এক নিরুপায় অবস্থায় স্বধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এক মুসলিম সেনার স্ত্রী হয়ে যায়। মুসলমান হলেও তার মন থেকে খ্রিষ্টবাদ মুছে যায়নি বরং খ্রিষ্টধর্মের প্রতি সুক্ষ্ম এক টান ক্রমেই বাড়তে থাকে। সঙ্গে এই মাসরূর নামক মুসলিম পুরুষটির প্রতিও তার ভালোবাসা গড়ে উঠে।
যে তার প্রাণ বাজি রেখে তাকে বাঁচিয়েছে তার প্রতি এক ধরণের অদম্য আকর্ষণ শুরু থেকেই গড়ে উঠে। দুই ভালোবাসার টানাপোড়েন তাকে কখনো স্থির হতে দেয়নি। তাছাড়া তার পরিবারের প্রতিটি লোক যে মুসলমানের হাতে আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়েছে এই দগদগে ক্ষতও সে কখনো ভুলতে পারেনি।
ক্যথলিনা শহরের লোকেরা এমনকি আট পৌড়ে খ্রিষ্টান মেয়েরাও যে অসংখ্য মুসলমান হত্যা করেছে এটা তার মনে একবারও রেখাপাত করলো না। ইসলাম তার মনে তাই কখনোই স্থান পায়নি। তবে তার মুসলমান স্বামীকে তার হৃদয়ের গভীরেই সে স্থান দিয়েছে।
***
লিজা অবশ্য অনেক চেষ্টা করেছে ইসলামকে মনে প্রাণে মেনে নিতে; কিন্তু সে এটা পারেনি। সে দুমুখো হয়ে রইলো।
এক বছর পর তার একটি মেয়ে হলো। বাবা মাসরূর মেয়ের অন্য কোন নাম রেখেছিলো। সে নাম ইতিহাসের কোথাও পাওয়া যায়নি। মা নাম রাখে ফ্লোরা। তবে বাপ এজন্য কোন প্রশ্ন বা অভিযোগ তুলেনি।
বাপের ধারণা, মা আদর করে তাকে ফ্লোরা ডাকে। ইতিহাসে ফ্লোরা নামেই সে পরিচিত পেয়েছে।
ফ্লোরাকে নিয়ে অনেক ড্রামা-নাটক লেখা হয়েছে। ইংরেজী ও উর্দু সাহিত্যেও মুসলিম শাহজাদা ও সালাররা তার প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। কেউ কেউ তো তাকে কুলুপতরার সঙ্গে তুলনা করেছে।
তবে বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে এ সবের সম্পর্ক কমই। অসংখ্য অমুসলিম ঐতিহাসিক এবং মুসলিম ঐতিহাসিকও লিখেছেন, ফ্লোরা সেই মেয়ে যে ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ উস্কে দেয়ার এক অপরূপ দেহসর্বস্ব হাতিয়ার।
যে উন্দলুসের খ্রিষ্টানদের দুমুখো আন্দোলনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। ফ্লোরা হয়ে উঠে খ্রিষ্টানদের এক উম্মাতাল আদর্শ।
অল্প সময়ের মধ্যে তার জঙ্গী উস্কানিতে হাজারো খ্রিষ্টান অসংখ্য মুসলমানকে হত্যা করতে গিয়ে নিজেরা আত্মহত্যা করে।
ফ্লোরা যখন লিজার গর্ভে তখন এক রাতে লিজা ঘুম থেকে চিৎকার দিয়ে উঠে পড়ে। তার স্বামী মাসরূর তাকে জড়িয়ে ধরে। পবিত্র কুরআন শরীফের একটি আয়াত পড়ে তাকে খুঁকে দেয়। তাকে দিয়েও কিছু পড়ায়।
আগুন লেগে গেছে, আগুন। লিজা দুহাতে তার গাল চেপে ধরে ভীত কণ্ঠে বড় বড় চোখ করে বললো, উঠে দেখো, কেউ ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। মানুষের পোড়া গোশতের গন্ধ পাচ্ছো না তুমি? আহা জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
