ওদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই রয়েছে গির্জা। গির্জার ঘন্টা ধ্বনি ভালো করেই শোনা যায়। গির্জার ঘন্টা বাজলে খোলা জানালায় গিয়ে লিজা দাঁড়াতো এবং চোখ বন্ধ করে কল্পনায় সে গির্জায় চলে যেতো।
মাসরূরের দুটি তাগড়া ঘোড়া সবসময় বাড়ির আস্তাবলে থাকে। একটি ঘোড়ার খুঁড়ে কিছু সমস্যা হয়েছে। মাসরূর এক সফরে যাওয়ার সময় লিজাকে বলে যায় কোন সহিসের কাছে যেন ঘোড়াটিকে নিয়ে যায় এবং নতুন খুড় লাগিয়ে আনে।
হাশিম নামে এক লোক কামারের কাজ করে। তলোয়ার, খঞ্জর, বর্শার ফলা ইত্যাদি সে বানায়। সে একজন ভালো সহিসও। মধ্যবয়স্ক। শক্ত-সামর্থ গায়ের গঠন। বেশ সুঠাম দেহী। যদিও কিছুটা খাটো। বেশ মজা করে কথা বলতে পারে। শহরের সবার মধ্যেই তার জনপ্রিয়তা আছে।
লিজা হাশিমের বাড়িতে গেলো ঘোড়া নিয়ে। হাশিম লিজাকে দেখে অমায়িক হেসে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলো, ঈসায়ী?
না। লিজা দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললো।
নও মুসলিম?
হ্যাঁ।
হাশিম ঘোড়া ঠিক করার কাজে লেগে গেলো। কাজও করছে কথাও বলছে। লিজা দেখলো, তার হাতের চেয়ে মুখই চলছে বেশি। দারুণ জমিয়ে কথা বলতে পারে। একটু পরই লিজার মনে হলো, এর কথায় সে দারূণ প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ছে। যেন সে তাকে অনেক দিন ধরে চিনে।
ধর্ম সম্পর্কে সে কথা বলছে। যেন সে তার মনের কথাই বলছে। হাশিম কামারের কথায় তার মধ্যে বেশ একটা আলোড়ন অনুভব করলো।
তার ভালবাসা যে এখন দ্বিধা বিভক্ত এটা সে হাশিমকে প্রায় বলেই ফেলছিলো; কিন্তু সে তার মুখের লাগাম টেনে ধরলো। কারণ, হাশিম মুসলমান।
আঠারো বছর তুমি খ্রিষ্টান ছিলে, হাশিম বললো, ভিন্ন এক ধর্ম গ্রহণ করে তোমার কাছে কেমন লাগছিলো? তুমি কি সঙ্গে সঙ্গেই ইসলাম গ্রহণ করেছো?
হ্যাঁ, কেন নয়?
তোমার থেকে আমি কোন গোপন কথা বের করছি না মেয়ে। হাশিম বললো, কঠিন এক অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছে আমার। আমিও খ্রিষ্টান ছিলাম। যে কোন কারণে আমি মুসলমান হয়েছি। অনেক আগের কথা এটা। মুসলমান তো হয়েছি। কিন্তু খ্রিষ্টবাদকে মন থেকে নামাতে পারছিলাম না। বহু কষ্টে নতুন ধর্ম মন মগজে ঢুকিয়েছি। রাতে চোখ বুজলেই গির্জার ঘন্টা কানে বাজতে থাকতো।
আমি এখন এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। লিজা বললো, আমার দুশ্চিন্তা হলো, আমার পূর্ব ধর্মের টান মন থেকে দূর করতে পারছি না।
হাশিম তার স্বামী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। মেয়েটি বড় আনকোড়া। এ ধরণের মানুষের পাল্লায় সে কখনো পড়েনি।
তার স্বামী তাকে কোন একদিন বলেছিলো তার পেশা সম্পর্কে যেন কেউ জানতে না পারে। গোয়েন্দা বৃত্তির পেশা সাধারণ মানুষের কাছে গোপনই রাখা হয়। সে গোয়েন্দা হলেও লোকে তাকে সরকারি তথ্যলেখক বলে জানতো।
