আমি আমার স্বামী থেকে মুক্ত হতেও চাই না। লিজা বললো। খ্রিষ্টবাদকে আমি যতটুকু ভালবাসি, মাসরূরকেও আমি ততটুকুই ভালোবাসি। আমি আমার স্বামীর সঙ্গে থেকেই খ্রিষ্টবাদের জন্য কিছু একটা করতে চাই। নইলে এই স্বপ্ন আমাকে পাগল করে দেবে।
তুমি তোমার সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছে। সে মেয়ে হোক ছেলে হোক, যেভাবেই হোক লুকিয়ে ছাপিয়ে ওকে ঈসায়্যিাতের শিক্ষা দেবে। হাশিম গম্ভীর গলায় বললো, ওর মনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা সৃষ্টি করে দেবে এবং তাকে সব ধরণের স্বাধীনতা দেবে। তবে এরপরে কোন সন্তান জন্মালে তাকে আবার এ শিক্ষা দেয়ার ঝুঁকি নেবে না। তাহলে ওর বাবা সেটা জেনে যাবে। সেটা নিশ্চয় তোমার জন্য ভয়াবহ ব্যাপার হবে।….
যে সন্তানকে তুমি খ্রিষ্টবাদের শিক্ষা-দীক্ষা দেবে সে নিজের রাস্তা নিজেই তৈরি করে নেবে। সেটাই তোমার মনের প্রশান্তির খোরাক জোগাবে।..
তুমি কিছু করতে চাইলে এটা করতে পারো তোমার স্বামীর কাছ থেকে যতটা পারো গোয়েন্দা তথ্য কলা কৌশলে জেনে নিতে পারো। ওকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাও। আমাদের ব্যাপারে কোন তথ্য যদি জানতে পারো সেটা যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কানে পৌঁছে দেবে।
লিজার স্বামী মাসরূরের মতো এমন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা- যার দৃষ্টি মাটির গভীরতাকেও ভেদ করে যেতো তারও এতটুকু সন্দেহ হলো না যে, তারই ঘরে তারই ভালোবাসার পর্দার আড়ালে ইসলামের এক চরম ঘাতিনী-কালনাগিনী পরিপালিত হচ্ছে।
ফ্লোরার জন্ম হলো! তার বাবা যে তার ইসলামী নাম রেখেছিলো সেটা ইতিহাসের কোথাও পাওয়া যায় না। তার মা-ই তার নাম রাখে ফ্লোরা। ফ্লোরা যখন কিছুটা বুঝতে শিখলো তখন থেকেই তার মা তাকে বুঝাতে শুরু করলো, সত্য ধর্ম একমাত্র ঈসা মাসীহের ধর্ম। আর ইসলাম কোন ধর্মই নয়।
ফ্লোরার এক বছর হতেই তার আরেকটি ভাই হলো। তার নাম রাখা হলো বদর। বদর শৈশব থেকেই তার বাবার প্রভাব গ্রহণ করা শুরু করলো।
তের চৌদ্দ বছর বয়সে ফ্লোর মন মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমন ঘৃণা পূর্ণ হয়ে গেলো যে, সে তার বাপকে বাপ এবং ভাইকে ভাই মনে করা ছেড়ে দিলো।
খ্রিষ্টান মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে খ্রিষ্টানদের ওপর মুসলমানদের অত্যাচারের আজগুবি গল্প-কাহিনী শোনাতো। ফ্লোরার মা লিজা এগুলো শোনাতো তার মেয়েকে।
তবে মা ফ্লোরাকে বাইরে বের হতে দিতো না। ভয় হলো, সে তার মার দুমুখো মুখোশের কথা ফাঁস করে দিবে।
ফ্লোরা এখন আঠার বছরের আগুন ধরা অতি রূপবর্তী এক মেয়ে। খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে আমীরে উন্দলুস আব্দুর রহমান ও তার ফৌজের বিজয় রথ দেখছে। বহু লোকের দৃষ্টি ফ্লোরার রূপসী মুখে আটকে গেছে।
তার চোখে ঘৃণা আর ক্ষোভ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। মা তাকে বারবার বলছে। সে যেন অন্যান্য মেয়েদের মতো নীচে ফুল ছুঁড়ে দেয়, হাত নাড়ে। ফ্লোরা মায়ের কথায় তার দিকে আগুন চোখে তাকালো। সব রাগ ঘৃণা মায়ের ওপর ঢেলে দিয়ে বললো,
যারা মারীদার খ্রিষ্টানদের পাইকারী দরে হত্যা করেছে তাদের ওপর আমি ফুল বর্ষণ করবো?
