আমি তো এসব লোকের ওপর আমার থুথুও ফেলতে লজ্জাবোধ করি। ফ্লোরা বললো, এই লোক ও তার ফৌজের ওপর আমি ফুল ছিটাবো কি করে যারা খ্রিষ্টানদেরকে সমূলে হত্যা করে এসেছে। খ্রিষ্টধর্মের নিরাপত্তার জন্য কি ইসলামকে স্পেনের মাটি থেকে আমাদের উৎখাত করার অধিকার নেই?
ভুলে যেয়ো না, তোমার বাবা মুসলমান। ফ্লোর মা বললো, তোমার বাবার যদি সামান্যতম সন্দেহ হয় আমি কেবল নামেই মুসলমান এবং তোমাকে আমি খ্রিষ্ট শিক্ষাই অতি গোপনে দিয়ে এসেছি তাহলে উনি আমাদের দুজনকেই মেরে ফেলবেন।
কেন? ফ্লোরা ঝাঝালো গলায় বললো, আমাকে তাহলে কেন খ্রিষ্টবাদের শিক্ষা দিলে? আর আজ মুসলমানদের ব্যাপারে ঘৃণা প্রকাশ করতে বাধা দিচ্ছো? আমার বাপ যদি তোমার স্বামী না হতো তাকে আমি হত্যা করে ফেলতাম। তিনি তোমার স্বামী এই সত্যটা আমাকে কাটার মতো বিদ্ধ করে যায় প্রতিনিয়ত।….
মুসলমানের মেয়ে হয়েও যে আমি ঈসা মাসীহ এর নামে জীবন বিসর্জন দেয়ার জন্য গোপন সংকল্প করেছি এই সত্য আমি বড় কষ্টে বুকের মধ্যে চেপে রেখেছি। মনে রেখো, আমার জীবন আমি খ্রিষ্টবাদের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছি। আমার বাপের প্রতি তোমার ভালোবাসার দায়বদ্ধতা তোমাকে শিকলে বন্দি করে রেখেছে। কিন্তু আমি স্বাধীন।
হা ফ্লোরা! তোমার বাবার প্রতি এখনো আমার ভালোবাসা রয়েছে। কিন্তু আমি আমার ধর্মের ভালোবাসাও মন থেকে দূর করতে পারিনি। ফ্লোরার মা উদাস গলায় বললো।
***
ফ্লোরার মার বয়স তখন আঠার বছর। উন্দলুসের আমীর তখন আলহাকাম। উন্দলুসের এক উপ শহর ক্যথলিনায় ওরা থাকতো। ক্যথলিনার লোকজনের প্রায় নিরানব্বই জনই খ্রিষ্টান।
এখানকার লোকজন খুব দাঙ্গা-ফাসাদ ও ষড়যন্ত্রপ্রবণ। সৈন্যরা কখনো কখনো ওখানে টহলে যেতো। কিন্তু ক্যথলিনার লোকেরা তিন চারবার অযথাই সেনাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়।
ক্যথলিনা এভাবে উন্দলুসের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী ও বিদ্রোহীদের গোপন আড্ডার কেন্দ্র হয়ে উঠে।
মাসরূর নামে এক গোয়েন্দা সোর্স একদিন কর্ডোভার এমন এক তথ্য পাঠায় যে, তথ্যের সূত্র ধরে অনেক বড় মানব- বিধ্বংসী এক ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মেক্ত করে দেয়। মাসরূর খ্রিষ্টানদের ছদ্মবেশে ধারণ করে তাদের চক্রান্তের খুঁটিনাটি সব জেনে নিয়ে কর্ডোভায় গিয়ে সবকিছু জানিয়ে দেয়। কর্ডোভার প্রশাসন কাল বিলম্ব না করে তখনই এর বিরুদ্ধে এ্যকশনে নামে।
মাসরূর পথ দেখিয়ে সশস্ত্র সেনাদল নিয়ে আসে। ষড়যন্ত্রের আসল হোতাদেরকে গ্রেফতার করে। শহরের প্রতিটি লোকের কাছে তখন একাধিক অস্ত্র ছিলো। ওরা খবর পেয়ে সশস্ত্র হয়ে সেনাদলের ওপর হামলে পড়ে।
