আমি তোমাকে হুমকি দিতে আসিনি। যারিয়াব এবার নরম গলায় বললো। আমার মনে আপনার সম্মান সহানুভূতি উভয়টিই আছে। আল্লাহ হাফেজ?
যারিয়াব চলে গেলো।
***
শহরের লোকেরা তাদের ফৌজকে স্বাগত জানানোর জন্য শহর থেকে বেশ দূরে চলে যায়। এর মধ্যে মুসলমান খ্রিষ্টান সবই আছে।
কর্ডোভায় আগেই খবর পৌঁছেছে, মারীদার বিদ্রোহ দমন করে এবং কঠিন যুদ্ধে জয় লাভ করে তাদের ফৌজ আসছে। শহরবাসী উট ও ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে শ্লোগান দিতে দিতে তাদের ফৌজের সঙ্গে শহর প্রবেশ করছে।
ফৌজ যখন শহরে প্রবেশ করলো পুরো শহর তাদের প্রশংসায় শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠলো। মেয়েরা বাড়ির ছাদে, ব্যলকনিতে, বারান্দায়, চওড়া-কার্ণিশে দাঁড়িয়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দিচ্ছে।
আমীরে উন্দলুস আব্দুর রহমানের ঘোড়ার পেছনে সুলতানা, শিফা, জারিয়া পৃথক পৃথক ঘোড়ার গাড়িতে করে মহলের দিকে আসছে।
রেওয়াজ অনুযায়ী এই চারজন আমীরে উন্দলুসকে স্বাগত জানানোর জন্য কর্ডোভা শহর থেকে দুই আড়াই মাইল দূরে চলে গিয়েছিলো। যারিয়াব ও অন্যান্য দরবারীরা ঘোড় সাওয়ার হয়ে পেছন পেছন আসছে।
কোন বিশেষ কথা বা বিশেষ ঘটনা? আব্দুর রহমান মুদ্দাসসিরাকে জিজ্ঞেস করলেন।
কিছুই ঘটেনি। মুদ্দাসসিরা আনত কণ্ঠে বললো, দুআ করতে করতে করাতে করাতে দিন কেটে গেছে। ঐ সব গাদ্দারদের নেতা ইউগেলিস, ইলওয়ার ও মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল জব্বার কি ধরা পড়েছে?
হাত থেকে বেরিয়ে গেছে। ওদেরকে গ্রেফতার করাটা এত সহজ নয়। খ্রিষ্টানরা ওদেরকে লুকিয়ে শহর থেকে বের করে দিয়েছে। শহরের অধিকাংশ লোক যদি মুসলমান হতো তাহলে ওদেরকে ধরাটা সহজ হতো। যারিয়ার ও সুলতানা কেমন ছিলো?
ওদের দিকে নজর দেয়ার ফুরসত মিলেনি মুদ্দাসসিরা বললো, আমার মন মগজ সবসময় ছিলো ঐ যুদ্ধের ময়দানে।
যারিয়াবদের ঘোড়া সুলতানার শাহী গাড়ি থেকে সামান্য দূর দিয়ে যাচ্ছে। সুলতানা যারিয়াবের দিকে তাকালো। যারিয়াবও এদিকেই তাকিয়ে আছে। সুলতানা ইংগিতে ওকে তার কাছে ঘোড়া নিয়ে আসতে বললো। যারিয়াব তার ঘোড়া সুলতানার শাহী গাড়ির কাছে নিয়ে গেলো।
দেখছো যাররী? সুলতানা আব্দুর রহমান ও মুদ্দাসসিরার দিকে ইংগিত করে প্রায় ফিস ফিস করে বললো, ঐ শয়তানীটা এখন থেকেই তার কান ভারী করা শুরু করে দিয়েছে। আর তুমি বলছো, ওর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোন ভয় নেই!