যখন তার ঘুমের ঘোর কাটলো তখন সে তার স্বামীর কোলে শুয়ে হিচকি তুলে কাঁদছে। মাসরূর তাকে বললো,
গর্ভবর্তী হলে প্রথম প্রথম মেয়েদের অবস্থা এমনই হয়। প্রায়ই দুঃস্বপ্নে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখন সে ভয়ে প্রলাপ বকতে থাকে।
ফ্লোরার মা লিজা এই ব্যাখ্যা মেনে নিলো। সে এই স্বপ্ন দেখাকে গর্ভবর্তী জনিত দৈহিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া বলে ধরে নিলো।
এর তিন চার রাত পর সে স্বপ্নে গির্জার ঘন্টা ধ্বনি শুনতে পেলো। ঘন্টা ধ্বনি থেকে কেমন মাতম আর শোকের সুর ভেসে আসছে। এই আওয়াজ থেকে ক্রমেই এক আগুনের শিখা বের হচ্ছে। শিখার আলোয় আকাশ কেমন ধূসর রঙা হয়ে উঠেছে। সেটাও ধীরে ধীরে ক্রুশে রূপান্তরিত হলো।
লিজা আগুনের শিখার দিকে হাঁটা দিলো। হাঁটতে হাঁটতে তার বুকে হাত রাখলো। সেখানে রূপার এক ক্রুশের অস্তি টের পেলো। কুশটাকে সে হাতে নিয়ে পরম মমতায় বুকে চেপে ধরলো।
এ সময় তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। দেখলো তার একটি হাত তার বুকের ওপর থির থির করে কাঁপছে। সেখানে ক্রুশ নেই।
তার কয়েক মাস আগের কথা মনে পড়লো। তার স্বামী মাসরূর যখন তাকে তিন খ্রিষ্টান গুন্ডাদের হাত থেকে রক্ষা করে তখনই তার গলা থেকে ঝুলন্ত কুশটি খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে। তার কাছে মনে হলো, নিজ হাতেই সে কুশকে অপদস্থ করেছে।
তার সেই স্বামী আজ তার পাশে শুয়ে আছে। এ লোক যদি তাকে জোর জবরদস্তি করে বিয়ে করতো তাকে, তাহলে এই ঘুমন্ত অবস্থাতেই হত্যা করে দিতো। তারপর কোন গির্জায় চলে যেতো। কিন্তু এ লোকের বিরুদ্ধে সে অঙ্গুলিও নাড়াতে পারবে না। তার বিবেকই তাকে সবচেয়ে বড় বাধাটি দিবে।
এখান থেকেই তার ভালোবাসা আর স্বপ্নের জগত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো।
সেদিন থেকে সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে মুসলমান নয়, খ্রিষ্টান। তবে তাকে মুসলমানের ছদ্মবেশেই থাকতে হবে। কারণ, সে তার স্বামী মাসরূরকে হারাতে চায় না।
মাসরূরের মতো এমন জীবন সঙ্গি খ্রিষ্টসম্প্রদায়ের মধ্যে পাওয়া বড় দুষ্কর। ওর স্বামী যখন ওকে সামান্য সময়ের জন্যও ভালোবাসে তখন সে সবকিছু ভুলে যায়। তার বিশ্বাস, এমন করে কোন পুরুষ কোন নারীকে মাসরূরের মতো ভালো বাসতে পারবে না।
***
মাসরূর কর্ডোভার গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা। কাজের জন্য তাকে অধিকাংশ সময়ই বাইরে থাকতে হয়। সে ঘরে থাকলে তো তার স্ত্রী লিজা নামায পড়ে। তার কাছে কুরআন শরীফের শিক্ষা নেয়। কিন্তু সে বাইরে থাকলে লিজা গির্জার ইবাদত করে।
