আমি যদি আমার সম্পর্কে কিছু বলি তাহলে হয়তো তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে। ঘর যেমন তোমার জ্বলেছিলো তেমন আমারও জ্বলেছিলো। এটা টলয়টার ঘটনা। তখন বর্তমান আমীরে উন্দলুসের পিতা আলহাকাম ছিলেন আমীরে উন্দলুস।
এটা ৮১৩ খ্রিষ্টাব্দের কথা। টলয়টার খ্রিষ্টানরা বিদ্রোহ করে বসে। আলহাকাম বড় কঠোর হুকুম জারি করেন। সারা শহরে আগুন লাগিয়ে দেন।
ক্যথলিনিয়ায় তোমাদের সঙ্গে যা হয়েছিলো এখানেও তাই হয়। সৈন্যরা শহরের বাড়ি-ঘরগুলোতে আগুন লাগাতে শুরু করলো। আমার ঘরে যখন আগুন লাগাতে আসলো আমি তাদেরকে বললাম, আমি মুসলমান। নওমুসলিম। তারা বললো, তুমি মুওয়াল্লিদ।
মুওয়াল্লিদের অর্থ জানো? আরবী শব্দ। অর্থ দুমুখী। অর্থাৎ যে এক ধর্ম ছেড়ে অন্য ধর্ম গ্রহণ করে; কিন্তু গোপনে পূর্ব ধর্মের প্রতি অনুগত থাকে। আমি সৈনিকদেরকে বললাম, আমার বাড়ি তল্লাশি করে দেখো। কুরআন শরীফ ছাড়া ভিন্ন ধর্মের কোনো চিহ্নও খুঁজে পাবে না।
কিন্তু ওরা আমার কথা বিশ্বাস করলো না। আমার ঘরের বাইরে বিদ্রোহীদের হাতে লেখা একটা লিফলেট পেলো। এতেই ওরা নিশ্চিতভাবে ধরে নিলো আমি শুধু মুওয়াল্লিদই নয়, বিদ্রোহীও।
অনেক নওমুসলিমই মুওয়ালিদ ছিলো এবং এটাও ঠিক যে, ওরাই বিদ্রোহের আগুন উস্কে দিয়েছে। সৈনিকরা আমার ঘরেও আগুন দিলো। আমার স্ত্রী ও দুই সন্তান ঘর থেকে বের হলেও ছুটন্ত ঘোড়ার পায়ের নিচে পড়ে চরমভাবে আহত হয়। পরে আর ওদেরকে মুসলিম ডাক্তাররাও শত চেষ্টা করে বাঁচাতে পারেনি।
ঘর হারা-স্বজনহারা এক নিঃস্ব মানুষ হয়ে গেলাম আমি। তারপর এ আশায় কর্ডোভায় এলাম, কোন হাকিমের মাধ্যমে আমীরে উন্দলুসের দরবারে গিয়ে আমার অসহায়ত্বের কথা জানাবো। তাকে আমি ফরিয়াদ জানিয়ে বলবো, আমার প্রতি জুলুম করা হয়েছে। কিন্তু মহল পর্যন্ত পৌঁছার কোন প্রভাবশালী মাধ্যম আমি পেলাম না।
আল হাকাম ছিলেন বিলাসপ্রিয় বাদশাহ। তার দরবার ভরে থাকতে চাটুকারদের দলে। গায়করা গান করলে তারই প্রশংসাগীত গাইতো। কবিরা কবিতা রচনা করতো তাকে খোদার স্তরে পৌঁছে দিয়ে। প্রজারা বাঁচুক মরুক তাতে তার কিছু আসে যায় না। আমাকে বেঁচে থাকতে হতো। কামারের কাজ জানতাম, তাই এটাই শুরু করে দিলাম।
এখন তোমার অবস্থা কী? তুমি এখন কী চাও? লিজা জিজ্ঞেষ করলো।
দেখো মেয়ে! আমাকে আমার ব্যাপারে বেশি প্রশ্ন করো না। তুমি এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার স্ত্রী। তোমার স্বামীর কানে যদি আমার কথা সামান্য পৌঁছে তাহলে আমাকে গ্রেফতার করা হবে।……..
