সে আপনার গানের স্বপ্নময় কলি। যেই তা শুনে মাতাল হয়ে যায়। আর আমি এক বাস্তব নারী। বাস্তবতা জাদু ও অচৈতন্যকে সমূলে শেষ করে দেয়। আমীরে উন্দলুস আমার স্বামী ঠিক; কিন্তু তিনি আমার মালিকানা ভুক্ত নন। প্রথমে তিনি আমীরে সালতানাত। তারপর কারো স্বামী বা কারো প্রেমিক।…….
তাই সালতানাত, খেলাফত বা প্রশাসনের দায়িত্বের ব্যাপারে তাকে আমি অবহেলা করতে যদি দেখি তাহলে আমার এই দায়িত্ব আমি অবশ্যই পালন করবো যে, আমি তাকে তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবো। তারপরও যদি তিনি তার দায়িত্বজ্ঞানহীনতার মধ্যে ডুবে থাকেন তাহলে তাকে আমার নিজের ওপর হারাম মনে করবো।
যারিয়াবের ওপর সুলতানা ও মদের যে নেশা ছিলো সেটা এতক্ষণে অনেকটাই নেমে গেছে।
আমার মতো সুলতানার ওপর এমন কোন দায় দায়িত্ব নেই। মুদ্দাসসিরা আবার বললো, সে তো আপাদমস্তক ভোগ বিলাসের এক প্রতিমূর্তি। ভোগ মত্ততার বড় মায়াবী এক উপকরণ সুলতানা।
আর এটাই তার শক্তি। যারিয়াব বললো, ওর রূপ এক বিধ্বংসী অস্ত্র। সে যে ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি করতে পারবে সেটা তুমি পারবে না। তোমার ব্যক্তি-সত্বার ওপর আমার বেশ আগ্রহ বা দুর্বলতা রয়েছে। আমি যেটা বলতে এসেছি সেটা হলো, সুলতানার সঙ্গে শত্রুতা রাখার মতো ঝুঁকি তুমি নিয়ো না।..
সুলতানা চায়, আমীরে উন্দলুস যেন যুদ্ধের ময়দানে ময়দানে এভাবে ঘুরে না বেড়ান। তিনি ফ্রান্সের ওপর হামলার জন্য ফৌজ পাঠাচ্ছিলেন। এখানে তাঁর প্রশাসনিক বহু কিছু দেখার ছিলো। আর সে মুহূর্তে তুমি তাকে এমনভাবে উস্কে দিয়েছে যে, তিনি ফৌজের নেতৃত্ব নিজ হাতে নিয়ে নিয়েছেন এবং চলে গেছেন। আমরা তাঁকে জীবন্ত দেখতে চাই।
***
আমি আমার স্বামীকে সে অবস্থায় জীবিত দেখতে চাই না যে, আমাদের ফৌজ ফ্রান্স, গোথাক মার্চ ও শত্রুদের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন মরণ লড়াইয়ে আহত নিহত হতে থাকবে আর আমার স্বামী রাজ মহলে এক গায়কের গানে ও এক রূপসীর রূপে অচেতন হয়ে পড়ে থাকবে।
মুদ্দাসসিরা তেজদীপ্ত গলায় বললো, মুসলিম মেয়েদের কাছে নিজেদের প্রিয়জন নয়। আপন জাতির ইজ্জত সমই সবচেয়ে মূল্যবান বিষয় হয়ে থাকে।
মুদ্দাসসিরা! যারিয়াব বললো। আমি তোমার এই আবেগ অনুভূতিকে মন থেকে সম্মান করি। আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের কাছে বড় বড় এবং দুর্ধর্ষ বহু সালার জেনালের আছে। উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহকে তুমি কী মনে করো? তিনি কি আমীরে উন্দলুসের নেতৃত্ব ছাড়া নিজে ফৌজের নেতৃত্ব দিতে পারবেন না? অবশ্যই পারবেন।
সালার মূসা ইবনে মুসা, সালার আব্দুর রউফ, সালার ফারতুন ঐতিহাসিক সব লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাহলে এসব অভিযানে আমীরে উন্দলুসের যাওয়ার কী প্রয়োজন?
