যারিয়ার চমকে উঠে প্রথমে নিজের ডান তারপর বাম কাঁধে চোখ বুলালো। তার ধবধবে সাদা কাপড়ে বাদামী রঙের লম্বা একটি চুল যেন তাকে ভ্রু কুটি করছে। চুলটি তার আঙ্গুলে পেঁচিয়ে কুন্ডলীর মতো করে মাটিতে ছুঁড়ে দিলো। তার চরম বিব্রত চোখমুখ দেখে মুদ্দাসসিরা আর কিছু বললো না।
তিনি আগামীকাল আসছেন। মুদ্দাসসিরার গলা এখন বেশ ধরা এবং গম্ভীর। তার সঙ্গে আমাদের ফৌজ আসছে। শহীদদের লাশ ও আহত মুজাহিদদের কাফেলাও আসছে। এর মধ্যে অনেক মায়ের সন্তান থাকবে না। অনেক বোনের ভাই, অনেক মেয়ের বাবা এবং বহু নারীর স্বামী থাকবে না। যুদ্ধের ময়দানেই ওরা চির বিদায় নিয়েছে।….
ওরা যখন দুশমনের আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে, ওদের লাশ ঘোড়ার পায়ের নিচে পিষ্ট হচ্ছে তখন আপনার মুখ থেকে মদের গন্ধ, আপনার শরীর থেকে আসছে এক নারীর সুগন্ধি এবং আপনার বাহুমূলে সে নারীর অসংলগ্ন চুল। যখন ইসলামের ঝান্ডাধারীরা রক্তে ডুবে যাচ্ছে তখন আপনি রূপ যৌবন নিয়ে খেলায় মত্ত এক নারীর বাহুলগ্ন হয়ে এ চিন্তায় মগ্ন যে, আমীর উন্দলুস কোন্ নারীর দখলে থাকবে।
মুদ্দাসসিরা! যারিয়াব অধৈর্স গলায় অনেকটা ব্যকুল হয়ে বললো। তুমি অনেক বেশি আবেগী। আমি তোমাকে বলতে এসেছিলাম, সে তোমাকে আমীরে উন্দলুসের চোখের কাটা করে তুলবে। ও অনেক কিছুই করতে পারে।
***
এতো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই আমার মুহতারাম যারিয়াব। মুদ্দাসসিরা বিষণ্ণ হেসে বললো। কী বলতে যাচ্ছেন আমি সেটা বুঝে গেছি। আমাকে আসলে আপনার সরাসরি হুমকি দেয়া উচিত ছিলো। আমাকে কেন সরাসরি সাবধান করে দিচ্ছেন না। আপনাদের দুজনের পরিকল্পিত পথ থেকে সরে না দাঁড়ালে আমাকে মেরে ফেলা হবে।
আসলে সরাসরি হুমকি দিচ্ছেন না একারণে যে, আপনি অনেক বুদ্ধিমান। অনেক বেশি চতুর। ধূর্তও। আপনার মুখের কথায় জাদুর প্রভাব রয়েছে। তাই আপনি বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলেন। কিন্তু মুহতারাম যারিয়াব! জাদু তার ওপরই প্রভাব বিস্তার করতে পারে যার চরিত্রে ঈমানের দীপ্তি নেই।
যারিয়াব মুদ্দাসসিরার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালো। সুলতানার চেয়ে তাকে এখন আরো অনেক বেশি সুন্দরী মনে হচ্ছে। এতো আসলে মুদ্দাসসিরার ভেতরের রূপ-সৌন্দর্য, যার তেজদীপ্ততা যারিয়াব সহ্য করতে পারছে না। এতক্ষণে যারিয়াবের মনে হচ্ছে, সুলতানার কথায় তার মুদ্দাসসিরার কাছে আসা উচিত হয়নি।
কারো ভয়ে আমি ভীত নই। মুদ্দাসসিরা নির্ভয়ে বললো, যে পরিণামের ব্যাপারে আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন আমি তাতে শংকিত নই। ইসলামের জন্য আমি আমার জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছি। সেই আমীর যিনি আমার স্বামী, তার প্রতি আমি সে পর্যন্ত অনুগত থাকবো যে পর্যন্ত তিনি ইসলামের প্রতি অনুগত থাকবেন।………
আপনি অনেক জ্ঞানী মানুষ মুহতারাম যারিয়াব! আপনি নিজেই তো বুঝতে পারছেন। মুসলিম মেয়েরা যদি এভাবে একে একে সুলতানায় রূপান্তরিত হতে থাকে তাহেল সালতানাতে ইসলামিয়া সংকুচিত হতে হতে খানায়ে কাবায় গিয়ে আশ্রয় নেবে। কাবাই তখন ইসলামের এক মাত্র স্মৃতি স্তম্ভ হয়ে থাকবে।….