চার দিকে চক্রান্ত ও বিদ্রোহ দানা বাঁধছে। যাকেই সামান্যতম সন্দেহ হয় তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। একটা কথা মনে রেখো, তোমার স্বামীর গোয়েন্দার কথা আমাকে বলে তুমি খুব ভুল করেছে। গোয়েন্দারা নিজেদেরকে পর্দার আড়ালে রাখে।….
তুমি আমাকে তোমার স্বামী সম্পর্কে বলে দিয়েছো খবরদার সেটা কিন্তু তাকে আবার বলতে যেয়ো না। অন্য কাউকেও জানাবে না এসব কথা। আমি তোমাকে বলছিলাম, সেসব কথা তোমার স্বামীকে বলতে পারছে না সেগুলো আমাকে বলতে পারো। তোমাকে আমি আমার মেয়ে বা বোনের মতোই দেখবো। আমি যেহেতু ক্ষত-বিক্ষত মনের মানুষ তাই তোমার মনের দুঃখ আমিই বুঝতে পারবো।
তুমি তো আবার আমার স্বামীকে বলে দিবে না তার ব্যাপারে তোমার সঙ্গে আমি আলাপ করেছি?
না, আমি তোমাকে ধোঁকা দেবো না। তোমাকে আমি পরামর্শ দিচ্ছি, তুমি নিয়মিত আমার কাছে আসা যাওয়া করো। আমি একাই থাকি। দুনিয়ায় আমার আর কেউ নেই। সত্য বলতে কি আমার কোন ধর্মও নেই।
মুসলিম সেনারা আমার সঙ্গে যা করেছে তা হয়তো আমি কোন দিন ভুলতে পারবো না। দেখা যায়, ধর্মের সব বাধ্যবাধকতা প্রজাদের জন্যই। শাসকরা এ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত-স্বাধীন রাখেন। মুসলমানদের মধ্যে এখন এসবই ঘটছে। উন্দলুস বিজয়ীরা বলেছিলো, ইসলামকে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে দেবে। কিন্তু এখন এরা উন্দুলুসেও টিকতে পারে না।
লিজা তার ঘরে ফিরলো এই অনুভূতি নিয়ে হাশিম শুধু কামার নয়, তার কাছে এমন কিছু আছে যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নেই।
***
উন্দলুসের প্রায় সব ঐতিহাসিকদের লেখাতেই হাশিমের উল্লেখ আছে। মধ্য অবয়বের লোক হলেও তার মা ছিলো বেশ উচ্চ বুদ্ধির। সে প্রথমে মুওয়াল্লিদ ছিলো না। তবে মুসলমানদের অনৈসলামিক কার্যকলাপ তাকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
তার কাছে খ্রিষ্টান মুসলমান সব ধরণের ক্রেতাই আসতো।
সে বেশ কিছু খ্রিষ্টানের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে নেয়। তাদেরকে নিয়ে সে এক গোপন দল গড়ে তুলে। এরা ক্রমেই মুওয়ালিদ আন্দোলনকারীদের অন্যতম বাহুতে পরিণত হতে লাগলো।
হাশিম তার দলের প্রত্যেক সদস্যকে লিজার স্বামী সম্পর্কে সতর্ক করে দিলো। তার কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। না হয়, যে কোন সময় ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লিজা এখন নিয়মিতই হাশিমের ওখানে যাচ্ছে। সে একদিন হাশিমকে বললো,
আমার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই নয়, এটা বড় স্পষ্ট এক ইশারাও।
হ্যাঁ, এটা সত্যিই এক খোদায়ী ইশারা। তবে তোমার স্বামী যেন টের না পায় যে, তোমার মনে ইসলামের কোন ভালোবাসা নেই। হাশিম বললো, তুমি এখন আর এই স্বামী থেকে মুক্ত হতে পারবে না। মুক্ত হতে চেষ্টা করলে মারা পড়বে।
