। ফ্লোরা পা টিপে টিপে দ্রুত সিঁড়ির কাছে চলে গেলো। সিঁড়ির হাতল ধরে মুখ ও মাথা ঝুঁকিয়ে ফিস ফিস করে বললো,
বেশি শব্দ করো না। আমি ফ্লোরা?
ফ্লোরা? নামটা শুনেই লোকটা চমকে উঠলো। এসময় তুমি এখানে কী করছো?
ওপরে এসো বেওকুফ! মুখ বন্ধ রাখো। ফ্লোরা ফিস ফিস করে বললো।
ফ্লোরা জানে সে অসম্ভব রূপবর্তী একটি মেয়ে। এধরনের ছেলেরা তাকে দেখলে আর চোখ ফেরাতে পারে না। এই যুবক তো ওকে এর আগে অনেকবারই দেখেছে। তবে দূরে থেকে।