তারপর একটা সময় আসবে, যখন অমুসলিমরা বলবে, এটা সে জাতির স্মৃতি, যে জাতির মেয়েরা নিজেদের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে ছুঁড়ে মেরে উলঙ্গপনাকে বরণ করে নিয়েছিলো।
শালীনতা, নৈতিকতা, পর্দা আর সতীত্বকে বিসর্জন দিয়ে পরপুরুষের আনন্দ- সামগ্রীতে পরিণত হওয়াকে গভ অনুভব করতো। আর ওদের মাতৃজাতি থেকে যে সন্তানদের জন্ম দিয়েছিলো ওরা, ওরা তো আত্মর্যাদাবোধ কী, আত্ম সমকী সে সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞান রাখতো না। আসলে ওরা ছিলো মূর্খ।
তুমি যা বলছো সেটা কী নিজে বুঝতে পারছো মুদ্দাসসিরা?
যিনি আমাকে এসব কথা বলেছিলেন তিনি আমাকে বুঝিয়েও দিয়েছিলেন, মুদ্দাসসিরা বললো, তিনি ছিলেন আমার বাবা। আমার শ্বশুর আলহাকামের যুগে তিনি তুলাইতার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।
মুহতারাম যারিয়াব! আপনি আপনাকে আরো কিছু বলতে চাই। আপনি শুধু অসাধারণ একজন সঙ্গীতজ্ঞই নন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে আরো কিছু শক্তি-সামর্থও দান করেছেন। যার দিকে আপনি পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখেন সে তো পাথর হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আপনাকে অতুলনীয় জ্ঞান-বুদ্ধি ও দূরদর্শিতা দিয়েছেন।….
আল্লাহ তাআলা যেহেতু আপনাকে অন্যকে জাদুমুগদ্ধ করার বিশেষ প্রতিভা দিয়েছেন তাই সেটা ব্যক্তি স্বার্থের জন্য অন্যের ওপর প্রয়োগ করবেন না। অসাধারণ প্রতিভা, বিচক্ষণতা যখন আল্লাহ তাআলা আপনাকে দিয়েছেন অন্যকে পথভ্রষ্ট করার জন্য সেটা ব্যবহার করবেন না।
আল্লাহ ধন-সম্পদ দিলে অনাথ দরিদ্রকে কীটপতঙ্গ মনে করো না। খোদা শাসন ক্ষমতা দিলে তার বান্দাদেরকে গোলাম মনে করে নিজেদের পায়ের তলায় পিস্ট করো না। আল্লাহ তাআলা ইযযত-সম্মান দিলে অন্যকে তাই হেয় প্রতিপন্ন করতে নেই।
তুমি আমাকে এসব দার্শণিক কথা বার্তা কেন শোনাচ্ছো মুদ্দাসসিরা! যারিয়াব ঝাঝালো কণ্ঠে বললো। আমি তোমাকে জটিল কোন কথা বলিনি। সুলতানার ব্যাপারে তোমাকে সাবধান করতে এসেছিলাম।
আমি তো আপনার চোখে-মুখে যেন চাপা অস্থিরতা আর দ্বিধাদ্বন্দ দেখতে পাচ্ছি। মুদ্দাসিরা হেসে বললো, আমি আপনাকে এ নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, এ ব্যাপারে আমীরে উন্দলুসের সঙ্গে আমি কোন কথাই বলবো না।