তোমার রাগ নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করো ফ্লোরা। মা বললো।
মা! আমি আর এখন এই ঘরে থাকতে পারবো না। ফ্লোরা জানালার কপাট বন্ধ করতে করতে বললো।
আরে বোকা! তুমি যাবেই বা কোথায়? মা বললো।
কোন গির্জায় চলে যাবো। আমি যদি এই বাড়িতে থাকি তাহলে যেকোন সময় আমার বাপ-ভাইকে হত্যা করে ফেলবো। ফ্লোরা বললো উত্তেজিত কণ্ঠে।
মা তার মুখে সজোরে চড় মারলো এবং বললো,
আমি তোকে খ্রিষ্টবাদের শিক্ষা কি এজন্য দিয়েছি যে, তুই তোর বাপ-ভাইকে কতল করার কথা মুখে আনবি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ফ্লোরা ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললো, এ শিক্ষা আমাকে তুমিই দিয়েছে যে, মুসলমানরা অতি হিংস্র এবং লুটেরা। ওরা খ্রিষ্টানদের চির শত্রু।
মায়ের দুচোখ অশ্রুতে ভরে গেলো। নিজের ভুলের উপলব্ধি তার একটু একটু করে অনুভূত হতে লাগলো।
আমি তো তোকে খ্রিষ্টান এজন্যই বানিয়েছি যে, তোকে কোন খ্রিষ্টান ছেলের হাতে গোপনে তুলে দেবো। সে তোকে বিয়ে করে পালিয়ে যাবে। মা বললো, আমি তো শুধু আমার এক সন্তানকেই খ্রিষ্টান বানাতে চেয়েছিরাম। আর তুই তো আমাকে তোর বাপ থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে ছাড়বি।
আমি খ্রিষ্টান মা! খ্রিষ্টান আমি। এটা মুসলমানের বাড়ি। এই বাড়িকে আমি ঘৃণা করি। ফ্লোরা বললো উত্তপ্ত কণ্ঠে।
এসময় কামরায় এক পুরুষ কণ্ঠের গর্জন শোনা গেলো, কি বললি তুই? তুই খ্রিষ্টান?
মা মেয়ে চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালো। সেখানে ফ্লোরার ছোট ভাই বদর দাঁড়িয়ে ফনা তোলা সাপের মতো ফুঁসছে। সে যে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে এসেছে সেটা মা মেয়ে কেউ টের পায়নি। সে মায়ের কোন কথা শুনতে পায়নি। ফ্লোরার কথা আমি খ্রিষ্টান শুধু এতটুকুই শুনেছে।
বদরের বয়স সতের বছর। এই বয়সেই বাপের মতো বিশালকায় হয়ে উঠেছে। দেখতে বেশ তাগড়া সুদর্শন যুবক। সে মা ও মেয়ের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো।
ও অন্য কারো কথা বলছিলো বেটা! আমি তোমাকে বলছি। মা বদরকে বললো।
আমি ওকে বলছি ফ্লোরা বললো, তুমি মিথ্যা বলছো মা? সে বদরের দিকে ফিরে বললো, আমি সত্যিই খ্রিষ্টান। আমি আমার ধর্মের হত্যাকারীদের ধর্ম কখনোই গ্রহণ করতে পারবো না।