স্বামীর বারণ এই হাশিমের সামনে এসে ভুলে গেলো। সে বলে দিলো, তার স্বামী সরকারি গোয়েন্দা খ্রিষ্টানদের।
ক্যথলিনিয়ার বিদ্রোহ আমার স্বামীর গোয়েন্দা অভিযানই ব্যর্থ করে দেয়। আমীরে উন্দলুস তাকে অনেক বড় পুরস্কারও দেন। লিজা গর্বিত কণ্ঠে বললো।
এটা কেন বলছো না ক্যথলিনিয়া খ্রিষ্টানদের নির্বিচারে হত্যা ও বাড়ি ঘরে আগুন দেয়ার কাজ তোমার স্বামী করিয়েছে? হাশিম বললো।
এটাই তো হওয়ারই ছিলো। লিজা বললো, সাধারণ খ্রিষ্টানরা ফৌজের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে নেমে পড়েছিলো। মেয়েরাও দালান কোঠার ছাদে চড়ে মুসলিম ফৌজের ওপর জ্বলন্ত কাঠের লাকড়ি ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছিলো। সঙ্গে সঙ্গে জ্বলন্ত অঙ্গার ও পাথারও নিক্ষেপ করেছিলো। অনেক ফৌজ আমাদের হাতে আহত নিহত হয়। তাহলে কেন ওরা খ্রিষ্টানদেরকে ওপর হামলা চালাবে না?
তুমি তো দেখি মুসলমানদের পক্ষেই বলছে।
***
হ্যাঁ, লিজা বললো, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তো আমি কথা বলতে পারি না। কারুণ, তুমিও মুসলমান। তাছাড়া আমার স্বামী আমাকে তিন হিংস্র খ্রিষ্টানের হাত থেকে রক্ষা করেছিলো। তা না হলে ধর্ষিতা হয়ে তাদের হাতে আমাকে মরতে হতো।
লিজা হাশিমকে পুরো ঘটনা শুনিয়ে বললো,
আমার ইযযত-আবরু বাঁচাতে সে তার জীবন বাজি রেখে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। তারপর যখন আমি নিজে আমার ইযযত তার সামনে পেশ করলাম সে আমার দেহের দিকে চোখ তুলে তাকালো না; আমাকে গ্রহণ করবে তো দূরের কথা। বলতে লাগলো, তুমি তো এখন আতংকগ্রস্ত এক অক্ষম মেয়ে। আমার সঙ্গী হতে চাইলে তোমাকে আমার পরিণয়ে আবদ্ধ করতে পারি। আমি তাকে মন-প্রাণ দিয়ে গ্রহণ করে নিয়েছি।
ও তো মনে হয়ে তোমাকে তার দাসীর চেয়ে বেশি কিছু মনে করে না।
না, তার মনের রানী আমি। আমি স্বপ্ন দেখে ভয় পেলে ও আমাকে বুকের সঙ্গে এমনভাবে চেপে ধরে যেমন শিশু কালে ভয় পেলে মা সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে। লিজা বললো।
স্বপ্নে কেন ভয় পাও? হাশিম জিজ্ঞেস করলো, আমি যখন নতুন মুসলমান হই আমিও স্বপ্নে ভয় পেয়ে যেতাম। প্রথম প্রথম এমনই হয়। দুই ধর্ম নিয়ে মানুষ তখন দিশেহারা হয়ে যায়। আমার মনে হয় তুমি এখন তেমন অবস্থার ভেতর দিয়েই যাচ্ছে।
হ্যাঁ, আমি সে অবস্থার ভেতর দিয়েই যাচ্ছি।
আমার সঙ্গে কথা বলতে অযথা ভয় পেয়ো না। আমি মুসলমান তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি মানুষও। সব মানুষের মনই এক রকম হয়ে থাকে। সে মুসলমান হোক বা খ্রিষ্টান হোক। আমাকে যদি সাধারণ একজন কামারই মনে না করে থাকো তাহলে তোমার মনের দুঃখ আমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারো।…..