যারিয়াব কথা বলছে আর মুদ্দাসসিরা উঠে কামরায় পয়চারী করছে। তার চলনে অভিব্যক্তিতে সমীহ পাওয়ার মতো অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। সে পায়চারী করতে করতে একেবারে যারিয়াবের কাছে চলে এলো। যারিয়াবের ওপর একটু ঝুঁকে আবার সোজা হয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো।
আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে মদের কুট গন্ধ বেরোচ্ছে। আর আপনার শরীর থেকে আসছে সুলতানার সুগন্ধি। মুদ্দাসসিরা মুচকি হেসে বললো, যে কথা আপনি আমাকে বলতে এসেছেন সেটা সুলতানার নিজের এসে বলা উচিত ছিলো। কিন্তু সে আসবে না। ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আপনি এক মহান মানুষ। আল্লাহ তাআলা আপনাকে অনেক উঁচু আসন দিয়েছেন। কিন্তু এক নারীর রূপযৌবন আপনার বুদ্ধিবলের ওপর পর্দা ফেলে রেখেছে।…..
মুহতারাম যারিয়ার! আপনি তো আপনার কথা বলেছেন। এখন আমার জবাব শুনুন। সুলতানার মতো আমার আমীরে উন্দলুসের মন জয় করার প্রয়োজন নেই। আমার প্রতি তার ভালোবাসা না থাকলে আমাকে তিনি বিয়ে করতেন না। হেরেমের অন্যান্য মেয়েদের মতো বা সুলতানার মতো বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়া বা রক্ষিতা বানিয়ে রাখতেন।….।
এই একজন মানুষের সঙ্গেই শুধু আমার সম্পর্ক নয়, পুরো মুসলিম জাতির সঙ্গেই আমার প্রাণের সম্পর্ক রয়েছে। উন্দলুসে যে একের পর এক বিদ্রোহ হয়ে আসছে এর পিছনে ফ্রান্সের শাহলুই এবং আলফাঁসের হাত রয়েছে। এরা ইসলামকে সমূলে উৎখাত করতে চায়। মারীদায় এরা তখন বিদ্রোহ করিয়েছে যখন আমাদের ফৌজ ফ্রান্সের ওপর চূড়ান্ত এক হামলা করতে যাচ্ছিলো। এটা ছিলো পরিস্কার এক ষড়যন্ত্র।
ঐ কাফেররা মারীদার বিদ্রোহ উস্কে দিয়ে ফ্রান্সকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। এখন শাহ লুই ও আলফাসো মারীদায় ব্যর্থ হওয়ার মূল্য ঠিকই উন্দলুসের খ্রিষ্টানদেরকে কড়ায় গন্ডায় উসুল করার ব্যবস্থা করে দেবে। অন্য কোথাও বিদ্রোহ করাবে। আমার নজর তো এসব অবস্থা ও পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর।
নিজের ব্যক্তিগত অবস্থঘার ওপরও একটু খেয়াল রাখে মুদ্দাসসিরা! যারিয়াব বললো।
মুহতারাম যারিয়াব! মুদ্দাসসিরা বললো, আমার মনে আপনার যে একটা সম্মানজনক আসন আছে সেটাকে আপনি ক্ষতবিক্ষত করছেন। আমি বলেছিলাম, আপনার মুখ থেকে মদের ও শরীর থেকে সুলতানার আতরের গন্ধ আসছে। আর আপনার কাঁধে লম্বা এক চুল দেখা যাচ্ছে যা কাঁধ থেকে নিয়ে আপনার বাহু জড়িয়ে আছে। যেন সুলতানা আপনাকে জড়িয়ে রেখেছে। এটা কি সুলতানার মাথার চুল নয়?
