মাসরূর একজনকে তো তার তলোয়ার দিয়ে সর্বশক্তিতে আঘাত করতে পারলো। কিন্তু অন্যজন তার পিঠে তলোয়ার দিয়ে এত জোরে মেরে বসলো যে, তার মনে হলো, দেহ বুঝি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। পড়তেও পড়তেও সে নিজেকে সামনে নিলো।
মাসরূর টলতে টলতে তার ঘোড়া এর কাছে থেকে একটু দূরে নিয়ে গেলো। তারপর দুজনের তলোয়ার পরস্পরের ওপর হামলে পড়লো। মাসরূর তো আগেই মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। তাই সে ক্রমেই কোণঠাসা হতে লাগলো। মনে হলো তার মৃত্যু অবধারিত।
তারপর ঘোড়া থেকে পড়ে গেলো। সেই সওয়রও ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামলো। ইতোমধ্যে মেয়েটি মৃত খ্রিষ্টানের একজনের তলোয়ার হাতে নিয়ে সে লোকের পিঠের ওপর সজোরে আঘাত করলো।
তিন খ্রিষ্টান জাহান্নামে চলে গেলো। কিন্তু মেয়েটিকে যে বাঁচিয়েছে সে মারাত্মকভাবে আহত। মেয়েটি তার বিশাল উড়নিকে কয়েক টুকরো করে তার বিভিন্ন ক্ষত স্থান বেঁধে দিলো।
ফোঁপাতে ফোঁপাতে মেয়েটি শংকিত কণ্ঠে জানালো, সে একজন খ্রিষ্টান মেয়ে। তার ঘরের লোকেরা কর্ডোভার ফৌজের ওপর বিনা উস্কানিতে হামলা চালিয়ে ছিলো। এ অপরাধে তাদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। সে ছাড়া সেই বাড়ির আর কেউ জীবিত নেই। কর্ডোভার সৈনিকরা তাকে নিঃসঙ্গ-নিরুপায় পেয়েও তার দিকে হাত বাড়ায়নি। তাকে ছেড়ে দেয়।
রাতেই সে তাদের এলাকা থেকে পালিয়ে আসে। কোথায় এসেছে কোথায় আশ্রয় নিয়েছে রাতের অন্ধকারে এর কিছুই সে ঠাহর করতে পারে না
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার রাতটা কেটে যায়। সকালের আলোয় সে দেখতে পায় এই বিজন পাহাড়ি এলাকায় সে একা। উদ্দ্যেশহীনভাবে সে হাঁটতে থাকে আর হু হু করে কাঁদতে থাকে। তারপরই এক সময় হঠাৎ করে এই তিন খ্রিষ্টান পান্ডা তার ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
***
মাসরূর তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করলো।
লিজা আমার নাম। মেয়েটি উত্তর দেয়।
তুমি এখন কোথায় যেতে চাও? মাসরূর তাকে জিজ্ঞেস করে।
কোথায় যাবো এ প্রশ্ন তো আমারও। আমার যে কোন ঠিকানা নেই। লিজা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো।
তুমি যেখানেই যেতে চাও তোমাকে সেখানে পৌঁছে দেবো।
লিজা একথায় মোটেও ভরসা পেলো না। তার মানসিক আত্মবিশ্বাস একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। সে মাসরূরের পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
দয়া করে আমাকে একটা আশ্রয় দিন।
দেখো! আমি একজন মুসলমান। তুমি খ্রিষ্টান মেয়ে। তোমাকে তো আমার সঙ্গে কোথাও নিয়ে যেতে পারি না। বড় জোর তোমাকে কোথাও আমি পৌঁছে দিতে পারি। বলো, তুমি কোথায় যেতে যাও।মাসরূর অসহায় গলায় বললো।
মেয়েটি তবুও জিদ ধরলো। ওকে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
আমার কাছে আমার দেহ ছাড়া আর অন্য কিছু নেই। লিজা কাঁদতে কাঁদতে বললো। আমি তোমার সানে এটাই রাখতে পারি। এর বিনিময়ে আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে চলো। তুমি কোথাও আশ্রয় দিতে না পারলে আমাকে কোন গির্জার পাদ্রীর কাছে হাওলা করে দাও।
তুমি কোন পাপের উপকরণ নও মেয়ে! তুমি এক পবিত্র আমানত। মাসরূর বললো, তুমি অসহায় এবং সঙ্গীহীন মেয়ে। ভয়ে-শংকায় তুমি মরে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তোমাকে আমি কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারবো না। তুমি এক অসহায় মেয়ে হয়েও যদি তোমাকে স্বত:স্ফূর্তভাবে আমার হাতে তুলে দিতে তাহলে তোমাকে গ্রহণ করতে পারতাম না আমি। বরং তোমাকে তখন ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করতাম।…….
কিন্তু তুমি এখন নিঃসঙ্গ এবং বিপদগ্রস্ত এক মেয়ে। তোমাকে সহযোগিতা করাও আমার ওপর ফরজ। এখন একমাত্র উপায় হলো, তুমি যদি আমার ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করো তাহলেই তোমাকে আমার স্ত্রী হিসেবে আমার সঙ্গে রাখতে পারবো। তবে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে তোমার নিজ ইচ্ছায়, স্বত:স্ফূর্তভাবে। নিরুপায় হয়ে ইসলামের প্রতি তুমি মুগ্ধ হলেই তুমি ইসলামে দীক্ষিত হতে পারো না।
লিজা চিন্তায় পড়ে গেলো। কিছুক্ষণ ভাবার পর তার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সে বললো,
হ্যাঁ, আমি স্বত:স্ফূভাবেই ইসলাম গ্রহণ করছি এবং তোমার মতো পুরুষের হাতেই আমাকে আমি সানন্দে তুলে দিতে পারি। বরং তোমার মতো পুরুষের স্ত্রী হওয়াটা অনেক বড় ভাগ্যের ব্যাপার। আমার মতো এমন সুন্দরী যুবতী মেয়েকে এভাবে পেয়েও যে নির্লোভ নির্বিকার থাকতে পারে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কে হতে পারে? যে কোন শর্তে আমি আজীবন তোমার দাসী হয়ে থাকবো।
মাসরূর দেখলো, লিজার গলায় একটা ক্রুশ ঝুলে আছে। সে কুশটাকে হাতে ধরে এক ঝটকায় তার গলা থেকে ছিঁড়ে নিলো। তারপর সেটা দূরে ছুঁড়ে মারলো। লিজা শুধু একবার তার দিকে তাকালো। কিন্তু কিছু বললো না।
মাসরূর বললো, হ্যাঁ, এখন আমার সঙ্গে তোমার যেতে কোন বাধা নেই। চলো।
মৃত তিন খ্রিষ্টানের ঘোড়া ওরা নিয়ে নিলো। লিজাকে একটির ওপর সওয়ার করিয়ে বাকি দুটো সঙ্গে নিয়ে ক্যথলিনার দিকে রওয়ানা দিলো।
ঘোড়ায় চড়ার পর মাসরূরের যখম থেকে আবার রক্ত পড়তে শুরু করলো। তার জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হলো। ক্যথলিনায় পৌঁছতে বেশি সময় লাগলো না। সেখানে এক শল্যচিকিৎসক তাকে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলো।
লিজা জন্মগত সূত্রে খ্রিষ্টান ছিলো। খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতিও তার পরিবার ছিলো একান্ত অনুগত। কিন্তু হঠাৎ এক ঝড় তার জীবনের সবকিছু উলটপালট করে দেয়।