সৈন্যরা এ হামলার জন্য প্রস্তুত ছিলো না। ওখানে মেয়েরাও মুসলিম সৈন্যদেরকে বাড়ির ছাদ থেকে পাথর আর জ্বলন্ত অঙ্গার ছুঁড়ে মারতে শুরু করলো। বেশ কিছু সৈন্য এভাবে আহত হলো।
কমান্ডার এ অবস্থা দেখে ফৌজকে হুকুম দিলো, কয়েকটি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দাও। যাতে এরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আত্মসমর্পন করে।
শহরের লোকদের লড়াইয়ের ক্ষিপ্রতা দেখে মনে হচ্ছিলো, এরা বুঝি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়মিত ফৌজ। তখনই ব্যাপারটা পরিস্কার হলো। শহরবাসীর পোষাকে আসলে অসংখ্য ফ্রান্সী ফৌজ লড়াই করছে। যারা আগ থেকেই শহরে এসে গোপন আস্তানা গেড়েছিলো।
মুসলিম ফৌজ যখন কয়েকটি বাড়িতে আগুন লাগানোর হুকুম পেলো তখন তাদের আক্রমণ আরো বেড়ে গেলো। সমানে ওরা আগুন লাগাতে শুরু করলো। অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা গেলো, অর্ধেক এলাকা ধাউ ধাউ করে জ্বলছে।
লোকদের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় শিশু-বাচ্চারা আগুনের হাত থেকে রেহাই পেলেও নাশকতার কাজে যারা লিপ্ত ছিলো তারা রেহাই পেলো না। সন্ত্রাসী আর চক্রান্তকারীদের অনেকেই আগুনের খেরাক হয়ে গেলো। অধিকাংশ লোকই শহর থেকে পালিয়ে গেলো।
ছদ্মবেশী ফ্রান্সী সৈন্যদের একটাকেও রেহাই দেয়া হলো না।
***
দু তিনদিন পরের ঘটনা। এ অভিযানের সাফল্যের নায়ক মাসরূর শহর থেকে কোন একটা কাজে বের হলো। পাহাড়ি পথ ধরে সে যাচ্ছে। এসময় এক নারী কণ্ঠের চিৎকার ধ্বনি ভেসে এলো। যে দিক থেকে আওয়াজ এসেছে তার ঘোড়ার রুখ সেদিকে করে নিলো মাসরুর। তিন খ্রিষ্টান ঝান্ডা মার্কা লোককে দেখতে পেলো সে।
তিনজন অতি রূপসী এক যুবতীর কাপড় ধরে টানাটানি করছে। তার সম্ভ্রমহানির চেষ্টা করছে। তিন জনের ঘোড়া ওদের পাশেই দাঁড়িয়ে নির্বাক হয়ে এ দৃশ্য দেখছে।
এই তিনজন ফৌজের লোক না হলেও লড়াইয়ে যে বেশ দক্ষতা আছে সেটা দেখেই বুঝা গেলো।
মাসরূর তলোয়ার কোষমুক্ত করে নেয় এবং ওদের দিকে ঘোড়া ছোটায়। তিন জনই রূপসী মেয়েকে বিবস্ত্র করার ব্যাপারে এতই মগ্ন ছিলো যে, এক ঘোড়সাওয়ারের সশব্দে ছুটে আসার কোন শব্দই পেলো না।
ঘোড়া একেবারে ওদের কাছে যাওয়ার পর ওরা টের পেলো। কিন্তু ঘোড় সাওয়ারের তলোয়ারের ফলা ততক্ষণে একজনের বুকে গেঁথে গেছে। মাসরূর তার তলোয়ার বর্শার মতো করে মেরেছিলো।
তারপর মাসরূর ঘোড়া একটু সামনে নিয়ে গিয়ে আবার ঘোরালো। অন্য দুজন মেয়েটিকে ছেড়ে ঘোড়ার কাছে চলে এলো এবং তলোয়ার কোষমুক্ত করে নিলো।
মাসরূর তার ঘোড়া নিয়ে ওদের কাছে যেতেই ওরা ওর ডানে বামে গিয়ে তাকে ঘেরাওয়েরে মতো পরিবেষ্টান করে ফেললো।