দুজনের কানাঘুষা আব্দুর রহমান দেখতে পেলো না। আব্দুর রহমান নজর এখন মুদ্দাসসিরার দিকে।
বিদ্রোহের আশংকা কি একেবারেই নির্মূল করা গেছে? মুদ্দাসসিরা আব্দুর রহমানকে জিজ্ঞেস করলো।
না! এরা আমাদেরকে উন্দলুস থেকে উৎখাত করতে চাচ্ছে। এজন্য ওরা নজিরবিহীন ত্যাগ তিতিক্ষাও দিচ্ছে। ওরা এত সহজে কাবু হওয়ার নয়।
যদি এখানকার মুসলমানদের মধ্যে এ ধরণের ত্যাগী মানসিকতা গড়ে উঠতো তাহলে তো যে কোন ধরণের ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ বা নাশকতার ঘটনা আগ থেকেই জানা যেতো। মুদ্দাসসিরা বললো।
আমাদের সবচেয়ে বড় আশংকা হলো সেসব মুসলমানের ব্যাপারে, যারা মাত্র কিছু দিন আগে মুসলমান হয়েছে। এরা দুমুখো সাপ। আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ধোকা। আমীরে উন্দলুস বললেন।
ওরা নিজেদের সুন্দরী মেয়েদেরকে অন্যভাবে ব্যবহার করছে। আপনি অনুমতি দিলে মুসলমান মেয়েদেরকে শহরের ভেতর গুপ্তচর হিসাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গোপনে ওদেরকে সৈনিকি প্রশিক্ষণও দেয়া যায়। মুদ্দাসসিরা বললো।
না।
কেন? আপনি তো আহত সৈনিকদের শশ্রুষা ও তাদের দেখভাল করার জন্যও মেয়েদেরকো কেন অভিযানে নিয়ে যান না। কেন? মুদ্দাসসিরা জিজ্ঞেস করলো।
এতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। আব্দুর রহমান বললেন এবং শ্লোগানদাতাদের দিকে ঘুরে তাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়তে লাগলেন।
দুই তলার একদালান বাড়ি। দুই তলা হলেও চার তলার সমান উঁচু। বাড়ির দুই তলার এক খোলা জানায়াল একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দারুণ রূপাবর্তী। যৌবনে টাইটুম্বর। জানালা গারদবিহীন। ওদিকে যাদেরই চোখ যাচ্ছে সেই আমীরে উন্দলুস ও তার বাহিনী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই মেয়ের ওপরই চোখ আটকে যাচ্ছে।
প্রতিটি বাড়ির জানালা বা ব্যলকনিতে দুএকজন করে নারী দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির দিকে যার চোখই যাচ্ছে তার চোখ ওখানেই বাঁধা পড়ে যাচ্ছে।
মেয়েটি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন কোন প্রতিমূতি। নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন কোন কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না। অন্যান্য নারীরা আমীরে উন্দলুস ও ফৌজকে দেখে হাত নাড়ছে কিংবা শ্লোগান দিচ্ছে। মেয়েটি যখন আমীরে উন্দলুসকে দেখলো তার দুচোখে ঘৃণা ফেনিয়ে উঠলো।
সে তার কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেলো। লোকদের শ্লোগানমুখর ভারি শব্দ, ঘোড়ার খুর ধ্বনি ইত্যাদির মধ্য থেকে তার কানে ভেসে এলো,
ফ্লোরা।
মেয়েটি ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো, তার মা দাঁড়িয়ে আছে।
তুমি ফুল ছিটাচ্ছো না কেন? তার মা তাকে বললো, তুমি হাতও নাড়ছে না।
ফ্লোরা! এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইলে ওখান থেকে সরে আসো। তোমার বাবা নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। উনি যদি দেখেন তুমি ফুলও ছিটাচ্ছো না এবং শাহে উন্দলুসের উদ্দেশ্যে হাতও নাড়াচ্ছো না তখন উপরে এসে তো উনি কেয়ামত ঘটিয়ে দেবেন।
